উৎসবমুখর পরিবেশ ও ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্যের মধ্যদিয়ে চুয়াডাঙ্গায় উদ্যাপিত হয়েছে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের অন্যতম প্রধান ধর্মীয় উৎসব শ্রীকৃষ্ণ জন্মাষ্টমী। গতকাল শুক্রবার ভগবান শ্রীকৃষ্ণের ৫২৫৩তম আবির্ভাব তিথি উপলক্ষে জেলার বিভিন্ন মন্দিরে দিনব্যাপী পূজা-অর্চনা, শ্রীবিগ্রহের অভিষেক, নামসংকীর্তন, ধর্মীয় আলোচনা, গীতাপাঠ ও প্রসাদ বিতরণ করা হয়।
সকাল থেকেই জেলার বিভিন্ন মন্দিরে ভক্তদের সমাগম শুরু হয়। ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের মধ্যদিয়ে শ্রীকৃষ্ণের পূজার আনুষ্ঠানিকতা শুরু হয়। শ্রীবিগ্রহকে পঞ্চামৃতসহ বিভিন্ন উপকরণ দিয়ে অভিষেক, নতুন বস্ত্র ও অলংকারে সজ্জিতকরণ, ফুল ও তুলসী নিবেদন, ধূপ-দীপ প্রজ্বালন, নৈবেদ্য প্রদান ও আরতি করা হয়। এ সময় ভক্তরা কীর্তন ও ভজন পরিবেশন করেন।
দিনের বিভিন্ন সময়ে মন্দিরগুলোতে ধর্মীয় আলোচনা ও শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা পাঠ অনুষ্ঠিত হয়। অনেক ভক্ত উপবাস পালন করে মধ্যরাত পর্যন্ত ধর্মীয় অনুষ্ঠানে অংশ নেন। রাতে শ্রীকৃষ্ণের আবির্ভাব মুহূর্তকে কেন্দ্র করে বিশেষ পূজা, আরতি, কীর্তন ও প্রার্থনার আয়োজন করা হয়। পরে ভক্তদের মধ্যে প্রসাদ বিতরণ করা হয়।
এদিকে, বাংলাদেশ পূজা উদ্যাপন পরিষদ, বাংলাদেশ হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিষ্টান ঐক্য পরিষদ ও বাংলাদেশ পূজা উদ্যাপন ফ্রন্টের চুয়াডাঙ্গা জেলা শাখার যৌথ আয়োজনে সকাল ১০টায় জেলা শহরের বড় বাজার দুর্গা মন্দির থেকে বর্ণাঢ্য মঙ্গল শোভাযাত্রা বের করা হয়। এতে জেলার বিভিন্ন মন্দিরের ভক্ত, নারী, পুরুষ, শিশু-কিশোরসহ সনাতন ধর্মাবলম্বীরা অংশ নেন।
শোভাযাত্রায় শ্রীকৃষ্ণের বিভিন্ন লীলা ও ধর্মীয় ভাবধারা তুলে ধরা হয়। ঢাক-ঢোল, কীর্তন ও ধর্মীয় স্লোগানে মুখর হয়ে ওঠে শহরের প্রধান সড়কগুলো। শোভাযাত্রাটি শহরের বিভিন্ন সড়ক প্রদক্ষিণ করে ফেরিঘাট রোডের সত্য নারায়ণ মন্দিরে গিয়ে শেষ হয়। শোভাযাত্রায় বড় বাজার দুর্গা মন্দির, দৌলতদিয়াড় দক্ষিণপাড়া বারোয়ারী দুর্গামন্দির, দৌলতদিয়াড় মাঠপাড়া মন্দিরসহ জেলার বিভিন্ন মন্দিরের সদস্যরা অংশ নেন।
হিন্দু ধর্মীয় বিশ্বাস ও পুরাণের বর্ণনা অনুযায়ী, দ্বাপর যুগে ভাদ্র মাসের কৃষ্ণপক্ষের অষ্টমী তিথিতে মথুরার কারাগারে দেবকী ও বাসুদেবের সন্তান হিসেবে শ্রীকৃষ্ণের আবির্ভাব ঘটে। অত্যাচারী রাজা কংসের হাত থেকে শ্রীকৃষ্ণকে রক্ষা করতে বাসুদেব তাঁকে যমুনা নদী পার করে গোকুলে নন্দ ও যশোদার কাছে রেখে আসেন। পরবর্তীতে গোকুল ও বৃন্দাবনে তাঁর শৈশব ও কৈশোরের নানা লীলা সনাতন ধর্মের ভক্তি ও সংস্কৃতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে ওঠে।
ধর্মীয় বিশ্বাস অনুযায়ী, অধর্ম ও অত্যাচারের অবসান এবং ধর্ম প্রতিষ্ঠার জন্যই ভগবান শ্রীকৃষ্ণের আবির্ভাব। শ্রীমদ্ভগবদ্গীতায় শ্রীকৃষ্ণের দেওয়া ধর্ম প্রতিষ্ঠা ও অধর্ম বিনাশের বার্তা স্মরণ করেই ভক্তরা জন্মাষ্টমী পালন করেন। আয়োজকেরা বলেন, জন্মাষ্টমীর মূল শিক্ষা হলো সত্য, ন্যায়, মানবতা ও ধর্মের পথে চলা। শ্রীকৃষ্ণের জীবন ও বাণী মানুষকে অন্যায়-অত্যাচারের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে এবং সমাজে শান্তি, সম্প্রীতি ও সৌহার্দ্য প্রতিষ্ঠায় অনুপ্রাণিত করে।
তাঁরা আরও বলেন, ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের পাশাপাশি জন্মাষ্টমীর এ আয়োজন চুয়াডাঙ্গার সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির ঐতিহ্যকে আরও সমৃদ্ধ করেছে। সকল ধর্ম ও সম্প্রদায়ের মানুষের পারস্পরিক শ্রদ্ধা, সৌহার্দ্য ও ভ্রাতৃত্বের বন্ধন আরও সুদৃঢ় হোক- এটাই এবারের জন্মাষ্টমীর প্রত্যাশা।
নিজস্ব প্রতিবেদক