জ্বালানি সরবরাহ অর্থনীতির প্রাণভোমরা। সঙ্কটকালে তা হাড়ে হাড়ে টের পাওয়া যায়। বিশেষ করে যুদ্ধের সময় যখন বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহে বিঘ্ন ঘটে তখন তা প্রকট হয়ে ওঠে। সাম্প্রতিক সময়ে হরমুজ প্রণালী বন্ধ হওয়ায় বাংলাদেশ গুরুতর সমস্যার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। তবে যেসব দেশে দূরদর্শী সরকার থাকে, এরা প্রথমে নিজেদের জ্বালানি নিরাপত্তা তৈরি করে। এ কারণে জরুরি অবস্থায় বিপদে পড়ে না। দুর্ভাগ্য হলো— স্বাধীনতার অর্ধশতাব্দী পার হলেও দু-একটি বাদে বাংলাদেশে তেমন সরকারের দেখা মেলেনি। যে দু-একটি সরকার দেশের প্রতি প্রতিশ্রুতিশীল ছিল সেগুলো যথেষ্ট সময়-সুযোগ পায়নি নিরাপদ জ্বালানি অবকাঠামো গড়ে তুলতে। বিগত দেড় দশক দেশ শাসন করেছে একটি তাঁবেদার সরকার। ফ্যাসিবাদী ওই সরকার দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা গড়ে তোলার পরিবর্তে একে আরো ভঙ্গুর করে দিয়ে গেছে। বিদেশী শক্তির ওপর সম্পূর্ণ নির্ভর করে গেছে দেশকে। যার কারণে বিদ্যুৎ, গ্যাস ও তেলের বড় ধরনের সঙ্কটের মধ্যে দেশ হাবুডুবু খাচ্ছে। আশার কথা— বর্তমান সরকার তেল শোধনাগার নির্মাণের একটি উদ্যোগ নিয়েছে। এ জন্য ইসলামিক ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকের (আইডিবি) সাথে চুক্তি সই করেছে। সংস্থাটি এই প্রকল্পে ১২ হাজার কোটি টাকা অর্থায়ন করবে।
সংশ্লিষ্ট প্রকল্পে চট্টগ্রামের ইস্টার্ন রিফাইনারির সম্প্রসারণ করা হবে। এটি সম্পন্ন হলে ৩০ লাখ টন তেল শোধন করা যাবে। আগে থেকে এতে ১৫ লাখ টন শোধন করা যেত। এটি সম্পন্ন হলে দেশে ৪৫ লাখ টন শোধন করা যাবে। ২০৩০ সালে এটি উৎপাদনে এলে দেশের চাহিদার প্রায় ৫০ শতাংশ পূরণ হবে। প্রকল্পটির জন্য মোট ব্যয় ধরা হয়েছে ৩১ হাজার কোটি টাকা। এটি যদি ১০ বছর আগে করা হতো, এর চেয়ে অনেক কম ব্যয়ে সম্পন্ন করা যেত। পাশাপাশি আমাদের দৈনন্দিন জ্বালানি চাহিদা মেটানো যেত। সঙ্কটকালে সরকারকে বেশি মূল্য দিয়ে তেল কিনতে হতো না। পতিত হাসিনা সরকার উদ্দেশ্যমূলকভাবে দেশের জ্বালানি নিরাপত্তায় অতিপ্রয়োজনীয় অবকাঠামো বাদ দিয়ে বহু মেগা প্রকল্প বাস্তবায়ন করেছে। যার অনেকগুলো ছিল অপ্রয়োজনীয়। চট্টগ্রামের কর্ণফুলী টানেল যার জ্বলন্ত উদাহরণ। প্রায় ১১ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে এটি নির্মিত। এই প্রকল্পে এখন প্রতিদিন আয় হয় ১০ লাখ টাকা; অন্যদিকে প্রতিদিনে শুধু রক্ষণাবেক্ষণ খরচ ৩৭ লাখ টাকা।
এভাবে বিশাল বিশাল প্রকল্প করে দেশের সর্বনাশ করা হয়েছে। অথচ প্রয়োজনীয় অবকাঠামো করা হয়নি। ইস্টার্ন রিফাইনারিতে তেল শোধনাগারটি নির্মাণের বিষয়টি ২০১০ সাল থেকে আলোচিত ছিল। গড়িমসি করে সময় ক্ষেপণ করা হয়েছে। এভাবে অর্থনীতির মেরুদণ্ড রচনায় বিনিয়োগ পাশ কাটিয়ে দেশের সর্বনাশ করা হয়েছে। নতুন সরকার ছয় মাসের মধ্যে তেল শোধনাগার নির্মাণে উদ্যোগ নেয়ায় আশাবাদ জাগায়। তবে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে যাতে নির্মাণ করা হয়, সে জন্য সজাগ থাকতে হবে। পাশাপাশি বিদ্যুৎ ও গ্যাসের সরবরাহ নিরাপদ করতে সরকারকে যত দ্রুত সম্ভব স্থায়ী প্রকল্প নিতে হবে। এমনকি আমাদের চাহিদার শতভাগ তেল যাতে দেশে পরিশোধন হয়, সে উদ্যোগও নিতে হবে। জ্বালানি নিরাপত্তায় বিনিয়োগকে সর্বাধিক প্রাধান্য দিতে হবে।
প্রধান সম্পাদক