নতুন সরকার গঠনের ছয় মাস পার করেছে বিএনপি। বৈশ্বিক পরিস্থিতির কারণে দেখা দিয়েছে গ্যাস-বিদ্যুৎসহ নানামুখী সংকট। এমন পরিস্থিতিতে বিরোধীগুলো সহযোগিতা ও গঠনমূলক পরামর্শ না দিয়ে উসকানিমূলক বক্তব্য দিচ্ছে বলে অভিযোগ করছে সরকারসংশ্লিষ্টরা। তাদের দাবি, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে চলছে নানা ধরনের অপপ্রচারণা। সরকার ও সরকারের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের করা হচ্ছে কটূক্তি। এসব ঘটনায় ব্যবস্থা নিতে গেলে আবার সমালোচনার মুখে পড়ছে সরকার। উঠছে বাকস্বাধীনতা হরণের অভিযোগ।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় সরকারের সমালোচনা করা বিরোধী দল ও নাগরিকদের অধিকার। তবে সেই সমালোচনা যেন ব্যক্তিগত আক্রমণ, অশালীন কিংবা উদ্দেশ্যপ্রণোদিত অপপ্রচারে পরিণত না হয়, সেদিকেও রাজনৈতিক দলগুলোর সতর্ক থাকা প্রয়োজন। বিশেষ করে অর্থনৈতিক ও জ্বালানি সংকটের মতো জাতীয় দুর্যোগের সময়ে সরকারকে জবাবদিহির মধ্যে রাখার পাশাপাশি সংকট মোকাবিলায় বিকল্প প্রস্তাব দেওয়াও বিরোধী রাজনীতির গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব।
তাদের ভাষ্য, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এখন রাজনৈতিক প্রচারণার অন্যতম প্রধান ক্ষেত্র হয়ে উঠেছে। ফলে পরিকল্পিতভাবে একই ধরনের বক্তব্য, পোস্ট বা মন্তব্য ছড়িয়ে জনমতকে প্রভাবিত করার প্রবণতা বাড়ছে। তবে কোনো প্রচারণাকে 'বটচক্র' বা সংগঠিত অপপ্রচার হিসেবে চিহ্নিত করার আগে যথাযথ তথ্য-প্রমাণ থাকা জরুরি। এ ছাড়া সরকার যেমন বাকস্বাধীনতা নিশ্চিত করবে, তেমনি মতপ্রকাশের স্বাধীনতার আড়ালে যদি ইচ্ছাকৃতভাবে মিথ্যা তথ্য বা উসকানি ছড়ানো হয়, সেক্ষেত্রে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার প্রয়োজন রয়েছে।
অতিসম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রধানমন্ত্রী তারেকরহমান ও সরকারসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কটূক্তির অভিযোগে গাজীপুরে সিফাত আবদুল্লাহ নামের এক তরুণকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। গত বৃহস্পতিবার রাত সাড়ে আটটার দিকে গাজীপুর মহানগরের গাছা এলাকা থেকে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। সিফাত রাজধানীর আদমজী ক্যান্টনমেন্ট কলেজের শিক্ষার্থী এবং গাজীপুর মহানগরের ৩৮ নম্বর ওয়ার্ডের টিনের মসজিদ এলাকার বাসিন্দা সিকান্দরের ছেলে। গতকাল শুক্রবার সকাল সোয়া আটটার দিকে গ্রেপ্তারের বিষয়টি নিশ্চিত করেন গাছা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) গোলাম রব্বানী। তিনি বলেন, সিফাতের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে। মামলার বিস্তারিত তথ্য পরে জানানো হবে।
এদিকে গ্রেপ্তারের খবর ছড়িয়ে পড়লে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) নেতা-কর্মীরা সিফাতের মুক্তির দাবিতে বৃহস্পতিবার রাতে গাছা থানার সামনে অবস্থান নেন। রাত দুইটার পর তারা থানা এলাকা ছেড়ে যান। পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, সিফাত আবদুল্লাহ বেশ কিছুদিন ধরে প্রধানমন্ত্রীকে নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিভিন্ন ধরনের কটূক্তিমূলক লেখা প্রকাশ করছিলেন। সম্প্রতি তার একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে বিষয়টি স্থানীয় বিএনপির নেতা-কর্মীদের নজরে আসে। পরে তারা গাছা থানা-পুলিশকে বিষয়টি জানান। এরপর পুলিশ অভিযান চালিয়ে তাকে গ্রেপ্তার করে।
সিফাতকে এনসিপির সমর্থক ও ইনকিলাব মঞ্চের ভক্ত দাবি করে এনসিপির কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির মুখ্য সংগঠক আলী নাছের খান বলেন, তিনি এনসিপি, বিএনপিসহ বিভিন্ন দলের কর্মকাণ্ডের সমালোচনা করেন। তাকে অহেতুক গ্রেপ্তার করা হয়েছে। সিফাতকে গ্রেপ্তারের প্রতিবাদে আলী নাছের খান তার ফেসবুক আইডিতে একাধিক পোস্ট ও ভিডিও প্রকাশ করেন। সর্বশেষ একটি পোস্টে তিনি লেখেন, ‘কমিশনার সাহেব, সিফাত ইস্যু মাত্র ন্যাশনাল (জাতীয় পর্যায়ে) হয়েছে। তাকে মুক্তি না দিলে ইন্টারন্যাশনাল (আন্তর্জাতিক পয়ায়ে) হবে। খুবই নরমভাবে বললাম। নিজেদের ভালোটা বুঝুন এবং নাগরিকদের পাশে থাকুন।’
এনসিপির নেতা-কর্মীদের দাবি, সিফাত জুলাই আন্দোলনে অংশ নিয়েছিলেন। তিনি সরকারের বিভিন্ন অনিয়ম, সিদ্ধান্ত এবং তেল, গ্যাস ও বিদ্যুতের মতো বিষয় নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সমালোচনা করেন। বিভিন্ন সময় তিনি এনসিপিসহ অন্য রাজনৈতিক দলেরও সমালোচনা করেছেন। সিফাতের ফেসবুক আইডিতে থাকা ১ মিনিট ২৪ সেকেন্ডের একটি ভিডিওতে দেখা যায়, তিনি বিদ্যুৎ বিল নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করছেন। ভিডিওতে দাবি করেন, চলতি মাসে তার বাসায় চার হাজার টাকা এবং আগের মাসে পাঁচ হাজার টাকা অতিরিক্ত বিদ্যুৎ বিল এসেছে।
সরকারকে নিয়ে সমালোচনা করা প্রসঙ্গে কথা বলেছেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী। তিনি বলেছেন, বিরোধীদল অবশ্যই সরকারের সমালোচনা করবে, কিন্তু সেটা যৌক্তিক সমালোচনা হতে হবে। গতকাল দুপুরে শিল্পকলা একাডেমিতে বাংলাদেশ নৃত্যশিল্পী সংস্থার নব নির্বাচিত কার্যনির্বাহী কমিটির অভিষেক অনুষ্ঠানে তিনি এ কথা বলেন।
রিজভী বলেন, আমরা গ্যাস এবং বিদ্যুৎ কীভাবে সরবরাহ করব, কোথা থেকে পাব, কীভাবে পাব? বিরোধীদল একটা পরামর্শ দিন। আপনারা তো পার্লামেন্টের মধ্যে আছেন, আপনারা সেখানে বলছেন না কেন? অন্তত একটা প্ল্যানিং দিতে পারেন, একটা পরিকল্পনা আপনারা দিতে পারেন যে আপনারা এই এই কাজগুলো করুন। কই, এটা তো শুনলাম না! বিরোধীদলের কারো কাছ থেকে আমরা এটা শুনলাম না, শুধু কর্মসূচির কথাই শুনছি। তিনি বলেন, গণতন্ত্রে কর্মসূচি থাকবে। বিরোধীদলের কর্মসূচি থাকবে, পার্লামেন্টেও কথা বলবেন, পার্লামেন্টের বাইরেও কথা বলবেন- এতে কোনো আপত্তি নেই। কিন্তু কথা হচ্ছে- আপনারা অতীতের পুনরাবৃত্তি করলে সেটা কিন্তু অতীতের সংস্কৃতির দিকেই যাবে, অন্ধকার কিন্তু ঘনিয়ে আসবে।
জামায়াত-শিবিরের নেতা-কর্মীরা অনলাইনকে বিষাক্ত (টক্সিক) করে ফেলছে মন্তব্য করে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান প্রতিমন্ত্রী নূরুল হক নুর বলেন, ‘জামায়াত-শিবিরের নেতা-কর্মীরা এত বিষাক্ত ও অশালীন ভাষায় বিরোধীদের সমালোচনা করছে। অথচ তারা নিজেদের ইসলামী রাজনৈতিক দল হিসেবে দাবি করে। ইসলামের আদর্শে যদি তারা রাজনীতি করে, তাহলে তাদের আচরণেও ইসলামের শিক্ষা ও মূল্যবোধের প্রতিফলন থাকা উচিত।’
নুরুল হক নুর বলেন, জামায়াত-শিবিরের অনলাইন কর্মকাণ্ডের সমালোচনা করে নূর বলেন, ‘একজন ব্যক্তি পাঁচটি আইডি খুলে ফজরের নামাজ পড়ে অন্যের কমেন্টে গিয়ে গালিগালাজ করবে, বিকেলে আবার সেই কমেন্টের জবাব দেবে, ঘুমাতে যাওয়ার আগে আবার আরেকটি কমেন্ট করবে; এই যদি জামায়াতের ইসলামী আদর্শের রাজনীতি হয়, তাহলে সেটি নিয়ে প্রশ্ন ওঠাই স্বাভাবিক।’ তিনি বলেন, ‘সম্প্রতি বিএনপিসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দল থেকে অনেকে জামায়াতে যোগ দিয়েছেন বলে প্রচার করা হচ্ছে। কিন্তু বিএনপির লোকজন কেন জামায়াতে যাবে? তারা কি জামায়াতের মতো কোনো উগ্রপন্থী দল করতে যাবে? আমি আগেও বলেছি, জামায়াতকে শুধু একটি রাজনৈতিক দল হিসেবে দেখলে হবে না। এটি একটি কমিউনিটি এবং বিশ্বের অনেক দেশে এ ধরনের উগ্রপন্থী দলের একটি নেক্সাস রয়েছে।’
তবে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও সরকার-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কটূক্তির অভিযোগে আটক সিফাত আবদুল্লাহকে সন্ত্রাসবিরোধী আইনের মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন আলোচিত চিকিৎসক ও তরুণ রাজনীতিবিদ তাসনিম জারা। তিনি বলেছেন, ‘সিফাতের ভাষা ভদ্র ছিল না। এটা নিয়ে তর্ক করার কিছু নেই। কিন্তু প্রশ্নটা ভদ্রতার নয়। কারণ সিফাতকে অভদ্রতার জন্য গ্রেপ্তার করা হয়নি। মামলা দেওয়া হয়েছে সন্ত্রাসবিরোধী আইনে। তাহলে গালি দেওয়া কি সন্ত্রাস?’
গতকাল বিকেল সাড়ে পাঁচটার দিকে নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে এক পোস্টে এ কথা বলেন তিনি। ফেসবুক পোস্টে তাসনিম জারা লিখেছেন, ‘যারা এই গ্রেপ্তারের বিপক্ষে লিখছেন, তাদের কমেন্ট বক্সে গালির বন্যা। সাথে বলছেন যে ছেলেটা গালি দিয়েছে, তাই ধরা ঠিক হয়েছে। আয়রনি (পরিহাস) হলো, তারা নিজেরাই গালি দিয়ে সেটা বলছেন। এবং তাদের কোনো ভয় নাই। কারণ তারা জানেন গালিটা তারা কাকে দিচ্ছেন, আর কাকে দিচ্ছেন না। অর্থাৎ ক্ষমতাসীন কাউকে গালি দিলে সেটা অপরাধ, ক্ষমতায় না থাকা কাউকে দিলে সেটা গ্রহণযোগ্য।’
সমীকরণ প্রতিবেদন