‘জাগো নব সৃষ্টির মহানন্দে’ প্রতিপাদ্যে জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের সৃষ্টিশীলতা, সাম্য, মানবতা ও বিদ্রোহের চেতনাকে নতুন প্রজন্মের মাঝে ছড়িয়ে দেওয়ার প্রত্যয়ে চুয়াডাঙ্গায় শুরু হয়েছে সাত দিনব্যাপী ‘নজরুল বর্ষ উপলক্ষে নজরুল উৎসব। গান, কবিতা, আবৃত্তি, অভিনয়, মঞ্চ নাটকসহ ও নানা সাংস্কৃতিক আয়োজনের মধ্যদিয়ে কবির সাহিত্যকর্ম ও আদর্শকে মানুষের কাছে তুলে ধরতে এ উৎসবের আয়োজন করেছে চুয়াডাঙ্গা জেলা পরিষদ। উৎসবের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বক্তারা নজরুলের অসাম্প্রদায়িক চেতনা, বৈষম্যবিরোধী দর্শন ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদী অবস্থানকে ব্যক্তি, সমাজ ও রাষ্ট্রীয় জীবনে ধারণ করার আহ্বান জানান।
গতকাল রোববার বিকেল পাঁচটায় জেলা শহরের শিল্পকলা একাডেমি চত্বরে বেলুন ও পাঁয়রা উড়িয়ে সাত দিনব্যাপী এ আয়োজনের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন জেলা প্রশাসক লুৎফুন নাহার। জেলা পরিষদের প্রশাসক শরীফুজ্জামান শরীফ দাপ্তরিক কাজে বাইরে থাকায় মুঠোফোনে অনুষ্ঠানে যুক্ত হয়ে উৎসবের উদ্বোধন ঘোষণা করেন এবং আয়োজনের সার্বিক সফলতা কামনা করেন।
উদ্বোধনের পর একই স্থানের মুক্তমঞ্চে জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের সাহিত্যকর্ম, সৃষ্টির পটভূমি ও তাৎপর্য নিয়ে আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়। এতে সভাপতিত্ব করেন জেলা পরিষদের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মুকুল কুমার মৈত্র। অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন সংগীতশিল্পী হিরন উর রশিদ শান্ত।
এসময় সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে জেলা প্রশাসক লুৎফুন নাহার বলেন, নজরুলকে এক দিন বা এক বছরের চর্চার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখলে তাঁর জীবন ও দর্শন থেকে প্রকৃত শিক্ষা গ্রহণ করা সম্ভব হবে না। নজরুলের আদর্শকে দৈনন্দিন জীবন, কর্ম ও জাতীয় অগ্রগতিতে কাজে লাগাতে হবে। আমাদের সবার দৈনন্দিন কর্মকাণ্ডের মধ্যেই নজরুলের চেতনা রয়েছে। তিনি সাম্য, প্রেম, ইসলাম ও বিদ্রোহের কবি। বাংলা আধুনিক গানের বিকাশেও তাঁর অসামান্য অবদান রয়েছে।
জেলা প্রশাসক বলেন, নজরুলের সাহিত্য ও সংগীতের চর্চা ছড়িয়ে দিতে জেলা পরিষদের উদ্যোগে গান, রচনা প্রতিযোগিতাসহ বিভিন্ন সাংস্কৃতিক আয়োজন করা হয়েছে। এসব আয়োজনের মধ্যদিয়ে শিশু-কিশোর ও তরুণদের সৃজনশীলতা বিকাশের সুযোগ তৈরি হবে। অভিনয় কিংবা মঞ্চ পরিবেশনা হঠাৎ করে আয়ত্ত করা যায় না; এর জন্য দীর্ঘদিনের অনুশীলন, প্রস্তুতি ও নিবিড় চর্চা প্রয়োজন।
প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণকারীদের উৎসাহিত করে তিনি বলেন, সাত দিনব্যাপী আয়োজনে যারা অংশ নেবে, তাদের সবাইকে আগাম অভিনন্দন জানাই। বিজয়ীরা অবশ্যই আনন্দিত হবে। তবে যারা বিজয়ী হতে পারবে না, তাদেরও হতাশ হওয়ার কিছু নেই। প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণের মধ্যদিয়েই আত্মবিশ্বাস বাড়ে, নিজের প্রতিভা প্রকাশের সক্ষমতা তৈরি হয় এবং উপস্থাপনার দক্ষতা অর্জিত হয়। চুয়াডাঙ্গাবাসীর জন্য এ ধরনের আয়োজন ভবিষ্যতেও আরও বাড়ানো হবে, যাতে নজরুলচর্চা বিস্তৃত হয় এবং নতুন প্রজন্ম তাঁর মতো অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদী মানসিকতা নিয়ে গড়ে উঠতে পারে।
তিনি আরও বলেন, কাজী নজরুল ইসলাম সমাজ থেকে বৈষম্য দূর করার কথা বলেছেন। অবহেলা, লাঞ্ছনা ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে তাঁর অবস্থান ছিল সুস্পষ্ট। তাঁর আদর্শ ধারণ করে সমাজ থেকে বৈষম্য ও অবিচার দূর করতে সবাইকে সম্মিলিতভাবে কাজ করতে হবে।
মাদকের ভয়াবহতা তুলে ধরে জেলা প্রশাসক বলেন, চুয়াডাঙ্গায় মাদকের বিস্তার রোধে সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে। তরুণ সমাজকে মাদক থেকে দূরে রাখতে খেলাধুলা ও সুস্থ সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের সুযোগ বাড়ানো জরুরি। তরুণদের সঠিক পথে পরিচালিত করতে পরিবার, সমাজ ও প্রশাসনকে একযোগে কাজ করতে হবে।
অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথির বক্তব্যে চুয়াডাঙ্গার পুলিশ সুপার মেহেদী শাহরিয়ার বলেন, জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম এ অঞ্চলে এসেছিলেন এবং প্রায় আড়াই মাস অবস্থান করেছিলেন- এ তথ্য আমাকে গভীরভাবে আলোড়িত করে। এ অঞ্চলে অবস্থানকালে তিনি ‘পদ্মগোখরা’, ‘মৃত্যুক্ষুধা’ ও ‘লিচুচোর’-এর মতো উল্লেখযোগ্য সাহিত্যকর্মের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। নজরুল এমন একটি সাম্যভিত্তিক সমাজ গড়তে চেয়েছিলেন, যেখানে বৈষম্য ও অপশাসনের স্থান থাকবে না। তাঁর ‘বল বীর- চির উন্নত মম শির’ উচ্চারণ মানুষের আত্মমর্যাদা ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে মাথা উঁচু করে দাঁড়ানোর প্রেরণা জোগায়।
পুলিশ সুপার বলেন, নজরুলের আদর্শ আজও সমাজের জন্য অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। অন্যায়, অনিয়ম ও অপশাসনের বিরুদ্ধে তাঁর যে প্রতিবাদী অবস্থান ছিল, আইনশৃঙ্খলা রক্ষায়ও সেই চেতনার প্রতিফলন প্রয়োজন। বর্তমানে মাদক তরুণ প্রজন্মের জন্য বড় হুমকি হয়ে উঠেছে। নতুন প্রজন্মের একটি অংশ মাদকের ঝুঁকিতে পড়ছে। চুয়াডাঙ্গাকে মাদকমুক্ত করতে প্রশাসনের পাশাপাশি সাধারণ মানুষের সহযোগিতাও প্রয়োজন।
অভিভাবকদের উদ্দেশে তিনি বলেন, সন্তানরা সন্ধ্যার পর কোথায় যাচ্ছে, কার সঙ্গে মিশছে এবং কী ধরনের কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ছে, সে বিষয়ে অভিভাবকদের সচেতন থাকতে হবে। পরিবারের দায়িত্বশীল নজরদারি কিশোর-তরুণদের বিপথে যাওয়া থেকে রক্ষা করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
অল্প বয়সী কিশোরদের বেআইনিভাবে মোটরসাইকেল চালানোর প্রবণতা নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন পুলিশ সুপার। তিনি বলেন, এ ধরনের কর্মকাণ্ড বন্ধে পুলিশ তদন্ত ও নজরদারি করছে এবং আইনানুগ ব্যবস্থা অব্যাহত থাকবে। এ ক্ষেত্রে অভিভাবকদেরও দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে। নজরুল যেমন অন্যায় ও অপশাসনের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর শিক্ষা দিয়েছেন, তেমনি দুর্নীতি ও অনিয়মের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এ কাজে জেলা প্রশাসনসহ সংশ্লিষ্ট সবার সহযোগিতা প্রয়োজন।
আলোচনা সভায় শুভেচ্ছা বক্তব্য দেন চুয়াডাঙ্গার সংলাপ সাংস্কৃতিক গোষ্ঠীর সভাপতি নজির আহমেদ, অরিন্দম সাংস্কৃতিক সংগঠনের সভাপতি মো. আলাউদ্দিন, আবৃত্তি পর্ষদের পরিচালক মনোয়ারা খুশি, উদীচী জেলা সংসদ চুয়াডাঙ্গার সভাপতি হাবিবি জহির রায়হান, চুয়াডাঙ্গা সাহিত্য পরিষদের সভাপতি ইকবাল আতাহার তাজ, আলমডাঙ্গার কলাকেন্দ্রের সভাপতি ইকবাল হোসেন মিয়া এবং চুয়াডাঙ্গা জেলা জাসাসের সভাপতি শহিদুল হক বিশ্বাস। এসময় জাসাসের সাধারণ সম্পাদক সেলিমুল হাবিব সেলিমসহ বিভিন্ন সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক সংগঠনের নেতৃবৃন্দ, শিল্পী ও সংস্কৃতিকর্মীরা উপস্থিত ছিলেন।
বক্তারা বলেন, জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের সাহিত্য ও সংগীত শুধু বিনোদনের মাধ্যম নয়; বরং অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ, মানবিক মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠা এবং সাম্যভিত্তিক সমাজ গঠনের শক্তিশালী প্রেরণা। নতুন প্রজন্মকে তাঁর সৃষ্টির সঙ্গে পরিচিত করার পাশাপাশি বাস্তব জীবনে তাঁর আদর্শ চর্চার সুযোগ তৈরি করতে এ ধরনের আয়োজন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
উদ্বোধনী দিনের আয়োজনের অংশ হিসেবে এর আগে জেলা শিল্পকলা একাডেমিতে দিনব্যাপী বিভিন্ন সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত হয়। সন্ধ্যা ৬টা থেকে শুরু হয় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। এতে জাতীয় কবির লেখা গান পরিবেশনের পাশাপাশি নাচ ও আবৃত্তি পরিবেশন করেন চুয়াডাঙ্গা জেলা জাসাস এবং স্থানীয় বিভিন্ন সাংস্কৃতিক সংগঠনের শিল্পীরা। সংগীত ও আবৃত্তির পরিবেশনায় শিল্পকলা একাডেমি চত্বর উৎসবমুখর হয়ে ওঠে।
জাতীয় কবির আদর্শ, সাহিত্য ও সংগীত নতুন প্রজন্মের মাঝে ছড়িয়ে দিতে জেলা পরিষদের এ উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েছেন স্থানীয় সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব ও সাধারণ মানুষ। তাঁদের মতে, নিয়মিত সাংস্কৃতিক চর্চা বাড়ানো গেলে নতুন প্রজন্মের মধ্যে সৃজনশীলতা, মানবিকতা ও অসাম্প্রদায়িক মূল্যবোধ বিকশিত হবে।
জেলা পরিষদের আয়োজনে সাত দিনব্যাপী ‘নজরুল বর্ষ-২০২৬’ চলবে আগামী ৩১ অক্টোবর পর্যন্ত। উৎসবের দ্বিতীয় দিন আজ সোমবার সকাল ৯টা থেকে এবতেদায়ি, দাখিল, আলিম, ফাজিল ও কামিল পর্যায়ের মাদ্রাসাশিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণে কবিতা, সংগীত, হামদ-নাত ও অভিনয়সহ বিভিন্ন বিষয়ে প্রতিযোগিতার আয়োজন রয়েছে।
এদিন সন্ধ্যা ৬টায় আলমডাঙ্গা মুক্তিযোদ্ধা সংসদ ও চুয়াডাঙ্গা সদর উপজেলা শিল্পকলা একাডেমির আয়োজনে সাংস্কৃতিক সন্ধ্যা অনুষ্ঠিত হবে। সাত দিনের এ উৎসবে পর্যায়ক্রমে বিভিন্ন প্রতিযোগিতা ও সাংস্কৃতিক পরিবেশনার মধ্যদিয়ে জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের সৃষ্টিকর্ম ও জীবনদর্শন তুলে ধরা হবে।
নিজস্ব প্রতিবেদক