জোটের ভেতরে জোট হচ্ছে। অনেকটা অভিনব এই জোটের তৎপরতায় রাজনীতিতে নতুন সমীকরণ তৈরি হয়েছে। সাতটি ইসলামী দল ‘সমমনা ইসলামী দল’ নামে এই জোট গঠনের উদ্যোগ নিয়েছে। জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় নির্বাচনী ঐক্যের ভেতরে থাকা কয়েকটি দল এই নতুন জোটে যুক্ত হয়েছে। ফলে রাজনীতিতে নতুন সমীকরণের আভাস মিলছে। এই ঐক্যে থাকা কওমি ঘরানার কয়েকটি ইসলামি দলকে নিয়ে পৃথক জোট গঠনের উদ্যোগ ঘিরে তৈরি হয়েছে নানা আলোচনা, হিসাবনিকাশ। হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের শীর্ষ নেতাদের অনেকে এই নতুন জোট গঠনের নেতৃত্বের সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন। বিশেষ করে স্থানীয় সরকার নির্বাচনে জোটবদ্ধভাবে অংশ নেয়া ও অন্য রাজনৈতিক জোটে থাকা নিয়ে শর্ত আরোপের বিষয়ে দলগুলোর মধ্যে এখনো মতৈক্য হয়নি। গণভোটের রায় বাস্তবায়নের দাবিতে ১১ দলের সঙ্গে থাকা ইসলামী দল চলমান কর্মসূচি চালিয়ে যাবে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। এদিকে, ৭ দলীয় সূত্র জানিয়েছে, যারা ‘সমমনা ইসলামী দল’ এই ঐক্যে থাকবেন, তারা অন্য কোনো জোট বা রাজনৈতিক বলয়ে থাকতে পারবেন না। বৃহস্পতিবার রাজধানীর খিলগাঁওয়ে আল-জামিয়াতুল ইসলামিয়া মাখজানুল উলুম মাদ্রাসায় সাত দলের লিয়াজোঁ কমিটির বৈঠকে স্থানীয় সরকার নির্বাচনে একসঙ্গে অংশ নেয়ার বিষয়টি আলোচনায় আসে। তবে এ বিষয়ে এখনো চূড়ান্ত কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি। আগামী ৫ই ডিসেম্বরের বৈঠকে বিষয়টি নিয়ে আরও আলোচনা হবে। এর মধ্যে অনানুষ্ঠানিক আলোচনাও চলমান থাকবে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট নেতারা। সাত দলের এই ঐক্য প্রক্রিয়ায় যুক্ত রয়েছে- ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ, জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশ, খেলাফত মজলিস, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস, বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলন, ইসলামী ঐক্যজোট ও বাংলাদেশ নেজামে ইসলাম পার্টি। বৈঠকে সভাপতিত্ব করেন হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের মহাসচিব মাওলানা সাজিদুর রহমান।
বৈঠক সূত্র জানা যায়, সাত দলের ঐক্যের কাঠামো, অভিন্ন ব্যানারে কার্যক্রম পরিচালনা, রাজনৈতিক জোটগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক এবং ভবিষ্যৎ কর্মপন্থা নিয়ে আলোচনা হয়েছে। দলগুলো ‘সমমনা ইসলামী দল’ ব্যানারে একসঙ্গে কাজ করার বিষয়ে নীতিগত সিদ্ধান্ত নিলেও নিজেদের স্বতন্ত্র পরিচয় বজায় রাখবে। তবে এই ঐক্যের আওতায় থাকা দলগুলো অন্য রাজনৈতিক জোটে থাকতে পারবে কি না, তা নিয়ে মতভেদ রয়েছে এখনো।
স্থানীয় নির্বাচন ঘিরে হিসাব: সাত দলের বৈঠকে স্থানীয় সরকার নির্বাচনে জোটবদ্ধভাবে অংশ নেয়ার বিষয়টি বিশেষ গুরুত্ব পায়। বৈঠকে অংশ নেয়া নেতারা জানান, জামায়াতে ইসলামী এককভাবে স্থানীয় সরকার নির্বাচনে অংশ নিতে চায়। এমন পরিস্থিতিতে জামায়াত নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় নির্বাচনী ঐক্যে থাকা দলগুলো স্থানীয় নির্বাচনে কীভাবে অংশ নেবে, তা নিয়েও আলোচনা হয়েছে। সাত দলের এই উদ্যোগের ফলে স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে সামনে রেখে ইসলামি দলগুলোর মধ্যে নতুন সমীকরণ তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে। তবে নতুন জোটের কাঠামো, নির্বাচনী সমঝোতা ও বিদ্যমান রাজনৈতিক জোটের সঙ্গে সম্পর্কের বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত না হওয়ায় পরিস্থিতি এখনো অনেকটাই অনিশ্চিত। অন্য জোটে থাকা নিয়ে মতভেদ: সাত দলের ঐক্যের অন্যতম জটিল বিষয় হয়ে উঠেছে অন্য রাজনৈতিক জোটে থাকা নিয়ে শর্ত আরোপের প্রশ্নে। বৈঠক সূত্র জানায়, ‘সমমনা ইসলামী দল’ ব্যানারে কার্যক্রম পরিচালনার বিষয়ে নীতিগত সিদ্ধান্ত হলেও অন্য জোটে থাকা দলগুলোকে সেই জোট ছাড়তে হবে কি না, তা নিয়ে মতৈক্য হয়নি। সূত্র জানায়, যারা এই জোটে থাকবে তারা অন্য কোনো জোটে থাকতে পারবে না। এখানে আপত্তি জানিয়েছে বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস ও বাংলাদেশ নেজামে ইসলাম পার্টি।
সূত্র আরও জানায়, সাত দল অন্য কোনো জোটে থাকতে পারবে না- এমন সিদ্ধান্তের ব্যাপারে নিজ নিজ দলীয় ফোরামে আলোচনার পরে এ বিষয়ে জানাবে দলগুলো। এ বিষয়ে জামায়াত বলছে, নতুন জোট যাই হোক জুলাই সনদ বাস্তবায়ন ও গণভোটের রায় কার্যকর না হওয়া পর্যন্ত ১১ দলীয় ঐক্য অটুট থাকবে। বিএনপি’র জোট নিয়েও আলোচনা: বৈঠক সূত্র জানায়, জামায়াতে ইসলামী ও বিএনপি’র সঙ্গে সাত দলের সম্পর্ক নিয়েও আলোচনা হয়েছে। এ সময় জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশের মহাসচিব বলেছেন, সাত দলের এই ঐক্য কার্যকর হলে তারা বিএনপি’র জোট থেকে বেরিয়ে যাবেন। রাজনৈতিক বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেয়ার ক্ষেত্রে দলগুলোর লিয়াজোঁ কমিটিতে আলোচনা করে ঐকমত্যে পৌঁছানোর ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের মহাসচিব মাওলানা সাজিদুর রহমান। গণভোটের রায় বাস্তবায়নে মাঠের কর্মসূচি: জুলাই সনদ ও গণভোটের রায় বাস্তবায়নের দাবিতে ১১ দলীয় ঐক্য মাঠের কর্মসূচি জোরদারের প্রস্তুতি নিচ্ছে। গণমিছিল, সেমিনার ও লিফলেট বিতরণের পর বিভাগীয় শহরগুলোতে সমাবেশ ও পরে রাজধানীতে মহাসমাবেশ করছে। এখন লংমার্চে মনোযোগ বাড়িয়েছে তারা। আগামী ৩১শে অক্টোবর ঢাকা-খুলনা-কুষ্টিয়া লংমার্চ অনুুষ্ঠিত হবে। এর মাধ্যমে সরকারের ওপর রাজনৈতিক চাপ বাড়াতে চায় ১১ দল।
জামায়াত নেতারা অভিযোগ করে আসছেন, জুলাই সনদে স্বাক্ষর করলেও ক্ষমতায় গিয়ে বিএনপি প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করেছে। এতে রাজনৈতিক ও সাংবিধানিক সংকট তৈরি হচ্ছে বলে তাদের দাবি। এই লক্ষ্যে বিভিন্ন কর্মসূচি চলমান রয়েছে ১১ দলের। এদিকে, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি ও জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির প্রতিবাদে তিন দফা দাবিতে গণবিক্ষোভের ডাক দিয়েছে এনসিপি। আগামী ৩০শে অক্টোবর বেলা তিনটায় রাজধানীর শাহবাগে জাতীয় জাদুঘরের সামনে এ কর্মসূচি পালনের ঘোষণা দিয়েছে দলটি।
কোন পথে ইসলামি দলগুলো: ইসলামি দলগুলোর এই নতুন সমীকরণ কেবল স্থানীয় সরকার নির্বাচনেই সীমাবদ্ধ থাকবে নাকি জাতীয় রাজনীতিতেও প্রভাব ফেলবে। বিষয়টি এখনো স্পষ্ট নয়। সাত দলের নেতারা একদিকে অভিন্ন ব্যানারে কাজ করার বিষয়ে নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। অন্যদিকে কয়েকটি দল ১১ দলীয় ঐক্যের আন্দোলনেও থাকার কথা বলছেন। ফলে নতুন জোটের কাঠামো ও রাজনৈতিক অবস্থান নির্ধারণে আগামী দিনের বৈঠকগুলো গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। বিশেষ করে অন্য জোটে থাকা নিয়ে শর্ত, স্থানীয় সরকার নির্বাচনে আসন সমঝোতা ও জুলাই সনদ এবং গণভোটের রায় বাস্তবায়নের আন্দোলনে অংশগ্রহণ, এই তিনটি বিষয় সাত দলের ঐক্যের ভবিষ্যৎ নির্ধারণে বড় ভূমিকা রাখতে পারে। গত শুক্রবার ১১ দলীয় ঐক্যের বৈঠক শেষে জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল হামিদুর রহমান আযাদ বলেছেন, ১১ দল আছে, থাকবে। জুলাই সনদ বাস্তবায়ন না হওয়া পর্যন্ত, গণভোটের রাস্তা না হওয়া পর্যন্ত যে ঐক্য হয়েছে, ওই ঐক্য অটুট রেখে আমরা এগিয়ে যাবো। এসব বিষয়ে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের মহাসচিব গাজী আতাউর রহমান মানবজমিনকে বলেন, আমাদের কোনো বিশেষ দলের ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেয়ার কিছু নেই। এখানে কিছু নীতিমালা ও পলিসি থাকবে। সেগুলো মেনে যারা চলতে পারবেন, তাদের নিয়েই সম্ভাবনা তৈরি হবে। কোনো নির্দিষ্ট দল সম্পর্কে এখানে সুনির্দিষ্টভাবে কোনো সিদ্ধান্ত নেয়া হয়নি। একটি জোট বা ঐক্য গঠিত হলে স্বাভাবিকভাবেই এর কিছু লক্ষ্য থাকে। এখানে হেফাজতের মধ্যস্থতায় নীতিগতভাবে সিদ্ধান্ত হয়েছে, যারা এই ঐক্যে থাকবেন, তারা অন্য কোনো জোট বা রাজনৈতিক বলয়ে থাকতে পারবেন না।
বাংলাদেশ নেজামে ইসলাম পার্টির মহাসচিব মুসা বিন ইযহার বলেন, জোট এখনো চূড়ান্ত হয়নি। বিষয়টি চলমান রয়েছে। গত বৈঠকে নামটি চূড়ান্ত হয়েছে। কিছু নীতিমালা নিয়ে আলোচনা হয়েছে, যা অভ্যন্তরীণ ছিল। আরও কিছু নীতিমালা নিয়ে আলোচনার প্রয়োজন রয়েছে। এসব আলোচনার মাধ্যমে বিষয়টি চূড়ান্ত করা হবে। ১১ দলীয় জোটে থেকেও সাত দলের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার বিষয়ে তিনি বলেন, আমাদের ১১ দলীয় জোটটি ছিল নির্বাচনী জোট। নির্বাচন দু’টি বিষয়ে হয়েছে। একটি হলো জাতীয় নির্বাচন, যার ভিত্তিতে সরকার গঠিত হয়েছে। আরেকটি হলো গণভোটের ফলাফল। সুতরাং, গণভোটের ফলাফল উদ্ধার এবং তা বাস্তবায়নের বিষয়টি সামনে রেখে আমরা ১১ দলের ব্যানারে জনগণের কাছে যাচ্ছি।
সমীকরণ প্রতিবেদক