দীর্ঘ এক দশকের বিতর্ক, কোটি কোটি টাকার গুদাম ভাড়ার বোঝা ও নানা আইনি জটিলতার অবসান ঘটিয়ে ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিন বা ইভিএম ধ্বংসের ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত নিয়েছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। আদালতের মামলা ও বিভিন্ন তদন্ত সংস্থার স্বার্থে প্রয়োজনীয় আলামতটুকু রক্ষা করে অকার্যকর সব ভোটযন্ত্র আইনানুগ প্রক্রিয়ায় নিষ্পত্তির সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে, জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) সেবায় শৃঙ্খলা ফেরাতে অনলাইনে ফরম পূরণের পর নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে বায়োমেট্রিক (আঙুলের ছাপ) না দিলে সেই আবেদনটি আর ঝুলিয়ে না রেখে স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে এনআইডি সার্ভারের সুরক্ষিত 'ইউজার আইডি' ও 'পাসওয়ার্ড' বাইরের ফটোকপির দোকানে ফাঁসের গুরুতর অভিযোগ ওঠায় কোনো কর্মকর্তা এতে জড়িত থাকলে তাকে কঠোর শাস্তির আওতায় আনার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। মঙ্গলবার ইসির একাধিক দায়িত্বশীল কর্মকর্তা এসব তথ্যাদি নিশ্চিত করেছেন।
ভোটযন্ত্রের বিশাল বোঝা:
ইসি সূত্রে জানা গেছে, নির্বাচন কমিশনের কাছে বর্তমানে মোট ১ লাখ ৪৮ হাজার ৪০১টি ইভিএম রয়েছে। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে কোনো নির্বাচনে ব্যবহার না থাকায় এগুলো স্রেফ ভারী বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে। হিসাব অনুযায়ী, বিএমটিএফ ছাড়াও সিলেট অঞ্চলে ২ হাজার ৬০৭টি, রাজশাহী অঞ্চলে ১৩ হাজার ৫৩০টি, রংপুর অঞ্চলে ৪ হাজার ৪০৫টি, ময়মনসিংহ অঞ্চলে ৬ হাজার ৪২৮টি, চট্টগ্রাম অঞ্চলে ৪ হাজার ১৩৫টি, খুলনা অঞ্চলে ৭ হাজার ১২টি, কুমিল্লা অঞ্চলে ৬ হাজার ৮৭৫টি, ফরিদপুর অঞ্চলে ৩ হাজার ৮৮৫টি, বরিশাল অঞ্চলে ৫ হাজার ৮৭টি এবং ঢাকা অঞ্চলে ৭ হাজার ৪২৯টি ইভিএম জমে রয়েছে। এছাড়া নির্বাচন ভবনের বেজমেন্টে এবং দুটি উপজেলা নির্বাচন অফিসে আগুনে ১৫৭টি ইভিএম ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। পাশাপাশি তালিকা থেকে অন্তত ১ হাজার ৫৯৯টি মেশিন ইতোমধ্যে খোয়া গেছে।
কোটি কোটি টাকার ক্ষতি: ব্যবহার না থাকলেও কেবল ফেলে রাখার কারণেই এ যন্ত্রগুলোর পেছনে কমিশনকে প্রতি মাসে বিপুল টাকা গুনে যেতে হচ্ছে। বিএমটিএফের ওয়্যারহাউজে রাখা ৮৬ হাজার ২৩৩টি ইভিএমের বকেয়া ভাড়াই জমে দাঁড়িয়েছে প্রায় ৭০ কোটি টাকায়। এর বাইরে দেশের নানা প্রান্তের মাঠপর্যায়ে বিভিন্ন গোডাউন ভাড়ার জন্য কমিশনকে প্রতি মাসে গুনতে হচ্ছে প্রায় ৩০ লাখ টাকা। বিপুল অর্থের এই অপচয় বন্ধ করতেই ইভিএম ধ্বংসের এই কঠোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। ইভিএমের অতীত যাত্রা ও আইনি বিলুপ্তি: বাংলাদেশে নির্বাচনে ইভিএম ব্যবহারের যাত্রা শুরু হয় ২০১১ সালে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন নির্বাচনে। এরপর ২০১৮ সালে কে এম নূরুল হুদা কমিশন ৩ হাজার ৮২৫ কোটি টাকা খরচে দেড় লাখ ইভিএম কেনে। পরবর্তীতে কাজী হাবিবুল আউয়াল কমিশন দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনে ১৫০টি আসনে ইভিএম ব্যবহারের জন্য আরও নতুন প্রকল্প চাইলে অর্থসংকটে সরকার তা নাকচ করে। এরপর পুরনো ইভিএম সচল করতে বিএমটিএফ আরও ১ হাজার ২৬০ কোটি টাকা দাবি করলে তা-ও সম্ভব হয়নি।
সর্বশেষ ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পর এএমএম নাসির উদ্দিনের নেতৃত্বাধীন নতুন কমিশন সব রাজনৈতিক দলের মতামতের ভিত্তিতে সংসদ ও স্থানীয় সরকার নির্বাচনের আইন-বিধি থেকে ইভিএম ব্যবহারের বিধান পুরোপুরি বাতিল করে দেয়। ফলে যন্ত্রগুলো প্রযুক্তিগত ও আইনি- উভয় দিক থেকেই পুরোপুরি অকার্যকর হয়ে পড়ে। আলামত রেখে ধ্বংসের নির্দেশ: ইভিএমের ভবিষ্যৎ ব্যবহার সম্পর্কে ইসি সচিব আখতার আহমেদ জানান, ইভিএম নিয়ে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) তদন্ত, অডিট বিভাগের নিরীক্ষা এবং কয়েকটি নির্বাচনের পর্যালোচনা চলছে।
এসব বিষয় মাথায় রেখেই আইনি প্রক্রিয়ায় ইভিএম ধ্বংস করা হবে। নির্বাচন কমিশনার আবুল ফজল মো. সানাউল্লাহ বলেন, কমিশন চায় দ্রুত সময়ের মধ্যে ইভিএমগুলো নিষ্পত্তি করা হোক। তবে দুদকসহ বিভিন্ন সংস্থার তদন্ত এবং অন্যান্য আইনি প্রক্রিয়ার জন্য যেসব আলামত সংরক্ষণ করা প্রয়োজন, সেগুলো রেখে বাকি সব অকার্যকর মেশিন দ্রুত ধ্বংসের ব্যবস্থা নেওয়া হবে। বায়োমেট্রিক না দিলে আবেদন বাতিল: অনলাইন ভোটার নিবন্ধনে শৃঙ্খলা আনতে ইসি নতুন নিয়ম চালু করছে। এখন থেকে ভোটার নিবন্ধনের জন্য অনলাইনে ফরম পূরণ করার পর নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে বায়োমেট্রিক (আঙুলের ছাপ) না দিলে আবেদনটি সিস্টেমে স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল হয়ে যাবে। সিদ্ধান্তটি বাস্তবায়নের জন্য ইসি সচিব আখতার আহমেদ ইতোমধ্যে সিস্টেম ম্যানেজারকে নির্দেশনা দিয়েছেন
পাসওয়ার্ড শেয়ারে কঠোর শাস্তি:
জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) সার্ভারের ইউজার আইডি ও পাসওয়ার্ড বাইরের ফটোকপির দোকানেও মিলছে- এমন তথ্য পাওয়ার পর কঠোর ব্যবস্থা নিয়েছে কমিশন। ইসি সচিব চিঠিতে স্পষ্ট জানিয়েছেন, এনআইডি সংশোধন সংক্রান্ত কার্যক্রমে ব্যবহৃত ইউজার আইডি ও পাসওয়ার্ড কারও সঙ্গে শেয়ার করা যাবে না। এর ব্যত্যয় ঘটলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাকে ব্যক্তিগতভাবে দায় নিতে হবে এবং তাকে শাস্তির মুখোমুখি হতে হবে। একই সঙ্গে এনআইডি সেবা গতিশীল করতে এসওপি পুনর্গঠনের কাজ
সমীকরণ প্রতিবেদন