স্বাধীনতার পরপরই ঝিনাইদহ মহকুমাজুড়ে নেমে এসেছিল এক অমানসিক বিভীষিকা। ১৯৭২ থেকে ১৯৭৪ সালের মধ্যবর্তী সময়ে তৎকালীন ‘জাতীয় রক্ষীবাহিনী’র সমান্তরাল অভিযানে ঠিক কত শত তাজা প্রাণ অকালে নিভে গিয়েছিল, কিংবা কত নিথর দেহ গুম হয়ে গিয়েছিল- পাঁচ দশক পেরিয়েও তার কোনো সুনির্দিষ্ট হিসাব মেলেনি। তবে প্রত্যক্ষদর্শী ও ভুক্তভোগীদের দাবি, কেবল ঝিনাইদহ অঞ্চলেই এই সংখ্যা ৫ থেকে ৬ শ ছাড়িয়ে যাবে। ইতিহাসের সেই নির্মম ক্ষত আর প্রিয়জনের লাশ না পাওয়ার বেদনা আজও বয়ে বেড়াচ্ছেন ঝিনাইদহের শত শত পরিবার।
এমনি এক ট্র্যাজিক ঘটনার সাক্ষী বংকিরা গ্রামের গর্ভবতী ১৮ বছরের রশিদা বেগম। ১৯৭৪ সালের ৪ নভেম্বর আত্মগোপনে থাকা স্বামী আমজাদ হোসেনের সাথে দেখা করতে কোটচাঁদপুরের বহরমপুর গ্রামে যান তিনি। সঙ্গে ছিলেন সদ্য স্নাতক পাস করা ভাই মহিউদ্দীন। কিন্তু স্থানীয় এক চোগলখোরের সংবাদের ভিত্তিতে সেখানে হানা দেয় রক্ষীবাহিনীর চৌকস দল। সেদিনই গ্রেপ্তার হন রশিদা, তাঁর স্বামী ও ভাই। আজ ৫২ বছর পার হতে চললেও ওই তিন স্বজনের আর কোনো খোঁজ পায়নি পরিবার। সন্তানদের অপেক্ষায় কাঁদতে কাঁদতে একপর্যায়ে চিরতরে দৃষ্টিশক্তি হারিয়ে মারা যান রশিদা-মহিউদ্দীনের মা রিজিয়া খাতুন।
সেদিনের প্রত্যক্ষদর্শী ও জীবিত ভাই আতিয়ার রহমান বিশ্বাস আজও কান্নাভেজা কণ্ঠে স্মরণ করেন, কীভাবে চোরকোল গ্রামের ভয়াল ‘টেরিতলা’ ও লক্ষ্মীপুর গ্রামের কটোতলার টর্চার সেলে নিয়ে নিরীহ মানুষদের ওপর নির্মম শারীরিক নিপীড়ন চালানো হতো। ঐতিহাসিক তথ্য ও অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, শহরের চাকলাপাড়া ও জেলা পরিষদের তৎকালীন ডাকবাংলোয় ছিল রক্ষীবাহিনীর শক্ত ঘাঁটি বা ক্যাম্প।
ক্যাম্পের ইনচার্জ মিজানুর রহমান ও আমজাদ হোসেনসহ তৎকালীন কতিপয় আওয়ামী লীগ নেতাদের প্রত্যক্ষ মদদে এই হত্যাযজ্ঞ চলে বলে অভিযোগ ভুক্তভোগীদের। স্থানীয় বয়োজ্যেষ্ঠ অধ্যাপক কাজী মঞ্জুরুল হক জানান, মধ্যরাতে চাকলাপাড়ার ক্যাম্প থেকে ভেসে আসা নির্মম আর্তচিৎকার আর করুণ আকুতি এখনো তাঁর মনে ভীতির সঞ্চার করে। বন্দিদের হত্যার পর মরদেহ নিক্ষেপ করা হতো ক্যাম্পের ভেতরের এক গভীর পাতকুয়ায় কিংবা নিকটস্থ পুকুরে।
শুধু হত্যা বা গুম নয়, এই বাহিনীর অমানসিক নির্যাতনে সারাজীবনের জন্য পঙ্গুত্ব বরণ করতে হয়েছিল অগণিত মানুষকে। বংকিরা গ্রামের লুৎফর রহমান, যার বুকের পাজর ভেঙে দেওয়া হয়েছিল, আজ বৃদ্ধ বয়সেও সেই পঙ্গুত্বের যাতনা বয়ে বেড়াচ্ছেন। একইভাবে বংকিরা, ওয়াড়িয়া ও চোরকোল গ্রামের বহু নিরীহ মানুষ পঙ্গু হয়ে মানবেতর জীবন কাটিয়েছেন।
কালীগঞ্জের বাম রাজনীতির জ্যেষ্ঠ নেতা মোজাম্মেল হোসেন মণ্টুর দেওয়া পরিসংখ্যান অনুযায়ী, তৎকালীন বৃহত্তর যশোর অঞ্চলে রক্ষীবাহিনীর হাতে প্রায় ১২০০ মানুষ নিহত বা গুম হন, যার মধ্যে শুধু ঝিনাইদহেই মারা যান ৫০০-৬০০ জন। ১৯৭৪ সালে কালীগঞ্জের ওয়াজেদ আলী ছিলেন ঝিনাইদহের প্রথম রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ডের শিকার। এরপর কাষ্টভাঙ্গার মনা, কামারাইলের রফিকুল, বলরামপুরের হায়দার আলী গাজী, শৈলকূপার রামচন্দ্রপুর গ্রামে একই দিনে ৪ জাসদ কর্মীকে হত্যাসহ দীর্ঘ তালিকা তৈরি হয়, যাদের অনেকের মরদেহ পরিবার কখনোই ফেরত পায়নি।
এমনকি একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা হওয়া সত্ত্বেও কামালুজ্জামানকে রক্ষীবাহিনীর হাতে ১৪ মাস কারাভোগ করতে হয়েছিল, যা তৎকালীন আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থার চরম স্বেচ্ছাচারিতাকেই নির্দেশ করে। সম্প্রতি সরকার গুম সংক্রান্ত অধ্যাদেশ ও তদন্ত কমিশন গঠন করায় ঝিনাইদহের ভুক্তভোগী পরিবারগুলোতে বিচার পাওয়ার নতুন আশার সঞ্চার হয়েছে।
হরিণাকুণ্ডুর বাকচুয়া গ্রামের ৮৫ বছরের বৃদ্ধ ইব্রাহিম খলিল ও স্থানীয় বাসিন্দারা রাষ্ট্রীয়ভাবে এই ঐতিহাসিক তাণ্ডবের সঠিক তদন্ত ও দায়ীদের বিরুদ্ধে বিচার বিভাগীয় ব্যবস্থার দাবি জানিয়েছেন। আইনি প্রতিকারের বিষয়ে ঝিনাইদহ জেলা জজ আদালতের পিপি অ্যাডভোকেট এস এম মশিয়ূর রহমান (যিনি নিজেও সে সময় নির্যাতনের শিকার) জানান, সুনির্দিষ্ট কারণ উল্লেখ করে বিলম্বে হলেও সংক্ষুব্ধ পরিবারগুলো এখন থানায় কিংবা আদালতে মামলা দায়ের করলে রাজ্য ও আইনগত সব ধরনের সহায়তা দেওয়া সম্ভব।
অন্যদিকে, আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান এবং প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক সহকারী রাশেদ খান এ বিষয়ে আশ্বস্ত করে জানিয়েছেন, ১৯৭২-৭৪ সালের সেই ঘটনাগুলোতে ক্ষতিগ্রস্ত বা সংক্ষুব্ধ পরিবারগুলো আইনের আশ্রয় নিতে চাইলে সরকারের পক্ষ থেকে কোনো বাধা থাকবে না। দেশের প্রচলিত আদালত ও আইন সবার জন্যই উন্মুক্ত এবং বিষয়টিকে ইতিবাচকভাবেই দেখা হবে।
ঝিনাইদহ অফিস