দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ার মধ্যে এইচএসসি ও সমমান পরীক্ষা নেওয়া এবং পরীক্ষার্থীদের ‘ফার্মের মুরগি’ সম্বোধন করার অভিযোগে গতকাল বিক্ষোভ করেছেন শিক্ষার্থীরা। এ সময় শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলনের পদত্যাগ দাবিতে রাজধানীর বিভিন্ন পয়েন্ট ও গাজীপুর, সাভার, উত্তরা, রাজশাহী, চট্টগ্রাম, বরিশাল, ময়মনসিংহ, বগুড়াসহ বিভিন্ন জেলায় সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ দেখিয়েছেন হাজার হাজার শিক্ষার্থী। দিনভর তাদের আন্দোলন চলে। এতে যান চলাচল বন্ধ হয়ে রাজধানীর বিভিন্ন পয়েন্টে তীব্র যানজটের সৃষ্টি হয়। ভোগান্তিতে পড়েন নগরবাসী। দেশের বিভিন্ন শিক্ষা বোর্ডের সামনেও বিক্ষোভ করেন শিক্ষার্থীরা। গত সোমবারের এইচএসসি পরীক্ষায় পদার্থবিজ্ঞান প্রথম পত্র বিষয়ের ত্রুটিপূর্ণ প্রশ্নপত্রের অভিযোগও করেন ছাত্র-ছাত্রীরা। শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের পরিপ্রেক্ষিতে গতকাল জাতীয় সংসদে বক্তব্য প্রদানকালে দুঃখ প্রকাশ করেন শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলন। এদিকে আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীরা আজ ‘মার্চ টু শিক্ষা মন্ত্রণালয়’ কর্মসূচি পালন করবেন বলে জানা গেছে। গতকাল বেলা সাড়ে ১১টার দিকে ঢাকা কলেজসহ রাজধানীর বিভিন্ন কলেজের শিক্ষার্থীরা সাইন্সল্যাব মোড়ে অবরোধ করেন। এ সময় গুরুত্বপূর্ণ এ সড়কে যান চলাচল বন্ধ হয়ে গেলে আশপাশে তীব্র যানজটের সৃষ্টি হয়। অনেক যাত্রীকে হেঁটে গন্তব্যে যেতে দেখা যায়। বেলা দেড়টার দিকে সেখান থেকে সরে তাঁরা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি চত্বরের সামনে যায়। পরে সেখান থেকে পুলিশ সরিয়ে দিলে তারা পলাশীর মোড় হয়ে বকশীবাজারে ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের সামনে গিয়ে অবরোধ করেন। এ সময় তারা দফা এক দাবি জানিয়ে নানান স্লোগান দেন আন্দোলনকারীরা। ঢাকা বোর্ডের প্রধান ফটকে শিক্ষার্থীদের ধাক্কাধাক্কি করতেও দেখা যায়। ঢাকা সিটি কলেজ, ঢাকা আইডিয়াল কলেজ, সরকারি বাঙলা কলেজ, সিদ্ধেশ্বরী গার্লস কলেজ, লালমাটিয়া স্কুল অ্যান্ড কলেজ, রাজারবাগ পুলিশ লাইনস স্কুল অ্যান্ড কলেজ, বিএফ শাহীন কলেজসহ বিভিন্ন কলেজের শিক্ষার্থীরা এই বিক্ষোভে অংশ নেন। ঢাকা আইডিয়াল কলেজের বিজ্ঞান বিভাগের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক শিক্ষার্থী বলেন, ‘প্রতিকূল আবহাওয়ার কারণে আমাদের অনেক শিক্ষার্থী পরীক্ষা দিতে পারেননি। আবার অনেকে পরীক্ষার হলে যাওয়ার সময় রাস্তায় পড়ে গেছেন। প্রবেশপত্র ভিজে নষ্ট হয়ে গেছে। এসবের দায় কি শিক্ষামন্ত্রী নেবেন? এদিকে শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগসহ তিন দাবিতে আন্দোলনরত এইচএসসি পরীক্ষার্থীরা নতুন কর্মসূচি ঘোষণা করেছেন। সে অনুযায়ী, আজ বুধবার ‘মার্চ টু শিক্ষা মন্ত্রণালয়’ কর্মসূচি পালন করবেন তারা। বিকালে উত্তরায় আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের পক্ষ থেকে এই ঘোষণা দেওয়া হয়। শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগসহ তিন দফা দাবিতে গতকাল বিকালে দ্বিতীয়বারের মতো সায়েন্স ল্যাব মোড় অবরোধ করেন ছাত্র-ছাত্রীরা। সোয়া এক ঘণ্টার বেশি অবরোধ করে তাঁরা সাড়ে ৫টার দিকে সায়েন্স ল্যাব মোড় ছেড়ে সংসদ অভিমুখে যাত্রা করেন। শিক্ষার্থীদের ঘোষিত তিন দফা দাবির মধ্যে রয়েছে- শিক্ষামন্ত্রীকে অবিলম্বে পদত্যাগ করতে হবে এবং অসংগতিপূর্ণ কথাবার্তার জন্য ক্ষমা চাইতে হবে। যারা ১৩ জুলাই অস্বস্তিকর পরিবেশে পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করেছে এবং যারা পরীক্ষা দিতে পারেনি- সব শিক্ষার্থীর পুনরায় পরীক্ষা নিতে হবে এবং ১৫ জুলাইয়ের পরীক্ষা স্থগিত করে পরীক্ষার নতুন রুটিন প্রকাশ করতে হবে। দাবি না মেনে নেওয়া পর্যন্ত আন্দোলন চলবে বলে জানান শিক্ষার্থীরা। বিকালে জাতীয় সংসদে প্রশ্নোত্তর পর্বে শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলন শিক্ষার্থীদের পড়ার টেবিলে ফেরার অনুরোধ জানান। এইচএসসির পদার্থবিজ্ঞান বিষয়ের ৬ ও ৭ নম্বর ভুল প্রশ্নের জন্য পরীক্ষার্থীরা পূর্ণ নম্বর পাবেন জানিয়ে শিক্ষামন্ত্রী বলেন, যেসব কেন্দ্রে সমস্যা হয়েছে, সেসব কেন্দ্রে প্রয়োজনে পুনরায় পরীক্ষা নেওয়া হবে। মন্ত্রীর এই বক্তব্যের পর শিক্ষার্থীরা সায়েন্স ল্যাব থেকে জাতীয় সংসদ অভিমুখে যাত্রা করেন। শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগসহ তিন দাবিতে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা জাতীয় সংসদ ভবনে প্রবেশের চেষ্টা করলে লাঠিচার্জ করে তাদের সরিয়ে দেয় পুলিশ। এতে বেশ কয়েকজন শিক্ষার্থী আহন হন। জাতীয় সংসদের অধিবেশন চলাকালীন সংসদের সামনে অবস্থান নিয়ে ‘ভুয়া’, ‘ভুয়া’ স্লোগান দেন তারা। দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ার মধ্যেও পরীক্ষা নেওয়ার সিদ্ধান্তের বিষয়ে মন্ত্রী বলেন, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলেছিলেন, আবহাওয়া ভালো থাকবে। তাই পরীক্ষা বহাল রাখা হয়েছিল। শিক্ষামন্ত্রী আরও বলেন, আমার ব্যক্তিগত কোনো মন্তব্য নিয়ে অনেকেই আপত্তি করেছেন। এ ব্যাপারে আমি বলতে চাই, আমি উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে কাউকে কিছু বলি নাই। যদি কেউ কষ্ট পেয়ে থাকে, দুঃখ প্রকাশ করছি। আমাদের নিজস্ব প্রতিবেদক ও প্রতিনিধিরা জানান, এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষা পেছানোর দাবিতে রংপুরে বিক্ষোভ করেছে পরীক্ষার্থীরা। গতকাল জিলা স্কুল মোড় থেকে বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শত শত পরীক্ষার্থী বৈরী আবহাওয়ার মধ্যে পরীক্ষা নেওয়ার প্রতিবাদে স্লোগান দিতে থাকেন। সেই সঙ্গে বোর্ড কর্মকর্তাসহ শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের দাবি জানান। চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডের সামনে তিন দফা দাবিতে সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করে এইচএসসি পরীক্ষার্থীরা। দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ার মধ্যে এইচএসসি ও সমমান পরীক্ষা বাতিল, গত ১২ ও ১৩ জুলাই প্রতিকূল আবহাওয়ার কারণে যারা পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করতে পারেনি, তাদের জন্য পুনরায় পরীক্ষা গ্রহণের ব্যবস্থার দাবি জানান তারা। বিরূপ আবহাওয়ার মধ্যেও এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষা নেওয়ার প্রতিবাদে রাজশাহী শিক্ষা বোর্ড চত্বরে বিক্ষোভ করেন পরীক্ষার্থীরা। শিক্ষামন্ত্রীর বিভিন্ন সিদ্ধান্ত ও মন্তব্যের বিরুদ্ধে ক্ষোভ জানায় তারা। দুর্যোগপূর্ণ পরিস্থিতির মধ্যেই এইচএসসি পরীক্ষা গ্রহণের প্রতিবাদ ও শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগসহ ৩ দফা দাবিতে খুলনায় বিক্ষোভ সমাবেশ করেছেন বিভিন্ন কলেজের শিক্ষার্থীরা। তিন দফা দাবিতে কুমিল্লা শিক্ষা বোর্ডের সামনে অবস্থান কর্মসূচি ও বিক্ষোভ করেন এইচএসসির শতাধিক পরীক্ষার্থী। পুলিশি বাধা উপেক্ষা করে তারা কুমিল্লা শিক্ষা বোর্ডের প্রধান ফটকের সামনে অবস্থান করেন। এইচএসসি ও সমমান পরীক্ষার্থীরা দিনাজপুর-ফুলবাড়ী মহাসড়ক অবরোধ করেন। তাদের আন্দোলনে দিনাজপুরের রেলওয়ে স্টেশনে পঞ্চগড় এক্সপ্রেস ট্রেন আটকা পড়ে। এহছানুল হক মিলনের পদত্যাগ দাবি করে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার শিক্ষার্থীরা প্রেস ক্লাবের সামনে বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশ করেছে। শিক্ষার্থীদের আন্দোলন এবং চলমান এইচএসসি ও সমমান পরীক্ষা নিয়ে গতকাল সকালে ভার্চুয়াল বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। এতে শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলনসহ বিভিন্ন শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যানসহ সংশ্লিষ্টরা অংশ নেন। বৈঠকে অংশ নেওয়া নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একটি শিক্ষা বোর্ডের কর্মকর্তা বাংলাদেশ প্রতিদিনকে জানান, পূর্বঘোষিত সিদ্ধান্ত মতে চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ড ছাড়া সারা দেশে চলমান এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষা চলবে। পরীক্ষা স্থগিতের কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি। প্রসঙ্গত, চলমান বন্যা পরিস্থিতির মধ্যে দেশে এখন এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষা চলছে। বন্যার কারণে চট্টগ্রাম বোর্ডের ১৩, ১৫ ও ১৬ জুলাইয়ের পরীক্ষা স্থগিত করা হলেও অন্য সব বোর্ডের পরীক্ষা চলমান রয়েছে।
সমীকরণ প্রতিবেদন