২০০১ সালে ক্ষমতায় আসার পর পদ্মাসহ আশপাশের ছয়টি নদীর ওপর নির্ভরশীল কোটি মানুষের জীবনজীবিকার কথা চিন্তা করে ‘পদ্মা ব্যারাজ প্রকল্প’-এর উদ্যোগ নিয়েছিলেন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী, বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া। প্রায় ২৫ বছর পর সেই উদ্যোগই বাস্তবায়নের পথে এক ধাপ এগোল, অনুমোদন পেল বহু প্রতীক্ষিত পদ্মা ব্যারাজ প্রকল্প। ভারতের ফারাক্কা ব্যারাজের নেতিবাচক প্রভাব থেকে বাংলাদেশকে বাঁচাতে প্রথম পর্যায়ে পদ্মা ব্যারাজ প্রকল্প হাতে নিয়েছে সরকার।
গতকাল সচিবালয়ে প্রধানমন্ত্রী, একনেক চেয়ারপারসন তারেক রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় ৩৬ হাজার ৬৯৫ কোটি ৭২ লাখ টাকা ব্যয়ে মোট ৯টি প্রকল্প অনুমোদন দেওয়া হয়। এর মধ্যে পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের ‘পদ্মা ব্যারাজ (প্রথম পর্যায়)’ শীর্ষক প্রকল্পটি বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে। ৩৪ হাজার ৪৯৭ কোটি ২৫ লাখ টাকা ব্যয়ের পদ্মা ব্যারাজ প্রকল্পটি পুরোপুরি সরকারি অর্থায়নে বাস্তবায়ন করা হবে। বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড ২০৩৩ সালের জুনের মধ্যে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করবে। পরিকল্পনা প্রস্তাব অনুযায়ী, রাজবাড়ীর পাংশা উপজেলার পদ্মা নদীতে ২ দশমিক ১ কিলোমিটার দীর্ঘ মূল বাঁধ নির্মাণ করা হবে। এর মাধ্যমে পদ্মার ওপর নির্ভরশীল দেশের প্রায় ৩৭ শতাংশ জমিতে পানির সমস্যা সমাধানের লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে। পানিপ্রবাহ বৃদ্ধি করে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের পাঁচটি নদী পুনরুজ্জীবিত করা হবে। এতে সুন্দরবন অঞ্চল থেকে আসা লবণাক্ততা কমবে এবং জীববৈচিত্র্যের ভারসাম্য রক্ষা পাবে। পাশাপাশি কৃষি ও মাছের উৎপাদন বাড়বে বলে আশা করা হচ্ছে।
পরিকল্পনা মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে বৃহত্তর কুষ্টিয়া, ফরিদপুর, যশোর, খুলনা, বরিশাল, পাবনা ও রাজশাহী অঞ্চলের চাষযোগ্য প্রায় ২৯ লাখ হেক্টর কৃষিজমিতে প্রয়োজনীয় সেচের পানি সরবরাহ করা যাবে। এতে প্রায় ২৪ লাখ টন ধান এবং ২ দশমিক ৩৪ লাখ টন মাছের উৎপাদন বৃদ্ধির প্রত্যাশা করা হচ্ছে। এছাড়া প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে বছরে প্রায় ৮ হাজার কোটি টাকার সামাজিক ও অর্থনৈতিক সুবিধা পাওয়া যাবে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।
এদিকে একনেক সভা শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে পানিসম্পদমন্ত্রী শহীদউদ্দীন চৌধুরী এ্যানি বলেন, ‘পদ্মা ব্যারাজ আমাদের স্বার্থের ব্যাপার। ভারতের সঙ্গে আলোচনার কিছু নেই। পদ্মা ব্যারাজ হলে দেশের মোট আয়তনের এক তৃতীয়াংশ অর্থাৎ ২৪ জেলার প্রায় ৭ কোটি মানুষ উপকার পাবে।’ একনেকে অনুমোদিত প্রকল্পগুলোর মোট ব্যয়ের মধ্যে সরকারি অর্থায়ন ৩৬ হাজার ৪৯০ কোটি ৯৩ লাখ এবং সংস্থার নিজস্ব অর্থায়ন ২০৪ কোটি ৭৯ লাখ টাকা। এর মধ্যে নতুন প্রকল্প তিনটি, সংশোধিত প্রকল্প পাঁচটি এবং একটি মেয়াদ বৃদ্ধি প্রকল্প রয়েছে। এ ছাড়া সভায় আরও কয়েকটি প্রকল্পে ব্যয় বৃদ্ধি ও নতুন বরাদ্দ অনুমোদন দেওয়া হয়েছে।
সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের ‘চট্টগ্রাম মুসলিম ইনস্টিটিউট সাংস্কৃতিক কমপ্লেক্স স্থাপন (দ্বিতীয় সংশোধন)’ প্রকল্পের ব্যয় ২৯০ কোটি ৩৫ লাখ ৫০ হাজার টাকা থেকে ৮ কোটি ৯৬ লাখ টাকা বাড়ানোর প্রস্তাব অনুমোদন করা হয়েছে। একই মন্ত্রণালয়ের ‘গণগ্রন্থাগার অধিদপ্তরের বহুতল ভবন নির্মাণ (দ্বিতীয় সংশোধন)’ প্রকল্পের ব্যয় ৬২০ কোটি ৮৮ লাখ টাকা থেকে ৫৯ কোটি ৫৮ লাখ টাকা বাড়ানোর প্রস্তাব অনুমোদন করা হয়েছে। স্বাস্থ্য শিক্ষা ও পরিবারকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের ‘জেলা শহরে বিদ্যমান মা ও শিশুকল্যাণ কেন্দ্রকে ৩০ শয্যাবিশিষ্ট মা ও শিশুকল্যাণ কেন্দ্রে উন্নীতকরণ/পুনর্নির্মাণ (প্রথম ফেজ)’ প্রকল্পের জন্য ১ হাজার ৩২৯ কোটি ৫৩ লাখ ৩৫ হাজার টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব অনুমোদন করা হয়েছে।
তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের ‘হাই-টেক সিটি-২-এর সহায়ক অবকাঠামো নির্মাণ (তৃতীয় সংশোধন)’ প্রকল্পের ব্যয় ৪৩৩ কোটি ৯৮ লাখ ৩৬ হাজার টাকা থেকে ২ কোটি ২০ লাখ ৩৫ হাজার টাকা বাড়ানোর প্রস্তাব অনুমোদন করা হয়েছে। সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের ‘সরকারি শিশু পরিবার এবং ছোটমণি নিবাস নির্মাণ/পুনর্র্নিমাণ (দ্বিতীয় সংশোধন)’ প্রকল্পের ব্যয় ৫৯৩ কোটি ৪৭ লাখ ৩৫ হাজার টাকা থেকে ২০৮ কোটি ২৬ লাখ ৭১ হাজার টাকা বাড়ানোর প্রস্তাব অনুমোদন করা হয়েছে। প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীনে ‘সাভার সেনানিবাসে সৈনিকদের আবাসন সমস্যা নিরসনে এসএম ব্যারাক কমপ্লেক্স নির্মাণ’ প্রকল্প বাস্তবায়নে ৩৮৫ কোটি ১৩ লাখ ১৫ হাজার টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব অনুমোদন করা হয়েছে। গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের ‘চট্টগ্রাম সিটি আউটার রিং রোড (পতেঙ্গা হতে সাগরিকা) (পঞ্চম সংশোধন)’ প্রকল্পের ব্যয় ৩ হাজার ৩২৪ কোটি ১৫ লাখ টাকা থেকে ৭৭ কোটি ৯২ লাখ ৫১ হাজার টাকা বাড়ানোর প্রস্তাব অনুমোদন করা হয়েছে।
এছাড়া বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের ‘ময়মনসিংহ কম্বাইন্ড সাইকেল বিদ্যুৎ কেন্দ্রে গ্যাস সরবরাহের জন্য ধনুয়া হতে ময়মনসিংহ পর্যন্ত গ্যাস পাইপলাইন নির্মাণ (প্রথম সংশোধন)’ প্রকল্পের ব্যয় ২০৪ কোটি ৭৯ লাখ ৪৭ হাজার টাকা বাড়ানোর প্রস্তাব অনুমোদন করা হয়েছে। সভায় সিদ্ধান্ত হয়, প্রাথমিকভাবে ১০ জেলার ১০ উপজেলায় বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুদের স্বাস্থ্য ও পুনর্বাসন সেবা নিশ্চিত করতে ‘শিশু স্বর্গ’ প্রকল্প চালু করা হবে। দ্রুত এ কার্যক্রম শুরু হবে বলেও জানানো হয়।
সমীকরণ প্রতিবেদন