দুর্নীতির সঙ্গে আপস করতে চান না বলে জেলা প্রশাসকদের বার্তা দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। পাশাপাশি জনগণকে দেওয়া সরকারের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে জেলা প্রশাসকদের তৎপর হওয়ার তাগিদ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। গতকাল রোববার জেলা প্রশাসক সম্মেলনের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী বলেন, 'সুশাসন বর্তমান সরকারের রাষ্ট্র পরিচালনার মূল ভিত্তি আমরা করতে চাইছি। সুশাসনের জন্য প্রয়োজন দক্ষ ব্যবস্থাপনা, যোগ্য নেতৃত্ব এবং অবশ্যই জবাবদিহিতা। দুর্নীতির বিরুদ্ধে সরকারের অবস্থান পরিষ্কার। সেটি হচ্ছে আমরা কম্প্রমাইজ করতে চাই না দুর্নীতির সঙ্গে।
এদিন সকাল সাড়ে ১০টায় রাজধানীর ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে চার দিনব্যাপা জেলা প্রশাসক (ডিসি) সম্মেলনের উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়ে বিএনপি সরকার গঠনের পর এটিই প্রথম ডিসি সম্মেলন। দেশের ৬৪ জেলার ডিসি এবং বিভাগীয় কমিশনারদের সামনে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘নির্বাচনি ইশতেহার এবং জনগণের সামনে স্বাক্ষরিত যে জুলাই সনদ, এটার প্রতিটি দফা প্রতিটি অঙ্গীকার পর্যায়ক্রমে আমরা বাস্তবায়ন করতে চাই। আমরা এ ব্যাপারে বদ্ধপরিকর। আমি আশা করব, আপনারা আপনাদের মেধা ও যোগ্যতা দিয়ে জনগণের কাছে দেওয়া সরকারের প্রতিটি প্রতিশ্রুতি দক্ষতার সঙ্গে বাস্তবায়নে ইনশাআল্লাহ ভূমিকা রাখতে সক্ষম হবেন।’
মাঠ প্রশাসনের এই শীর্ষ কর্মকর্তাদের উদ্দেশে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আপনারা রাষ্ট্র পরিচালনায় সর্বোচ্চ প্রশাসনিক স্তরে অবস্থান করছেন। একটি শক্তিশালী জবাবদিহিমূলক আইনসম্মত এবং জনবান্ধব রাষ্ট্র ব্যবস্থা গড়ে তোলার ক্ষেত্রে আপনারাই হচ্ছেন সরকারের অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি।’ নির্দেশনামূলক বক্তব্যে সরকারপ্রধান বলেন, ‘প্রয়োজনের অতিরিক্ত আইন কানুন ও জটিলতাকে অজুহাত হিসেবে আমরা ব্যবহার না করি বরং বাস্তবসম্মত কার্যকর ও জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট সিদ্ধান্ত গ্রহণের মানসিকতা আমরা প্রশাসনের সব পর্যায়ে গড়ে তোলার চেষ্টা করি। যাতে করে জনগণ সময়মতো সরকারের প্রতিটি কর্মসূচির প্রত্যাশিত যে সুফল লাভ করতে পারে।’ সম্মেলনের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে সরকারের উন্নয়নের কর্মকাণ্ডের ওপর একটি ভিডিও চিত্র প্রদর্শন করা হয়। এ সম্মেলনে চলাকালে বিভাগীয় কমিশনার ও জেলা প্রশাসকরা রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন, স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ এবং প্রধান বিচারপতি জুবায়ের রহমান চৌধুরীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করবেন।
সততা-মেধাই পদোন্নতির মূলনীতি :
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আমরা চাই সততা, মেধা এবং দক্ষতাই হবে জনপ্রশাসনের নিয়োগ বদলি কিংবা পদোন্নতির মূলনীতি। স্বচ্ছতা এবং দ্রুততার সঙ্গে শূন্য পদে জনবল নিয়োগ, শক্তিশালী পাবলিক সার্ভিস কমিশন গঠন, বেসরকারি সার্ভিস রুল প্রণয়নসহ সর্বত্র প্রশাসনিক কাঠামোর কার্যকারিতা জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে সরকার দৃঢ় প্রতিজ্ঞ।’ জেলা প্রশাসকদের মাঠপর্যায়ে ‘সরকারের দূত’ বলে আখ্যায়িত করে সরকারপ্রধান বলেন, ‘এই সম্মেলন শুধু আনুষ্ঠানিক মতবিনিময়ের জায়গা হওয়া উচিত নয়। বরং এটি এমন একটি পরিসর যেখানে মাঠ প্রশাসনের বাস্তব অভিজ্ঞতা, সীমাবদ্ধতা প্রয়োজন এবং উদ্ভাবনী চিন্তা সরাসরি জাতীয় পর্যায়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় প্রতিফলিত হতে পারে বা হওয়া উচিত।’
নিয়মিত বাজার তদারকির তাগিদ :
দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ ও বাজারের শৃঙ্খলা বজায় রাখতে জেলা প্রশাসকদের সক্রিয় থাকার তাগিদ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। একইসঙ্গে কৃষকের উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা যে অত্যন্ত জরুরি সে কথাও মনে করিয়ে দিয়েছেন তিনি। তারেক রহমান বলেন, ‘ইচ্ছামতো যাতে কেউ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্য বাড়াতে না পারে কিংবা যে প্রবণতাটা আমরা দেখি বিভিন্ন সময় মজুতদারি বা কারসাজির মাধ্যমে বাজারে অস্থিতিশীলতা সৃষ্টি করতে না পারে, কোনো ধরনের সিন্ডিকেট বা কৃত্রিম সংকট সৃষ্টির অপচেষ্টা কেউ করতে না পারে, এ জন্য নিয়মিত বাজার তদারকি জোরদার করা প্রয়োজন।’ তিনি বলেন, ‘কৃষকের জন্য সার, বীজ, সংরক্ষণ সুবিধা এবং বাজারজাতকরণের উপযোগী পরিবেশ নিশ্চিত করাও আমাদের জন্য জরুরি। কৃষিকে শুধু উৎপাদনের বিষয় হিসেবে নয় বরং গ্রামীণ জীবিকা, খাদ্য নিরাপত্তা, কর্মসংস্থান, গ্রামীণ জনগণের শহরমুখিতার হ্রাস এবং স্থানীয় অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার নিয়ামক হিসেবে আমার মনে হয় দেখা প্রয়োজন।’
ভ্রাম্যমাণ আদালত দৃশ্যমান করার তাগিদ :
ইরান যুদ্ধের কারণে পশ্চিম এশিয়ায় যে সংকট চলছে তার প্রভাবের বিষয়টি মনে করিয়ে দিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘সন্ধ্যা ৭টার পরে আমরা চাইছি যে, বিভিন্ন মার্কেট প্লেসগুলোতে যাতে বিদ্যুৎ ব্যবহার না হয়। এ ব্যাপারেও আপনাদের একটু খেয়াল রাখার প্রয়োজন, খেয়াল রাখতে হবে।’ আইন লঙ্ঘনের ক্ষেত্রে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা গ্রহণের সুবিধার্থে এবং যাতে জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট অপরাধ দ্রুত দমন করা যায় সে জন্য নিয়মিত ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা ও দৃশ্যমান করতে জরুরি পদক্ষেপ নেওয়ার জন্য ডিসিদের নির্দেশনা দেন।
সরকারি সেবায় হয়রানি বন্ধ করতে হবে :
জনগণের ন্যায্য বিচারপ্রাপ্তি সহজতর করা এবং সরকারি সেবাকে হয়রানিমুক্ত করার তাগিদ দিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘প্রতিটি নাগরিকের জন্য সমান সুযোগ নিশ্চিত করা আমি মনে করি আপনাদের কাজের একটি গুরুত্বপূর্ণ এবং বড় অংশ। সরকারি কার্যালয়ে সেবা প্রার্থীরা যেন অপ্রয়োজনীয় হয়রানি না হয় কিংবা বিলম্ব বা অনিয়মের শিকার না হয়, দয়া করে সে ব্যাপারে আপনাদের কঠোর নজর রাখতে হবে।' জনগণের যে কোনো ন্যায্য অভিযোগকে গুরুত্বসহকারে নিয়ে প্রতিকারের ব্যবস্থা গ্রহণের কথাও বলেছেন তারেক রহমান।
নারী ও শিশু নির্যাতন এবং খাদ্য ভেজাল রোধ করার নির্দেশনা :
সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি, বাল্যবিবাহ, নারী ও শিশু নির্যাতন বিষয়ে প্রশাসনিক ব্যবস্থার পাশাপাশি ব্যক্তি অবস্থান থেকেও ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য জেলা প্রশাসকদের তাগিদ দিয়েছেন সরকারপ্রধান। আইনশৃঙ্খলা বজায় রাখা ও মাদক নিয়ন্ত্রণের বিষয়েও ডিসিদের কঠোর ব্যবস্থার নেওয়ার নির্দেশনাও এসেছে তার কাছ থেকে। তারেক রহমান বলেন, ‘খাদ্যে ভেজালের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ একটি অত্যন্ত জরুরি বিষয়। এ খাবারটি আপনি খাচ্ছেন, আমি খাচ্ছি, আপনার পরিবারের সদস্য আপনার সঙ্গে থাকছে, তারাও খাচ্ছে। কাজেই এটির প্রতি আমাদের নজর রাখা অত্যন্ত প্রয়োজন। এ ব্যাপারে সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধি করা প্রয়োজন।’
প্রযুক্তিনির্ভর জ্ঞানভিত্তিক রাষ্ট্র গড়ার আকাঙ্ক্ষা :
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আমরা একটি প্রযুক্তিনির্ভর জ্ঞানভিত্তিক এবং নৈতিক রাষ্ট্র করতে চাই, যা আপনাদের সামনে এতক্ষণ আমি আমার নিজের কথাটি বলার চেষ্টা করেছিলাম।’ ধর্ম-বর্ণ ও নৈতিক রাষ্ট্রে রাজনৈতিক পরিচয়ের ভিত্তিতে বৈষম্য থাকবে না তুলে ধরে তারেক রহমান বলেন, “আমি জানি কেউ আমার সঙ্গে ‘অ্যাগ্রি’ করবেন, কেউ আমার সঙ্গে ‘অ্যাগ্রি’ করবেন না। আমি যেটা বিশ্বাস করি আমি সেটাই বলছি।” মন্ত্রিপরিষদের সচিব নাসিমুল গণির সভাপতিত্বে উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ইসমাইল জবিহউল্লাহ, জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী আব্দুল বারী, প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব এ বি এম আবদুস সাত্তার, চট্টগ্রামের বিভাগীয় কমিশনার মো. জিয়াউদ্দীন, পটুয়াখালীর জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ শহীদ হোসেন চৌধুরী এবং নাটোরের জেলা প্রশাসক আসমা শাহীন বক্তব্য দেন। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের দ্বিতীয় পর্বে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে মুক্ত আলোচনায় অংশ নেন বিভাগীয় কমিশনার ও ডিসিরা।
এবারের সম্মেলনে মোট অধিবেশন থাকছে ৩৪টি। এর মধ্যে কার্য অধিবেশন ৩০টি এবং অংশগ্রহণকারী মন্ত্রণালয় বা বিভাগের সংখ্যা হচ্ছে ৫৬টি। বিভাগীয় কমিশনার ও জেলা প্রশাসকদের ৪৯৮টি প্রস্তাব সম্মেলনে উত্থাপিত হবে। ৫৬টি মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী সম্মেলনে নিজ নিজ মন্ত্রণালয়ের বিষয়ে জেলা প্রশাসকদের প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেবেন। সম্মেলনের প্রধান আলোচ্য বিষয়ের মধ্যে রয়েছে- ভূমি ব্যবস্থাপনা, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন, স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যক্রম জোরদারকরণ, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা, ত্রাণ ও পুনর্বাসন কার্যক্রম, স্থানীয় পর্যায়ে কর্ম-সৃজন ও দারিদ্র্য বিমোচন কর্মসূচি বাস্তবায়ন, সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী কর্মসূচি বাস্তবায়ন, তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তির ব্যবহার এবং ই-গভর্নেন্স, শিক্ষার মান উন্নয়ন ও সম্প্রসারণ, স্বাস্থ্যসেবা ও পরিবার কল্যাণ, পরিবেশ সংরক্ষণ ও দূষণ রোধ, ভৌত অবকাঠামোর উন্নয়ন এবং উন্নয়নমূলক কার্যক্রমের বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও সমন্বয়।
সমীকরণ প্রতিবেদক