দেশের ২৩তম রাষ্ট্রপতি নির্বাচনকে ঘিরে দীর্ঘদিনের জল্পনা-কল্পনার অবসান ঘটিয়ে বিএনপি আনুষ্ঠানিকভাবে দলটির মহাসচিব ও স্থানীয় সরকারমন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে রাষ্ট্রপতি পদে চূড়ান্ত মনোনয়ন দিয়েছে। গতকাল বৃহস্পতিবার দুপুরে সচিবালয়ে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের কক্ষে দলের চেয়ারম্যান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বৈঠকের শুরুতে তার এ সিদ্ধান্তের কথা ঘোষণা করেন। এসময় দলের স্থায়ী কমিটির সদস্যরা তাকে শুভেচ্ছা জানান। রাষ্ট্রপতি পদে প্রার্থী হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে দলীয় মহাসচিব ও জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য পদ থেকেও পদত্যাগ করেছেন তিনি। আজ এলজিআরডি মন্ত্রীর পদ থেকেও পদত্যাগ করবেন তিনি।
বিকেলে রাষ্ট্রপতি পদে নির্বাচনে মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের পক্ষে মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। রাজধানীর আগারগাঁও নির্বাচন ভবনে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের প্রধান নির্বাচনি কর্মকর্তা প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এ এম এম নাসির উদ্দিনের কাছে বিএনপির পক্ষে দলটির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. আব্দুল মঈন খানের নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধিদল তার মনোনয়নপত্র জমা দেন। মনোনয়নপত্রে প্রস্তাবক হয়েছেন ড. আব্দুল মঈন খান।
বিএনপির স্থায়ী কমিটির সভা শেষে দলের সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী জানান, রাষ্ট্রপতি পদে দলীয় মনোনয়ন পাওয়ার পর মির্জা ফখরুল বিএনপির মহাসচিব ও স্থায়ী কমিটির সদস্য পদ থেকে পদত্যাগ করেছেন। মহাসচিবের শূন্য পদে কে আসছেন প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, ‘আমাদের চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী, তার কাছে দায়িত্ব দেওয়া আছে। তিনি যেভাবে হোক সেটা মতামত নিয়ে জানাবেন। সেটি আপনারা পরে জানতে পারবেন।’
দুপুর ১২টায় শুরু হওয়া স্থায়ী কমিটির এই বৈঠকে দলের সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব, যুগ্ম মহাসচিব, চিফ হুইপ, হুইপগণ উপস্থিত ছিলেন। বৈঠকের মধ্যে দলের চেয়ারম্যান স্থায়ী কমিটির সদস্যসহ সিনিয়র নেতাদের নিয়ে মধ্যাহ্নভোজ করেন। বিএনপির সংসদীয় নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতার প্রেক্ষাপটে রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, মির্জা ফখরুলের দেশের ২৩তম রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হওয়া নিশ্চিত। যদি তিনি রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব গ্রহণ করেন, তাহলে দল ও সরকারের অন্তত তিনটি গুরুত্বপূর্ণ পদ শূন্য হবে, যা নতুন নেতৃত্ব ও মন্ত্রিসভা পুনর্গঠনের আলোচনা আরো ত্বরান্বিত করবে।
উল্লেখ্য, গত ২৪ জুলাই রাষ্ট্রপতির পদ থেকে পদত্যাগ করেন ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত কার্যক্রম নিষিদ্ধ দল আওয়ামী লীগের মনোনয়নে নির্বাচিত মো. সাহাবুদ্দিন চুপ্পু। স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করছেন। সংবিধান অনুসারে, রাষ্ট্রপতির পদ শূন্য হওয়ার ৯০ দিনের মধ্যে নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত করতে হবে। নির্বাচন কমিশন ঘোষিত তপশিল অনুসারে, ১৮ আগস্ট প্রার্থিতা প্রত্যাহারের শেষ দিন। এরপর একাধিক প্রার্থী থাকলে ২০ আগস্ট রাষ্ট্রপতি পদে ভোটগ্রহণ হবে।
এদিকে জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১-দলীয় ঐক্যের পক্ষ থেকে লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির (এলডিপি) চেয়ারম্যান কর্নেল (অব.) অলি আহমদকে রাষ্ট্রপতি পদে প্রার্থী করা হয়েছে। গতকাল বেলা ১১টার দিকে কর্নেল (অব.) অলির মনোনয়নপত্র জমা দেওয়া হয়েছে। শেষ পর্যন্ত কেউ প্রার্থিতা প্রত্যাহার না করলে দীর্ঘ প্রায় ৩৫ বছর পর রাষ্ট্রপতি পদে ভোট হবে। এর আগে ১৯৯১ সালে রাষ্ট্রপতি পদে ভোট হয়েছিল। মধ্যখানের সাতজন রাষ্ট্রপতি হয়েছেন ক্ষমতাসীন দল থেকে, বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায়। বিরোধী দল থেকে রাষ্ট্রপতি পদে প্রার্থী দেওয়া হয়নি। সংবিধান অনুসারে, রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হবেন সংসদ সদস্যদের ভোটে। বর্তমানে জাতীয় সংসদে বিএনপির দুই-তৃতীয়াংশের বেশি সংখ্যাগরিষ্ঠতা রয়েছে। অন্যদিকে জামায়াতসহ বিরোধীদের সদস্যসংখ্যা সংরক্ষিত নারীসহ ৯০। ফলে ভোটে বিএনপি-সমর্থিত প্রার্থীর জয় অবধারিত। সেক্ষেত্রে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর দেশের ২৩তম রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হচ্ছেন।
মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে রাষ্ট্রপতি পদে মনোনয়ন দেওয়া শুধু একটি সাংবিধানিক পদ পূরণের সিদ্ধান্ত নয়; এটি বিএনপির ভেতরে নেতৃত্ব পুনর্বিন্যাসের সূচনা বলেও মনে করা হচ্ছে। দীর্ঘদিন ধরে দলীয় সাংগঠনিক নেতৃত্বে থাকা একজন রাজনীতিককে রাষ্ট্রপতি পদে পাঠানো হলে একদিকে যেমন রাষ্ট্র পরিচালনায় একটি অভিজ্ঞ ও গ্রহণযোগ্য মুখ আসবে, অন্যদিকে বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতৃত্বে নতুন প্রজন্ম ও নতুন ভারসাম্যের পথও উন্মুক্ত হবে। রাষ্ট্রপতি নির্বাচন তাই এবার কেবল সাংবিধানিক আনুষ্ঠানিকতা নয়, বরং বিএনপির ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব, মন্ত্রিসভা পুনর্গঠন এবং জাতীয় রাজনীতির পরবর্তী অধ্যায়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড় হয়ে উঠেছে।
ফখরুলের উত্তরসূরি কে :
বিএনপি ও সরকারের সূত্র বলছে, রাষ্ট্রপতি পদে নির্বাচনের আগেই গতকাল দলের মহাসচিব ও জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্যপদ ছেড়েছেন মির্জা ফখরুল। আর রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হলে সংসদ সচিবালয় মির্জা ফখরুলের ঠাকুরগাঁও-১ আসন শূন্য ঘোষণা করবে। এরপর ওই আসনে উপনির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। এখন মির্জা ফখরুল রাষ্ট্রপতি হলে তার সম্ভাব্য উত্তরসূরি কে হবেন-এ নিয়ে দলের ভেতরে বাইরে আলোচনায় চলছে। মির্জা ফখরুল প্রায় ১৬ বছর ধরে বিএনপির মহাসচিবের পদে ছিলেন। তার অবর্তমানে গঠনতন্ত্র অনুযায়ী ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব হিসেবে দায়িত্ব পেতে পারেন সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী। আগামী কাউন্সিলে নতুন মহাসচিব নির্বাচিত না হওয়া পর্যন্ত রিজভীকে দায়িত্ব পালনের নির্দেশ দিতে পারেন দলের চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
ইতিপূর্বে সাবেক মহাসচিব খন্দকার দেলোয়ার হোসেন মারা গেলে চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া দলের ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব করেন তৎকালীন সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব মির্জা ফখরুলকে। মির্জা ফখরুল ২০১১ সালে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব হন। এরপর ২০১৬ সালের পর তাকে ভারমুক্ত করা হয়।
সমীকরণ প্রতিবেদন