মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে আবারও পাল্টাপাল্টি হামলার ঘটনা ঘটেছে। এই পাল্টাপাল্টি হামলায় ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যকার ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতি চরম উত্তেজনার মুখে পড়েছে। গতকাল বৃহস্পতিবার হরমুজ প্রণালীতে তিনটি মার্কিন ডেস্ট্রয়ারে ইরানের হামলার পরও যুদ্ধবিরতি বহাল রয়েছে বলে দাবি করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তিনি এটিকে ‘তুচ্ছ ঘটনা’ বলেও উড়িয়ে দেন। তবে মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) দাবি করেছে, তারা সফলভাবে এই হামলা প্রতিহত করে ইরানের সামরিক স্থাপনায় পাল্টা আঘাত হেনেছে।
মার্কিন সামরিক বাহিনী জানিয়েছে, ইরানের হামলার জবাবে তারা দেশটির সামরিক স্থাপনাগুলোতে পাল্টা হামলা চালিয়েছে। তবে তেহরানের অভিযোগ, যুদ্ধবিরতি ভেঙে যুক্তরাষ্ট্রই প্রথম আক্রমণ চালায়। এই সংঘাতের কারণে গত ৮ এপ্রিল থেকে কার্যকর হওয়া নাজুক যুদ্ধবিরতি নতুন করে হুমকির মুখে পড়েছে। এই যুদ্ধবিরতির মাধ্যমে ইরানের ওপর কয়েক সপ্তাহ ধরে চলা যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের হামলার অবসান ঘটেছিল। সে সময় মার্কিন-ইসরাইলি হামলার জবাবে ইরানও মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন স্থানে হামলা চালায় এবং বিশ্বে তেল ও গ্যাসের গুরুত্বপূর্ণ পরিবহনপথ হরমুজ প্রণালী অবরোধ করেছে।
ওয়াশিংটনে ইরানের যুদ্ধবিরতি এখনও বহাল আছে কি না জানতে চাইলে সাংবাদিকদের ট্রাম্প বলেন, ‘হ্যাঁ, যুদ্ধবিরতি বহাল আছে। তারা আজ আমাদের নিয়ে খেলতে চেয়েছিল। আমরা তাদের উড়িয়ে দিয়েছি। তারা তুচ্ছ কাজ করেছে। আমিও এটিকে তুচ্ছই বলবো।’ যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে জানায়, ইরানি বাহিনী তিনটি মার্কিন যুদ্ধজাহাজ লক্ষ্য করে একাধিক ক্ষেপণাস্ত্র, ড্রোন ও ছোট নৌযান ব্যবহার করে হামলা চালিয়েছে। তবে কোনো জাহাজ ক্ষতিগ্রস্ত হয়নি। সেন্টকম বলেছে, তারা ‘আসন্ন হুমকি প্রতিহত করেছে এবং দায়ী ইরানি সামরিক স্থাপনাগুলোতে হামলা চালিয়েছে।’ তারা আরও জানায়, ‘সেন্টকম উত্তেজনা বাড়াতে চায় না। তবে মার্কিন বাহিনীকে সুরক্ষা দিতে প্রস্তুত রয়েছে।’
অন্যদিকে ইরানের কেন্দ্রীয় সামরিক কমান্ড যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘনের অভিযোগ তুলেছে। তাদের দাবি, যুক্তরাষ্ট্র তাদের একটি তেলবাহী জাহাজ এবং অন্য আরেকটি জাহাজে হামলা চালিয়েছে। এর জবাবে ইরানি বাহিনী ‘তাৎক্ষণিকভাবে মার্কিন সামরিক জাহাজে পাল্টা হামলা’ চালায়। এর একদিন আগেই ইরানের সঙ্গে সম্ভাব্য সমঝোতা নিয়ে ইতিবাচক ইঙ্গিত দিয়েছিলেন ট্রাম্প। তিনি জানান, ‘চুক্তির কাছাকাছি পৌঁছে গেছি।’ তবে তেহরান পিছু না হটলে আবারও হামলার হুমকি দেন। বৃহস্পতিবারের হামলার পর ট্রাম্প তার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে লেখেন, ‘ইরান যদি দ্রুত চুক্তিতে সই না করে, তাহলে ভবিষ্যতে আমরা আরও কঠোর ও ভয়াবহভাবে জবাব দেব।’ ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাকাই বলেন, মধ্যস্থতাকারী পাকিস্তানের কাছে তারা তাদের অবস্থান আনুষ্ঠানিকভাবে জানাবে। বৃহস্পতিবারের গোলাগুলির আগে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরীফ আশাবাদী সুরে টেলিভিশনে দেওয়া বক্তব্যে বলেন, ‘আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি এই যুদ্ধবিরতি একটি দীর্ঘমেয়াদী শান্তিতে রূপ নেবে।’
‘প্রজেক্ট ফ্রিডম’ আবারও শুরুর প্রস্তুতি:
যুক্তরাষ্ট্র ও সৌদি কর্মকর্তাদের বরাত দিয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ট্রাম্প প্রশাসন হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচলকারী বাণিজ্যিক জাহাজগুলো মার্কিন নৌ ও বিমানবাহিনীর সহায়তায় পাহারা দিয়ে নিয়ে যাওয়ার কার্যক্রম ‘প্রজেক্ট ফ্রিডম’ আবার শুরু করার প্রস্তুতি নিচ্ছে। এর আগে চলতি সপ্তাহের শুরুতে ৩৬ ঘণ্টা চলার পর এই কার্যক্রম সাময়িকভাবে স্থগিত করা হয়। মার্কিন প্রতিরক্ষা সদর দপ্তর পেন্টাগনের পরিকল্পনাকারীরা এখন এটি আবার শুরুর সময়সীমা নির্ধারণ করছেন। কিছু মার্কিন কর্মকর্তার মতে, এ সপ্তাহেই অভিযানটি আবার শুরু হতে পারে।
আরব আমিরাতে ড্রোন-ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়ল ইরান:
সংযুক্ত আরব আমিরাতকে লক্ষ্য করে নতুন করে ইরান আবারও ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন ছুড়েছে। ফলে এই আঘাতে দেশটিতে তিনজন আহত হয়েছেন। গতকাল শুক্রবার (৮ মে) ইরান থেকে এ হামলা চালানো হয়। আমিরাতের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় এ তথ্য জানিয়েছে। এপি নিউজের এক প্রতিবেদন থেকে এ তথ্য জানা যায়। আমিরাতের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানায়, ইরান নতুন করে দুটি ব্যালিস্টিক মিসাইল ও তিনটি ড্রোন ছুড়েছে। এতে তিনজন আহত হয়েছেন। তবে মিসাইল ও ড্রোনগুলো ঠেকিয়ে দেওয়া হয়েছে। মিসাইল ও ড্রোনের ধ্বংসাবশেষ পড়ে তিনজন আহত হওয়ার ঘটনা ঘটেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। মন্ত্রণালয় আরও জানিয়েছে, যুদ্ধ শুরুর পর এখন পর্যন্ত ইরানের ছোড়া ৫৫১টি ব্যালাস্টিক মিসাইল, ২৯টি ক্রুজ মিসাইল এবং ২ হাজার ২৬৩টি ড্রোন প্রতিহত করা হয়েছে।
যুদ্ধবিরতি এখনও বহাল আছে- ট্রাম্প:
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে হরমুজ প্রণালিতে পাল্টাপাল্টি হামলার ঘটনা ঘটলেও ‘যুদ্ধবিরতি এখনও বহাল আছে’ বলে দাবি করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। মার্কিন সংবাদমাধ্যম এবিসি নিউজকে তিনি বলেন, ‘যুদ্ধবিরতি চলছে। এটি কার্যকর আছে’। আর সংঘর্ষের ঘটনাকে ‘কেবল হালকা সংঘাত’ বলে বর্ণনা করেন ট্রাম্প। গতকাল গভীর রাতে হামলা ও পাল্টা হামলার ঘটনাটি ঘটে। ইরানি বাহিনী ও মার্কিন বাহিনীও এই সংঘাতের কথা স্বীকার করেছে। ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসি বলছে, গতকাল বৃহস্পতিবার গভীর রাতে ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম প্রথম বিস্ফোরণের খবর প্রকাশ করে। সেখানে ঘটনাটিকে ইরানি বাহিনী ও ‘শত্রুপক্ষের’ মধ্যে ‘গুলিবিনিময়’ হিসেবে বর্ণনা করা হয়।
ইরানের হামলায় হরমুজ ছাড়লো মার্কিন যুদ্ধজাহাজ:
পারস্য উপসাগরের গুরুত্বপূর্ণ জলপথ হরমুজ প্রণালিতে বড় ধরনের সামরিক অভিযান চালিয়ে মার্কিন নৌবাহিনীর তিনটি ডেস্ট্রয়ারকে পিছু হটতে বাধ্য করার দাবি করেছে ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি)। গত বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় পরিচালিত এই অভিযানে মার্কিন যুদ্ধজাহাজগুলো ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির মুখে পড়ে বলে দাবি করেছে তেহরান। আইআরজিসি নৌবাহিনীর এক বিবৃতিতে বলা হয়, ইরানের একটি তেলবাহী ট্যাংকারে মার্কিন হামলার জবাব হিসেবেই এই পাল্টা অভিযান চালানো হয়েছে। পাশাপাশি, বারবার সতর্ক করার পরও মার্কিন যুদ্ধজাহাজগুলো হরমুজ প্রণালির দিকে অগ্রসর হওয়ায় ইরান কঠোর পদক্ষেপ নিতে বাধ্য হয়।
ইসরাইলি হামলায় লেবাননে শিশুসহ নিহত ১২:
যুদ্ধবিরতি কার্যকর থাকা সত্ত্বেও লেবাননজুড়ে একাধিক বিমান হামলা চালিয়েছে ইসরাইল। এতে কমপক্ষে ১২ জন নিহত হয়েছেন। নিহতদের মধ্যে দুই শিশু ও এক প্যারামেডিক রয়েছেন। যুদ্ধবিরতি কার্যকর থাকা সত্ত্বেও গত বৃহস্পতিবার (৭ মে) লেবাননজুড়ে একাধিক বিমান হামলা চালিয়েছে ইসরাইল। এতে কমপক্ষে ১২ জন নিহত হয়েছেন। নিহতদের মধ্যে দুই শিশু ও এক প্যারামেডিক রয়েছেন বলে জানিয়েছে দেশটির স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়। এই ঘটনার একদিন আগে বৈরুতের দক্ষিণাঞ্চলে হামলা চালিয়ে হিজবুল্লাহর এক কমান্ডারকে হত্যা করে ইসরাইল। যুদ্ধবিরতির পর রাজধানীর ওই এলাকায় এটিই ছিল প্রথম হামলা। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় আরেক বিবৃতিতে জানায়, নাবাতিয়েহ জেলার তিনটি গ্রামে হামলায় মোট ১১ জন প্রাণ হারিয়েছেন। তাদের মধ্যে দুই শিশু রয়েছে। অন্যদিকে মারাজায়ুন জেলায় পৃথক হামলায় হিজবুল্লাহ-সংশ্লিষ্ট ইসলামিক হেলথ কমিটির একজন প্যারামেডিক নিহত হন। আহত হয়েছেন আরো একজন। এটিকে ‘অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড’ হিসেবে আখ্যা দিয়েছে মন্ত্রণালয়।
সমীকরণ প্রতিবেদন