চুয়াডাঙ্গা সদর উপজেলার ব্যতিক্রমী তরুণ শাহিন সরকার। যিনি এখন পর্যন্ত উদ্ধার করেছেন পাঁচ শতাধিক পাখি ও বন্যপ্রাণী। চিকিৎসা দিয়েছেন প্রায় দুই শতাধিক আহত প্রাণীকে। ব্যক্তিগতভাবে লাগিয়েছেন সাত হাজারের বেশি গাছ, আর নিজের হাতে গড়া সংগঠনের উদ্যোগে রোপণ করেছেন ২২ হাজার তালবীজ ও হাজার খানেক বনজ, ফলদ ও ঔষধি গাছ। তার উদ্যোগে তার গ্রাম পরিণত হয়েছে পাখি ও বন্যপ্রাণীর অভয়াশ্রমে। গাছ ও পশুপাখিপ্রেমী শাহীন সরকার চুয়াডাঙ্গা সদর উপজেলার তিতুদহ ইউনিয়নের ৬২ নম্বর আড়িয়া গ্রামের মুস্তাক আলীর ছেলে শাহীন সরকার। কুষ্টিয়া সরকারি কলেজে রাষ্ট্রবিজ্ঞানে মাস্টার্স পড়ছেন। পড়াশোনার পাশাপাশি বন্যপ্রাণী, পরিবেশ, প্রকৃতি নিয়ে তার কাজ সবার নজর কেড়েছে। পরিবারে আছে বাবা-মা ও বড় বোন।
প্রতিবছর শীত এলেই বাংলাদেশে ভীড় জমায় অতিথি পাখিরা। শাহিনের গ্রামেও ভিড় জমায় এসব অতিথি পাখিরা। কিন্তু এসময় সক্রিয় হয় পাখি শিকারীরাও। শাহীন ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র উদ্যোগে তাদের বুঝিয়েছেন এসব পাখি শিকার আইনত দণ্ডনীয় এবং পরিবেশের ভারসাম্যের জন্য ক্ষতিকর। একসময় তার একাগ্রতায় গ্রামবাসীও বদলে যায়। গ্রামের প্রবেশমুখে টাঙানো হয় বড় সাইনবোর্ড, যেখানে লেখা হয় ‘আমাদের গ্রাম পাখি ও বন্যপ্রাণীর অভয়াশ্রম’।
২০১৮ সালে কয়েকজন বন্ধু নিয়ে তিনি গড়ে তোলেন সংগঠন ‘মানবতার জন্য’। অল্প সময়েই এই সংগঠন গ্রামের মানুষের মনে জায়গা করে নেয়। তারা সবুজায়নের জন্য বর্ষার সময় গ্রামবাসীর হাতে গাছের চারা তুলে দেওয়া থেকে শুরু করে বজ্রপাত থেকে গ্রামের কৃষকদের রক্ষার জন্য গ্রামজুড়ে তালবীজ রোপণ, স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীদের পরিবেশ সম্পর্কে সচেতনা গড়ে তোলার কাজ শুরু করেন। এমনকি কৃষিজমি দূষণমুক্ত রাখতে মাঠে কৃষকদের ব্যবহৃত কীটনাশকের জন্য বিশেষ ডাস্টবিন তৈরি করেন, যার অনেক মহলে প্রশংসা পেয়েছেন শাহীন।’
এসব উদ্যোগে শুধু মানুষের প্রশংসা নয়, প্রকৃতিও পেয়েছে নতুন সজীবতা। শুধুমাত্র ব্যক্তিগতভাবেই শাহিন লাগিয়েছেন প্রায় সাত হাজার গাছ। কৃষিজমিতে প্লাস্টিক ও কীটনাশকের বর্জ্য ছড়িয়ে পড়া রোধে তিনি কৃষকদের মধ্যে জনসচেতনতা গড়ে তুলছেন। গাছের সঙ্গে বড় বস্তা ঝুলিয়ে দেওয়া হয়েছে, লাগানো হয়েছে ‘কীটনাশক বর্জ্য এখানে ফেলুন।’ এই উদ্যোগের মাধ্যমে ইতোমধ্যে সংগ্রহ করা হয়েছে প্রায় ৫০ বস্তা কীটনাশক বর্জ্য। বন বিভাগ থেকে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত শাহিনের এই কাজ স্থানীয় কর্মকর্তাদের কাছ থেকেও ব্যাপক প্রশংসা পেয়েছে।
শাহিন বলেন, গ্রামের অনেক মানুষই এখনো অজ্ঞতার কারণে জমিতে প্লাস্টিক ও কীটনাশকের বোতল ফেলে দেন। ফলে মাটি দূষিত হয়, পানিও নষ্ট হয়, আর ফসল উৎপাদনও ব্যাহত হয়। তাই তিনি চান, এই উদ্যোগ ছড়িয়ে পড়ুক শুধু তার গ্রামে নয়, দেশের প্রতিটি গ্রামে।
শাহিন আহত প্রাণীরও ভরসা হয়ে উঠেছেন। খবর পেলেই ছুটে যান, হোক সেটা মেছোবিড়াল, খরগোশ কিংবা কোনো আহত বন্যপাখি। ২০০টিরও বেশি অসুস্থ বন্যপ্রাণী সেবা দিয়ে সুস্থ করে বনে ছেড়ে দিয়েছেন তিনি। যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো খরগোশ, গুইসাপ, প্যাঁচা, বিভিন্ন প্রজাতির পাখি। কেউ কোথাও অসুস্থ বন্যপ্রাণী পেলে তার ডাক আসে। তিনি ছুটে যান। সেবা দিয়ে সুস্থ করে পরে প্রকৃতিতে অবমুক্ত করেন। আবার শতাধিক বন্যপ্রাণী উদ্ধার কার্যক্রমে তার কার্যকর অংশগ্রহণ ছিল। বন্যপ্রাণী শিকার রোধই নয়। শাহিন বন্যপ্রাণী বিষয়ে সচেতনতামূলক বিভিন্ন কর্মকাণ্ডে জড়িত আছেন।
প্রধান সম্পাদক