জুলাই গণআন্দোলনে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ তিন আসামির বিরুদ্ধে আজ সোমবার বেলা ১১টায় রায় ঘোষণা করা হবে। বিচারপতি মো. গোলাম মুর্তজা মজুমদারের নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের ট্রাইব্যুনাল-১ রায় ঘোষণা করবে। রায় ঘোষণার জন্য গত ১৩ নভেম্বর এই দিন ধার্য করে দেয় ট্রাইব্যুনাল। ট্রাইব্যুনালের রায় ঘোষণা সরাসরি সম্প্রচার করবে বাংলাদেশ টেলিভিশনসহ বিভিন্ন বেসরকারি টেলিভিশন। এছাড়া রাজধানী ঢাকার বিভিন্ন স্থানে বড় পর্দায় দেখানো হবে ট্রাইব্যুনালের রায় ঘোষণা। এদিকে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় শেখ হাসিনার কী শাস্তি হয়, তা দেখার জন্যজনগণের দৃষ্টি আজ ট্রাইব্যুনালের দিকে। রায় ঘোষণাকে কেন্দ্র করে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল ও এর আশাপাশের এলাকায় নিরাপত্তাব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে। সেনা মোতায়েন চেয়ে সেনাসদরে চিঠি দিয়েছে সুপ্রিম কোর্ট প্রশাসন।
রাষ্ট্রপক্ষ এই মামলায় শেখ হাসিনা ও সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালের সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড চেয়েছে। এছাড়া আসামিদের স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি বিক্রি করে জুলাই আন্দোলনে ক্ষতিগ্রস্তদের ক্ষতিপূরণ দেওয়ার জন্য আবেদন জানানো হয়। অন্যদিকে আসামি থেকে রাজসাক্ষী হওয়া সাবেক আইজিপি চৌধুরী আব্দুল্লাহ আল মামুনের শাস্তির বিষয়ে কোনো আবেদন করেনি রাষ্ট্রপক্ষ। তার বিষয়টি ট্রাইব্যুনালের ওপর ছেড়ে দিয়েছে রাষ্ট্রপক্ষ। ২৩ অক্টোবর যুক্তিতর্ক উপস্থাপনের শেষ দিন রাষ্ট্রের শীর্ষ আইন কর্মকর্তা অ্যাটর্নি জেনারেল অ্যাডভোকেট এম আসাদুজ্জামান বলেন, ‘একটা দেশে ৩৬ দিনে ১ হাজার ৪০০ মানুষকে হত্যা এবং প্রায় ৩০ হাজার মানুষকে পঙ্গুত্ব বরণ করানো হয়েছে শুধু ক্ষমতাকে প্রলম্বিত করার জন্য। এই মানবতাবিরোধী অপরাধ কারা সংঘটন করেছে, কীভাবে করেছে, সেটি আমরা সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণ করতে সক্ষম হয়েছি। সেই জায়গা থেকে আমরা মনে করি, যদি এই আদালতে এই আসামিদের শাস্তি না হয়, তাহলে এই রাষ্ট্রব্যবস্থা অবিচারের শিকার হবে।’
চিফ প্রসিকিউটর অ্যাডভোকেট এম তাজুল ইসলাম বলেন, যে সাক্ষ্য-প্রমাণ এই মামলায় উপস্থাপন করা হয়ছে, সেই প্রমাণ হিমালয়ের মতো দৃঢ়, কাচের মতো স্বচ্ছ। এগুলো নিয়ে কোনো ধরনের সন্দেহ তোলার অবকাশ নেই। এরকম নিষ্ঠুর হত্যাযজ্ঞ করার পরও শেখ হাসিনার মধ্যে কোনো অনুশোচনা নেই। সুতরাং সর্বোচ্চ শাস্তিটা তার অবশ্যই প্রাপ্য। পলাতক আসামি শেখ হাসিনা ও কামালের পক্ষে রাষ্ট্রনিযুক্ত কৌঁসুলি অ্যাডভোকেট আমির হোসেন বলেন, ‘শেখ হাসিনাকে দেশত্যাগে বাধ্য করা হয়েছে। রাষ্ট্রের পাশাপাশি আমিও ন্যায়বিচার পাওয়ার অধিকারী। ন্যায়বিচার হলে আমার আসামিরা খালাস পাবে।’
প্রসঙ্গত, গত বছরের জুলাই মাসে সরকারি চাকরিতে কোটা-পদ্ধতি পুনর্বহালের হাইকোর্টের রায়ের প্রতিবাদে রাজপথে নামেন শিক্ষার্থীরা। কোটা সংস্কারের এই আন্দোলনকে দমাতে বলপ্রয়োগ করে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকার। নিরস্ত্র ছাত্র-জনতাকে নির্মূল করতে পুলিশসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে নির্বিচারে গুলির নির্দেশ দেন শেখ হাসিনা। তার নির্দেশে আন্দোলনরত ছাত্র-জনতার ওপর ব্যবহার করা হয় প্রাণঘাতী অস্ত্র। হেলিকপটার থেকে ছোড়া হয় গুলি। যে গুলিতে বাসাবাড়িতে থাকা অনেক শিশুও নিহত হয়। আন্দোলনকারীদের চিহ্নিতে ব্যবহার করা হয় ড্রোন। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থার প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে। তদন্ত প্রতিবেদন বলছে, সারা দেশে গুলি ছোড়া হয়েছে ৩ লাখ রাউন্ড। যার মধ্যে ঢাকায় ছোড়া হয়েছে ৯৫ হাজার রাউন্ড তাজা গুলি। পুলিশের পাশাপাশি গুলি ছুড়েছে আওয়ামী ও এর বিভিন্ন অঙ্গসংগঠনের নেতা-কর্মীরা। এতে প্রাণ হারিয়েছে ১ হাজার ৪০০ মানুষ। আহত হয়েছে ২৫ থেকে ৩৫ হাজারের মতো। বিপুলসংখ্যক মানুষের প্রাণহানির ঘটনায় শেখ হাসিনাসহ তিন জনের বিরুদ্ধে প্ররোচনা, উসকানি, সম্পৃক্ততা, ষড়যন্ত্র ও ঊর্ধ্বতন নেতৃত্বের দায় এনে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলা করেন চিফ প্রসিকিউটর অ্যাডভোকেট এম তাজুল ইসলাম। মামলার আসামি চৌধুরী মামুন ছাড়া শেখ হাসিনা ও কামাল ভারতে অবস্থান করছেন। ট্রাইব্যুনালে হাজিরার জন্য পত্রিকায় দেওয়া হয় বিজ্ঞপ্তি। কিন্তু হাজির হননি। পরে শেখ হাসিনা ও কামালকে পলাতক দেখিয়ে ট্রাইব্যুনাল-১-এ চলে বিচারকাজ। ট্রাইব্যুনালের অন্য দুই সদস্য হলেন বিচারপতি মো. শফিউল আলম মাহমুদ ও জজ মো. মোহিতুল হক এনাম চৌধুরী।
যেভাবে এগিয়েছে বিচারকাজ :
গত বছরের ১৪ আগস্ট শেখ হাসিনাসহ অন্যান্য আসামির বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগ দাখিল করেন জুলাই গণআন্দোলনে নিহত ও আহত পরিবারের সদস্যরা। সেসব অভিযোগ যাচাই-বাছাই করে বিবিধ মামলা করেন চিফ প্রসিকিউটর তাজুল ইসলাম। পাঠানো হয় তদন্তে। তদন্তে প্রাথমিক অপরাধের প্রমাণ পেয়ে গত বছরের ১৭ অক্টোবর শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১। পূর্ণাঙ্গ তদন্ত শেষে গত বছরের ১২ মে শেখ হাসিনাসহ তিন জনকে অভিযুক্ত করে ফরমাল চার্জ দাখিল করেন তদন্ত কর্মকর্তা। ঐ বছরের পহেলা জুন ফরমাল চার্জ আমলে নিয়ে জারি করা হয় আবারও গ্রেফতারি পরোয়ানা। পরে ট্রাইব্যুনালে হাজিরার জন্য ১৬ জুন পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি দেওয়া হয়। গত ১০ জুলাই অভিযোগ গঠন করে বিচার শুরুর আদেশ দেয় ট্রাইব্যুনাল। ৩ আগস্ট চিফ প্রসিকিউটরের সূচনা বক্তব্যের পরই শুরু হয় সাক্ষ্যগ্রহণ। ২৮ কার্যদিবসে ৮৪ জন সাক্ষীর মধ্যে ৫৪ জন সাক্ষীর সাক্ষ্যগ্রহণ ও জেরা সমাপ্ত হয়।
সাক্ষ্য দিয়েছেন জুলাই গণআন্দোলনে নিহতের স্বজনরা, আহত জুলাই যোদ্ধা, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়করা, ইতিহাসবিদ ও গবেষক, ফরেনসিক এক্সপার্ট, চিকিৎসক ও জব্দ তালিকার সাক্ষীরা। দালিলিক প্রমাণ হিসেবে উপস্থাপন করা হয় শেখ হাসিনার চারটি গুরুত্বপূর্ণ ফোনালাপ। যেগুলো তার অজান্তেই রেকর্ড করেছিল জাতীয় প্রতিষ্ঠান এনটিএমসি। ট্রাইব্যুনালে সেগুলো বাজিয়ে শোনানোর পাশাপাশি প্রদর্শন করা হয় পুলিশসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নির্মমতার অসংখ্য ভিডিও ক্লিপ। যেসব ভিডিও ক্লিপে উঠে এসেছে পুলিশ কীভাবে খুব কাছ থেকে নিরস্ত্র সাধারণ ছাত্র-জনতাকে নির্বিচারে গুলি করে হত্যা করছে। চিফ প্রসিকিউটরের পাশাপাশি মামলাটি পরিচালনা করেছেন প্রসিকিউটর গাজী এম এইচ তামিম, মো. মিজানুল ইসলাম, আব্দুস সোবহান তরফদার, ফারুক আহম্মেদ, এস এম মইনুল করিম প্রমুখ।
রাজসাক্ষী চৌধুরী মামুন :
জুলাই গণআন্দোলনের সময় পুলিশপ্রধান ছিলেন চৌধুরী আব্দুল্লাহ আল মামুন। এই মামলার একমাত্র আসামি, যিনি গ্রেফতার হয়ে কারাগারে আছেন। অভিযোগ গঠন করে বিচার শুরুর দিন নিজের বিরুদ্ধে আনীত দোষ স্বীকার করে রাজসাক্ষী হওয়ার আবেদন করেন মামুন। তিনি ট্রাইব্যুনালে বলেন, ‘আমি দোষী। মামলার সব বিষয়বস্তু সম্পর্কে যা জানি, তা আমি স্বেচ্ছায় ও স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে সম্পূর্ণরূপে সত্য প্রকাশ করতে সম্মত আছি।’ এর পরই তার লিখিত আবেদন মঞ্জুর করায় রাজসাক্ষী হন মামুন। পরে জুলাই গণআন্দোলনের ঘটনাপ্রবাহের বর্ণনা দিয়ে ট্রাইব্যুনালে জবানবন্দি দেন তিনি।
আসামিদের বিরুদ্ধে অভিযোগসূমহ :
প্রসিকিউশনের আনুষ্ঠানিক অভিযোগে বলা হয়েছে, গত বছরের ১৪ জুলাই রাতে গণভবনে অনুষ্ঠিত সংবাদসম্মেলনে শেখ হাসিনার উসকানিমূলক বক্তব্য প্রদান এবং তার প্রেক্ষিতে আসামি কামাল ও চৌধুরী মামুনসহ তৎকালীন সরকারের অন্যান্য ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের প্ররোচনা, সহায়তা ও সম্পৃক্ততায় তাদের অধীনস্থ ও নিয়ন্ত্রণাধীন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য ও সশস্ত্র আওয়ামী সন্ত্রাসী কর্তৃক ব্যাপক মাত্রায় ও পদ্ধতিগতভাবে নিরীহ-নিরস্ত্র ছাত্র-জনতার ওপর আক্রমণের অংশ হিসেবে হত্যা, হত্যার চেষ্টা, নির্যাতন এবং অন্যান্য অমানবিক আচরণ করার অপরাধ সংঘটিত করেছেন। এছাড়া অপরাধ সংঘটনের প্ররোচনা, উসকানি, সহায়তা, সম্পৃক্ততা, অপরাধ সংঘটন প্রতিরোধে ব্যর্থতা, অপরাধ সংঘটনের জন্য দায়ী ব্যক্তিদের শান্তি প্রদান না করা এবং ষড়যন্ত্র করার অপরাধ সংঘটিত করেছেন। যা তাদের জ্ঞাতসারে সংঘটিত হয়েছে। এছাড়া ১৬ জুলাই রংপুরে বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের সামনে ছাত্র আবু সাঈদকে গুলি করে হত্যা, চানখাঁরপুলে আন্দোলনকারী ছয় ছত্র-জনতাকে হত্যা এবং ঢাকার আশুলিয়ায় আন্দোলনকারী ছয় জনকে গুলি করে হত্যার পর তাদের মরদেহ আগুন দিয়ে পুড়িয়ে দেওয়ার ঘটনায় আসামিদের দায় রয়েছে। এ কারণে আসামিদের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালস আইনের ৩(২)(এ)(জি)(এইচ) ও ৪(১)(২)(৩) ধারায় আনীত অভিযোগের প্রেক্ষিতে ২০(২)(এ) ধারায় অভিযোগ গঠন করা হয়। যেকোন ধরনের বিশৃঙ্খলা এড়াতে সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থানে রয়েছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। নিষিদ্ধ কার্যক্রম আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের অপতৎপরতা রুখতে ইতোমধ্যে মাঠে নেমেছে পুলিশ, র্যাব, বিজিবি, সেনাবাহিনী এবং সাদা পোশাকে গোয়েন্দা সদস্যরা।
সমীকরণ প্রতিবেদন