একটি মোটরসাইকেলে হাত দিয়ে স্পর্শ করার ‘অপরাধে’ মানসিক ভারসাম্যহীন এক যুবককে চোর সন্দেহে বেধড়ক মারধর করে স্থানীয়রা। নিশ্চিত কোনো প্রমাণ ছাড়াই ওই যুবককে গণপিটুনি দেওয়া হয়। খবর পেয়ে পুলিশ তাকে উদ্ধার করে থানা হেফাজতে নেয়। পরে জিজ্ঞাসাবাদে পুলিশ বুঝতে পারে-যুবকটি মানসিকভাবে অসুস্থ। এরপরই শুরু হয় পুলিশের মানবিক উদ্যোগ। দীর্ঘ অনুসন্ধানের পর তার পরিবারকে খুঁজে বের করে আজ সোমবার (২২ সেপ্টেম্বর) দুপুরে মা-বাবার হাতে তুলে দেয় দর্শনা থানা পুলিশ।
এদিকে, ঘটনাটি পুলিশের মানবিক ভূমিকায় আলোচিত হয়নি, বরং সন্দেহের বশে নিরপরাধ ও মানসিক ভারসাম্যহীন একজন মানুষকে মারধরের মতো অমানবিক আচরণের প্রতিচ্ছবি হিসেবেই সামনে এসেছে। প্রশ্ন উঠেছে-কারও মানসিক অবস্থা বোঝার আগে তাকে এভাবে মারা কতটা ন্যায্য?
জানা গেছে, রোববার (২১ সেপ্টেম্বর) রাত সাড়ে ৯টার দিকে দর্শনা রেলগেট এলাকায় থাকা একটি মোটরসাইকেল হাত দিয়ে ছুঁয়েছিল এক যুবক। স্থানীয়রা বিষয়টিকে চুরির চেষ্টা মনে করে তাকে আটক করে মারধর করে। পরে দর্শনা থানা পুলিশ খবর পেয়ে তাকে উদ্ধার করে।
পুলিশ জিজ্ঞাসাবাদে দেখে, যুবকটি নিজের নাম-ঠিকানা বারবার পরিবর্তন করছে। কখনো বলে তার নাম ইয়ামিন, পিতার নাম জিলু মিয়া, আবার কখনো ঝিরু মিয়া। বাড়ির ঠিকানা জানার চেষ্টা করলেও সে কখনো বলে চান্দুরা, কখনো গাজীপুর, আবার কখনো শেরপুর। তার কথাবার্তা অসংলগ্ন হওয়ায় পুলিশ বুঝতে পারে, সে মানসিকভাবে ভারসাম্যহীন। এসময় দর্শনা থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) শহীদ তিতুমীরের নির্দেশে তাকে থানার মধ্যে হাতকড়া খুলে দেয়া হয়। খেতে দেয়া হয় খাবার।
থানা সূত্র জানায়, যুবকটি মানসিক ভারসাম্যহীন বুঝতে পারার পর ওসি শহীদ তিতুমীর যুবকের অসংলগ্ন কথার ভেতর থেকে আংশিক তথ্য সংগ্রহ করে অনুসন্ধান শুরু করেন। বিভিন্ন থানায় যোগাযোগ করে অবশেষে নিশ্চিত হন, যুবকটির নাম ইয়ামিন মিয়া (২৯), বাড়ি ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার বিজয়নগর উপজেলার ইব্রাহিমপুর গ্রামে। তিনি ইলেকট্রিক মিস্ত্রির কাজ করতে গিয়ে দুর্ঘটনায় মানসিক ভারসাম্য হারান। এটাই প্রথমবার নয়, এর আগেও তিনি একাধিকবার নিখোঁজ হন এবং পরিবার খুঁজে নিয়ে আসে। দুপুরে তার পিতা-মাতা দর্শনা থানায় পৌঁছান। থানা কর্তৃপক্ষ তিনজনের জন্য খাবারের ব্যবস্থা করে এবং সাংবাদিকদের উপস্থিতিতে ইয়ামিনকে তার মা-বাবার হাতে তুলে দেয়।
এ বিষয়ে দর্শনা থানার অফিসার ইনচার্জ মোহাম্মদ শহীদ তিতুমীর বলেন, ‘প্রথমে আমরা তাকে মোটরসাইকেল চুরির ঘটনায় সন্দেহভাজন হিসেবে পেয়েছিলাম। কিন্তু কথা বলার একপর্যায়ে বুঝতে পারি, সে মানসিকভাবে সুস্থ নয়। ঠিকানা জিজ্ঞাসা করলে ভিন্ন ভিন্ন তথ্য দিচ্ছিল। তখনই বিষয়টি মানবিকভাবে দেখার সিদ্ধান্ত নেই। অনেক খোঁজখবর ও যোগাযোগের পর তার পরিবারকে শনাক্ত করি। একটা পাগল ছেলে যেন পথে পড়ে না থাকে-এই চিন্তা থেকেই আমরা তাকে পরিবারের কাছে ফিরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করি। এটা আমাদের দায়িত্বের অংশ, একইসঙ্গে মানবিক দায়বদ্ধতা।’
একইসঙ্গে থানা পুলিশের এই অফিসার সন্দেহের বসে মানসিক ভারসাম্যহীন ইয়ামিনের ওপর ঘটে যাওয়া ঘটনার জন্য দুঃখ প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, ‘আইন কখনই নিজের হাতে তুলে নেয়া উচিত নয়। সব সময় যা দেখা যায় তা সত্য হয় না।’
দর্শনা অফিস