মোজাম্মেল শিশির, দামুড়হুদা:
বিষধর সাপ দেখে যে কারও রগ কাঁপে, তার পরেও এই সাপ নিয়েই গ্রাম বাংলার ঐতিহ্য ‘ঝাপান’ খেলায় মানুষের মন জয় করতে সক্ষম সাপুড়ে ও এই দৃষ্টিনন্দন খেলা উপভোগীরা। দামুড়হুদা উপজেলার হাউলী ইউনিয়নের ডুগডুগি গ্রামে এমনই এক ‘ঝাপান’ খেলা অনুষ্ঠিত হয়। মৃত আজির মণ্ডলের স্ত্রী রোকেয়া বেগমের আয়োজনে বৃহস্পতিবার (১৮ সেপ্টেম্বর) সকাল ৯টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত চলে ঝাপান।
খেলায় অংশ নেয় দামুড়হুদার তারিনীপুর গ্রামের নজু সাপুড়ের দল ও মেহেরপুর থেকে আগত একটি সাপুড়ের দল। উভয় দলই প্রায় অর্ধ শতাধিক বিষধর সাপ নিয়ে উপস্থিত হয়ে নিজেদের সেরার খেতাব অর্জন করতে প্রতিটি সাপ প্রদর্শন করে থাকে বিভিন্ন আকর্ষণীয় ও অভূতপূর্ব কলাকৌশল দিয়ে। দর্শনার্থীরা, বিশেষ করে ছোট বা বড়, মাটি থেকে উঠে আসা সাপের ফনা—সাপুড়ের ইশারা—সব মিলিয়ে এক নান্দনিক ভোর ও দুপুর কাটায় উৎসবমুখরভাবে।
বিকেলের দিকে দিকে ডুগডুগি গ্রামে ভিড় জমে। দূরের গ্রাম থেকেও মানুষ ছুটে আসেন এই ঝাপান খেলা দেখতে। বাদ্যের তালে তালে সাপুড়ে নাচে, সাথে সাপ। ফণা তুলে বিভিন্ন অঙ্গভঙ্গি করে, যেন একটি জীবন্ত শিল্পকলা দেখা যায়। দর্শকরা আনন্দে তা উপভোগ করেন।
হাউলী থেকে আসা শাপলা খাতুন নামের এক গৃহবধূ বলেন, ‘জীবনে প্রথম ঝাপান খেলাটা দেখছি, খুব ভালো লাগছে। আমি চাই এ ধরনের আয়োজন যেন প্রতি বছর হয়।’ অন্য এক দর্শক সালেহা বেগম বলেন, ‘শহর থেকে এসেছি বাচ্চাদের সঙ্গে, ওরা দারুণ উপভোগ করছে। সাপ সম্পর্কেও নতুন ধারণা তৈরি হচ্ছে।’
হাউলী ইউনিয়ন পরিষদের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান নিজাম উদ্দিন বলেন, ‘গ্রাম বাংলার প্রাচীন ঐতিহ্য নতুন প্রজন্মের জন্য টিকিয়ে রাখতে পৃষ্ঠপোষকতা অনেক জরুরি। বৈরী আবহাওয়া উপেক্ষা করেও শিশু থেকে শুরু করে সব বয়সী দর্শকরা এটা উপভোগ করেছে নীরবতায়।’ তিনি আরও বলেন, ‘ঝাপান খেলা বা সাপখেলা গ্রামীণ ঐতিহ্যের অংশ। যা একসময় ঘরোয়া আয়োজনে বেশি দেখা যেত। কিন্তু প্রযুক্তি ও আধুনিকতার ছোঁয়ায় এসব হারিয়ে যাচ্ছে। এই হারিয়ে যাওয়া ঐতিহ্যকে রক্ষা করতে হবে।’
তারিনীপুর গ্রামের নজরুল ইসলাম ওরফে নজু সাপুড়ে বলেন, ‘মূলত আমাদের পেশা এটা না, উদ্দেশ্য মানুষকে আনন্দ দেওয়া। খেলা করছি খেলার ঈষৎ আনন্দের জন্য এবং এই আয়োজন সাপুড়েদের প্রতি শ্রদ্ধা স্বরূপ।’
জয়রামপুর গ্রামের নুর নবী বলেন, ‘বিভিন্ন এলাকা থেকে নারী, পুরুষ, শিশুরা আসছেন, উৎসবের আমেজ সৃষ্টি হচ্ছে। গ্রামবাংলার ঐতিহ্য এত মনোমুগ্ধকর—ঝাপান খেলা না দেখলে বোঝা যাবে না।’
আয়োজক রোকেয়া বেগমের ছেলে হামিদুল ইসলাম বলেন, ‘চিরায়ত বাংলার ঐতিহ্যবাহী এ খেলা দিন দিন হারিয়ে যেতে বসেছে। হারিয়ে যাওয়া এই ঐতিহ্য ধরে রাখতে এবং এলাকার মানুষকে আনন্দ দিতে দিয়েই এ আয়োজন।’
প্রতিবেদক দামুড়হুদা