সোমবার, ২৫ মে, ২০২৬
সর্বশেষ স্থানীয় সংবাদ জাতীয় রাজনীতি আর্ন্তজাতিক সারাদেশ অর্থনীতি খেলা বিনোদন আজকের পত্রিকা প্রযুক্তি চাকরি

সংগঠিত হওয়ার চেষ্টায় আওয়ামী লীগ

  • আপলোড তারিখঃ ২৫-০৫-২০২৬ ইং
সংগঠিত হওয়ার চেষ্টায় আওয়ামী লীগ

গণঅভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত ও গণহত্যায় জড়িত থাকার অভিযোগে কার্যক্রম নিষিদ্ধ ঘোষিত আওয়ামী লীগ ফের সাংগঠনিকভাবে ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা চালাচ্ছে। ইতোমধ্যে দলটির নেতা-কর্মীরা মিটিং ও মিছিল শুরু করেছেন। পাশাপাশি অনলাইনে নানা গ্রুপ খুলে তারা দলীয় কর্মকাণ্ডের গতি বাড়ানোর চেষ্টা করছেন। অবশ্য সরকারি দল বিএনপি ও বিরোধী দল জামায়াত-এনসিপি জোট কোনোভাবেই নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগকে মাঠে দাঁড়াতে দেবে না বলে হুঁশিয়ারি দিচ্ছে। রাজনৈতিকভাবে কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতারা এখন অস্তিত্ব রক্ষায় ফের নড়েচড়ে বসেছেন। দীর্ঘদিন বিচ্ছিন্ন থাকার পর দেশের বাইরে পালিয়ে থাকা বেশির ভাগ নেতা এখন কর্মীদের সঙ্গে ফের যোগাযোগ শুরু করেছেন। অথচ ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর দলটির শীর্ষ নেতৃত্বের বড় অংশ দেশত্যাগ ও আত্মগোপনে থাকাবস্থায় প্রথমদিকে অনেকটাই নীরবতা পালন করছিলেন। এমনকি কর্মীদের সঙ্গেও যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন ছিলেন তারা।


২০২৪ সালের আগস্টে জুলাই বিপ্লবে ক্ষমতাচ্যুত হয় আওয়ামী লীগ। ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার ২০২৫ সালের ১২ মে প্রজ্ঞাপন জারি করে আওয়ামী লীগ ও এর অঙ্গ-সহযোগী সংগঠনের সব ধরনের রাজনৈতিক কার্যক্রম সাময়িকভাবে নিষিদ্ধ করে। তখন সরকারপক্ষ থেকে বলা হয়েছিল, গণহত্যা, গুম, দমন-পীড়ন এবং রাষ্ট্রীয় সহিংসতায় জড়িত থাকায় দলটির কার্যক্রম নিষিদ্ধ করা হয়েছিল। পরে গত অধিবেশনে জাতীয় সংসদে ‘সন্ত্রাস বিরোধী (সংশোধন) আইন, ২০২৬’ পাস হওয়ার পর দলটির প্রকাশ্য রাজনৈতিক কার্যক্রম কার্যত অচল হয়ে পড়ে।


রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, আওয়ামী লীগের বর্তমান সংকট কেবল রাজনৈতিক নয়, এটি এখন দলটির অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার লড়াইয়ে পরিণত হয়েছে। একদিকে রাষ্ট্রীয় কঠোরতা, অন্যদিকে বিএনপির অবস্থানগত পরিবর্তন এবং জামায়াত-এনসিপির প্রকাশ্য বিরোধিতায় দলটির সামনে গভীর অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। পাশাপাশি গুম-খুনের সঙ্গে জড়িত নেতাদের ব্যাপারে খোদ দলটির দেশে অবস্থান করা অনেক নেতা-কর্মীর নেতিবাচক অবস্থান রয়েছে।
লেখক ও ইতিহাস গবেষক মহিউদ্দিন আহমদ বলেন, ‘আওয়ামী লীগ রাজনীতিতে ফিরতে চায় কি না, আগে সেটি দলটিকে রাজনৈতিকভাবে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। কারণ, শীর্ষ নেতৃত্ব গুম-খুনের মামলায় অভিযুক্ত হয়ে দেশের বাইরে অবস্থান করছে। বিদেশে বসে এখনো যেসব উগ্র বক্তব্য দেওয়া হচ্ছে, সেগুলো খোদ দলীয় নেতা-কর্মীরাও ইতিবাচকভাবে নিচ্ছেন না।’ তিনি আরও বলেন, ‘দেশে আওয়ামী লীগের নেতৃত্ব কে দেবে, সেটি এখনো স্পষ্ট নয়। কয়েকটি অফিস খোলা বা বিচ্ছিন্ন কর্মসূচিকে রাজনৈতিক পুনরুত্থান বলা যাবে না। অনেক ক্ষেত্রে বিভ্রান্ত ও ছত্রভঙ্গ নেতা-কর্মীরা নিজেদের উদ্যোগে এসব করার চেষ্টা করছেন।’ তার মতে, ‘আওয়ামী লীগ যদি বাস্তব রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় ফিরতে চায়, তাহলে দলটির ভেতরে নেতৃত্ব, দায়বদ্ধতা ও অতীতের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড নিয়ে বড় ধরনের আত্মসমালোচনা প্রয়োজন।’


সংসদে আইন পাসের পর কঠোর নিয়ন্ত্রণ:
গত এপ্রিল মাসে জাতীয় সংসদে ‘সন্ত্রাস বিরোধী (সংশোধন) আইন, ২০২৬’ পাস হওয়ার পর আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ আরও সংকুচিত হয়ে পড়ে। সংশোধিত আইনে রাষ্ট্রবিরোধী কর্মকাণ্ড, সহিংসতা, গণহত্যা এবং দেশের আইনশৃঙ্খলা বিনষ্টের অভিযোগে অভিযুক্ত সংগঠনের কার্যক্রম নিষিদ্ধ করার পর দলটির সামনে সংকট আরো বেড়েছে। আইন পাসের পর আওয়ামী লীগের সভা-সমাবেশ, মিছিল, কার্যালয় পরিচালনা এবং সাংগঠনিক কার্যক্রমের ওপর কার্যত সর্বাত্মক নিয়ন্ত্রণ সরকারের প্রশাসনের হাতে। ইতিমধ্যে সরকারের পক্ষ থেকে মাঠ পর্যায়ে কঠোর নজরদারিও বাড়ানো হয়েছে। সরকারি সূত্রগুলো বলছে, নিষিদ্ধ ঘোষিত দলের পুনঃসক্রিয়তার যেকোনো প্রচেষ্টা কঠোরভাবে দমন করা হবে। গোয়েন্দা নজরদারি জোরদারের পাশাপাশি মাঠ প্রশাসনকেও কড়া নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।


কয়েক জেলায় গোপন সাংগঠনিক তৎপরতা:
গোয়েন্দা ও রাজনৈতিক সূত্রগুলো বলছে, এপ্রিল ও মে মাসে খুলনা, চট্টগ্রাম, গাজীপুর, নোয়াখালী, গোপালগঞ্জ, কুমিল্লা এবং ঢাকার কয়েকটি এলাকায় আওয়ামী লীগ ও অঙ্গসংগঠনের সাবেক নেতারা সাংগঠনিক কর্মকাণ্ড পুনরুজ্জীবিত করার চেষ্টা করছেন। বিশেষ করে ছাত্রলীগ, যুবলীগ ও স্বেচ্ছাসেবক লীগের সাবেক নেতাদের মাধ্যমে ওয়ার্ড, থানা ও উপজেলা পর্যায়ে অনানুষ্ঠানিক কমিটি সমন্বয়ের অভিযোগ রয়েছে। অনেক এলাকায় সাংগঠনিক নির্দেশনা সরাসরি নয়, বরং অনলাইন প্ল্যাটফর্ম ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমভিত্তিক গ্রুপের মাধ্যমে আদান-প্রদান হচ্ছে। আপাতত প্রকাশ্য বড় কর্মসূচির পরিবর্তে জাতীয় দিবস, ঐতিহাসিক রাজনৈতিক তারিখ এবং সামাজিক অনুষ্ঠানকে কেন্দ্র করে ধীরে ধীরে কর্মীদের মাঠে সক্রিয় করার কৌশল নিয়েছে দলটি।


ঝটিকা মিছিল, মামলা ও গ্রেপ্তার:
সম্প্রতি খুলনা মহানগরের জিরো পয়েন্ট এলাকায় আওয়ামী লীগের ঝটিকা মিছিল রাজনৈতিক অঙ্গনে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়। পরে ওই ঘটনায় ১১৩ জনের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়। এর মধ্যে ৭৩ জনের নাম উল্লেখ করা হয় এবং বাকিদের অজ্ঞাত আসামি করা হয়। যশোরেও চলতি গোপন বৈঠক করায় ৩০ এপ্রিল সাবেক ৫ এমপিসহ ৪০ জনের নামে মামলা করা হয়েছে। চট্টগ্রামের জামিয়াতুল ফালাহ এলাকায় আওয়ামী লীগ ও অঙ্গসংগঠনের মিছিলের অভিযোগে কয়েকজনকে গ্রেফতার করা হয়। নোয়াখালী জেলা আওয়ামী লীগ অফিসের সামনে ব্যানার টাঙিয়ে কর্মসূচি পালনের চেষ্টার ঘটনাও প্রশাসনের নজরে আসে। এর আগে রাজধানীর গুলিস্তান ও জিরোপয়েন্ট এলাকায় ঝটিকা মিছিলের চেষ্টা এবং ৭ মার্চ বঙ্গবন্ধুর ভাষণ প্রচারের ঘটনায় কয়েকজনকে আটক করা হয়। গত ১২ মার্চ জিরোপয়েন্ট থেকে গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়া পর্যন্ত শোভাযাত্রার চেষ্টায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক আ ক ম জামাল উদ্দীনকে গ্রেপ্তার করে সন্ত্রাসবিরোধী আইনে মামলা দেওয়া হয়।


আওয়ামী লীগ প্রশ্নে বিএনপির অবস্থান বদল:
আওয়ামী লীগ প্রশ্নে বিএনপি শুরুতে তুলনামূলক কৌশলী অবস্থানে থাকলেও সংসদে আইন পাসের পর দলটির অবস্থান আরও কঠোর হয়েছে। বিএনপির নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের নেতারা এখন প্রকাশ্যেই আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক পুনর্বাসনের বিরোধিতা করছেন। দলটির অভ্যন্তরে ধারণা তৈরি হয়েছে, আওয়ামী লীগের পুনরুত্থান বিএনপির রাজনৈতিক লক্ষ্য ও ক্ষমতার সমীকরণের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। বিশেষ করে সংসদে আইন পাসের পর বিএনপি আওয়ামী লীগ ইস্যুতে প্রশাসনিক পদক্ষেপ ও আইনি অবস্থানের পক্ষে সরাসরি অবস্থান নেয়। আওয়ামী লীগের কার্যক্রমকে ‘নিষিদ্ধ সংগঠনের পুনঃসক্রিয়তার চেষ্টা’ হিসেবে দেখছে দলটির বড় অংশ। বিএনপির একাধিক নেতা মনে করছেন, আওয়ামী লীগকে রাজনৈতিকভাবে পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে রাখাই এখন তাদের জন্য সবচেয়ে নিরাপদ কৌশল। ফলে ভোটের আগে কিছুটা কৌশলী অবস্থান থাকলেও এখন দলটি কার্যত হার্ডলাইনে চলে গেছে। দলটির ভাইস-চেয়ারমান শামসুজ্জামান দুদু বলেন, ‘কোনোভাবেই আওয়ামী লীগকে ফেরার সুযোগ দেবে না বিএনপি। কারণ, দলটি গণহত্যা ও গণতন্ত্র হত্যা করেছে।’


কঠোর জামায়াত ও এনসিপি:
আওয়ামী লীগের প্রত্যাবর্তনের প্রশ্নে সবচেয়ে কঠোর অবস্থানে রয়েছে জামায়াতে ইসলামী ও জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)। দল দুটি প্রকাশ্যেই আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে ফেরার যেকোনো সম্ভাবনার বিরোধিতা করছে। জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এহসানুল মাহবুব জুবায়ের বলেন, ‘গণহত্যাকারী আওয়ামী লীগ নেতাদের বিচার চলছে। দলটির কার্যক্রম নিষিদ্ধ। কোনোভাবেই তাদের রাজনৈতিক কার্যক্রম চালানোর সুযোগ দেওয়া হবে না। আওয়ামী লীগ পুনর্বাসনের যেকোনো চেষ্টা জনগণ প্রতিহত করবে।’ এনসিপির যুগ্ম-মুখ্য সমন্বয়ক আরিফুর রহমান তুহীন বলেন, ‘গণহত্যা, গুম, দমন-পীড়ন ও অর্থপাচারের দায়ে অভিযুক্ত একটি দলকে রাজনীতিতে ফেরানোর প্রশ্নই ওঠে না। কেউ সেই চেষ্টা করলে রাজনৈতিকভাবে তার মূল্য দিতে হবে।’


তৃণমূলে হতাশা:
আওয়ামী লীগের ভেতরে এখন সবচেয়ে বড় সংকট নেতৃত্ব ও গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে। পতনের পর দলটির অধিকাংশ কেন্দ্রীয় নেতা দেশ ছেড়ে যান বা আত্মগোপনে চলে যান। তাদের অনেকেই বিদেশে অবস্থান করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কর্মীদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছেন। তৃণমূলের নেতা-কর্মীদের অভিযোগ, বর্তমান নেতৃত্ব বাস্তবতা অনুধাবনে ব্যর্থ। গুম, খুন, দমন-পীড়ন, দুর্নীতি ও অর্থপাচারের অভিযোগে বিতর্কিত নেতাদের সামনে রেখে আওয়ামী লীগের পক্ষে জনসমর্থন পুনরুদ্ধার করা সম্ভব নয়। ফলে দলটির ভেতরে ‘রিফর্মড আওয়ামী লীগ’ বা নেতৃত্ব পুনর্গঠনের প্রশ্ন সামনে চলে এসেছে। তৃণমূলের একটি অংশ ক্লিন ইমেজধারী নতুন নেতৃত্ব চাইলেও কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব এখনো শেখ হাসিনাকেই দলের একমাত্র নেতৃত্ব হিসেবে তুলে ধরছে।


আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম বলছেন, শেখ হাসিনার নেতৃত্বেই আওয়ামী লীগ চলবে। তার কোনো বিকল্প নেই। তিনি বলেন, আওয়ামী লীগকে রাজনীতির বাইরে রেখে গণতন্ত্রের আলাপ হাস্যকর। কর্মীদের নিরাপদে রেখেই আপাতত দলের কর্মকাণ্ড অবশ্যই বাড়ানো হবে। সে লক্ষ্যে কাজও চলছে। নতুন সরকার দেশে গণতন্ত্র চাইলে আওয়ামী লীগকে রাজনীতির সুযোগ দেবে বলেও প্রত্যাশা তার।



কমেন্ট বক্স
notebook

সংগঠিত হওয়ার চেষ্টায় আওয়ামী লীগ