সারা বিশ্বের দৃষ্টি ছিল ইসলামাবাদে। সবাই তাকিয়ে ছিল যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদলের শান্তি আলোচনা কোন ফলাফল নিয়ে আসে সেদিকে। কিন্তু কোনো সুখবর পেল না বিশ্ববাসী। ব্যর্থতায় শেষ হয়েছে ইসলামাবাদ আলোচনা। দুই পক্ষই যুদ্ধে জয়ী হওয়ার দাবি করে পাকিস্তানের ইসলামাবাদে সংলাপে বসেছিল। তাই শুরু থেকেই এই সংলাপে কোনো সমঝোতায় পৌঁছানো বেশ কঠিন বলে ধারণা করা হচ্ছিল। শেষ পর্যন্ত ব্যর্থতার জন্য একে অপরকে দায়ী করে ইসলামাবাদ ছেড়ে গেল। আলোচনা ব্যর্থ হওয়ার কারণ হিসেবে ওয়াশিংটনের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, তেহরান পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি বন্ধের ব্যাপারে কোনো প্রতিশ্রুতি দিতে রাজি হয়নি। ইরান সবসময়ই পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির চেষ্টার কথা অস্বীকার করে আসছে। এখন এক বছরের মধ্যে দুটি যুদ্ধের ঘটনা হয়তো দেশটিতে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি সংক্রান্ত দাবিকে আরও জোরালো করবে।
আর পাকিস্তান সফররত ইরানের প্রতিনিধি দলের ঘনিষ্ঠ একটি সূত্রের বরাত দিয়ে দেশটির ফার্স নিউজ এজেন্সি বলেছে, যুক্তরাষ্ট্র আলোচনায় এমন কিছু বিষয় দাবি করেছে, যা তারা যুদ্ধের মাধ্যমেও অর্জন করতে পারেনি। সংশ্লিষ্ট ওই সূত্র জানায়, হরমুজ প্রণালি, ইরানের শান্তিপূর্ণ পারমাণবিক জ্বালানি কর্মসূচি ও আরও বেশ কিছু বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের উচ্চাভিলাষী শর্তগুলো তেহরান মেনে নেয়নি। এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন- এরপর কী হবে? বিবিসির আন্তর্জাতিক সংবাদদাতা জো ইনউড লিখেছেন, সংলাপের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল হরমুজ প্রণালি। যা ইরান প্রায় বন্ধ করে রেখেছে। এখন আলোচনার মাধ্যমে সেটি খুলে দেওয়ার সম্ভাবনা কার্যত শেষ হয়ে গেল। উপসাগরে দুটি মার্কিন যুদ্ধজাহাজ মোতায়েনের ঘটনা ইঙ্গিত দিচ্ছে, যুক্তরাষ্ট্র এবার ভিন্ন পথে এগোতে চাইছে।
২১ ঘণ্টায়ও সমঝোতা হয়নি:
মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জে ডি ভ্যান্স বলেছেন, ২১ ঘণ্টা আলোচনার পরও ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র কোনো সমঝোতায় পৌঁছাতে পারেনি। সমঝোতা ছাড়াই পাকিস্তান ছাড়ার পরিকল্পনা করছে যুক্তরাষ্ট্র। এটি দুঃসংবাদ বলেন ভ্যান্স। ঐতিহাসিক শান্তি আলোচনার পর পাকিস্তানের ইসলামাবাদে গতকাল রোববার সকালে সংবাদ সম্মেলনে এ কথা জানান ভ্যান্স। মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ও ফিল্ড মার্শালের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানান। পাকিস্তান অসাধারণ ভূমিকা রেখেছেন বলে জানান ভ্যান্স। তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র গুরুত্বপূর্ণ শর্তগুলো স্পষ্টভাবে ইরানকে জানিয়েছে। তবে ইরান তাতে রাজি হয়নি।
ইরানের পরমাণু সক্ষমতা নিয়ে কিছু প্রশ্নের উত্তর দেন ভ্যান্স। ইরানের পরমাণু কর্মসূচি ধ্বংস করে দেওয়া হয়েছে বলে জানান ভ্যান্স। তবে ভবিষ্যতে ইরান যাতে পরমাণু অস্ত্র তৈরি না করে সে জন্য দৃঢ় অঙ্গীকার প্রয়োজন। তবে সেটা এখনো প্রতীয়মান হয়নি। এমনটা হবে বলে যুক্তরাষ্ট্র আশা করছে। আল-জাজিরার খবর বলছে, এর আগে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চলমান আলোচনা নিয়ে একটি বিবৃতি দিয়েছেন ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাগাই। ওই বিবৃতিতে বলা হয়, যুক্তরাষ্ট্রের দাবি অতিরিক্ত ও বেআইনি। ইরানের বৈধ অধিকার ও স্বার্থকে মেনে নেওয়ার ওপরও আলোচনার সাফল্য নির্ভরশীল বলে জানান বাগাই।
আলোচনা গড়ায় দ্বিতীয় দিনে:
পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার আলোচনা দ্বিতীয় দিনে গড়িয়েছে। আলোচনার সময়সীমা আরও একদিন বাড়ানো হয়েছে। গতকাল রোববারও চলে ঐতিহাসিক আলোচনা। ইরানি সূত্রগুলো জানিয়েছে, টানা ১৪ ঘণ্টা (কোনো কোনো সংবাদমাধ্যম বলছে ১৫ ঘণ্টা) আলোচনার পর দুই পক্ষ এখন বিশেষজ্ঞ পর্যায়ে খসড়া বিনিময় করছে। এটি সংশ্লিষ্টদের মধ্যে এই আশা জাগাচ্ছে যে, একটি বৃহত্তর কাঠামোর বিষয়ে উভয় পক্ষ ইতিমধ্যে একমত হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা এখন পরবর্তী পদক্ষেপের বিস্তারিত বিষয়গুলো নিয়ে কাজ করছেন। ঘটনাপ্রবাহ পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, প্রথমে ইরানি প্রতিনিধিদল এবং পরে মার্কিন প্রতিনিধিদল ইসলামাবাদে পৌঁছায়। এরপর আয়োজক পাকিস্তান দুই পক্ষের সঙ্গে আলাদাভাবে বৈঠক করে। লেবাননে যুদ্ধবিরতি এবং হরমুজ প্রণালি নিয়ে মতভেদ থাকা সত্ত্বেও শেষ পর্যন্ত উভয় পক্ষ সরাসরি আলোচনায় বসে। ইরান তাদের জব্দ করা সম্পদ ছেড়ে দেওয়ার বিষয়ে আগের অবস্থানেই অনড় ছিল। আলোচনা কক্ষ থেকে খুব সামান্য তথ্যই বাইরে এসেছে। তবে সূত্রগুলো থেকে পাওয়া তথ্যে বোঝা যাচ্ছে, আলোচনার প্রক্রিয়ায় নানা চড়াই-উতরাই থাকলেও সামগ্রিক পরিবেশ ছিল ইতিবাচক।
আলোচনা চালিয়ে যাবে ইরান-যুক্তরাষ্ট্র:
পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে আলোচনা শেষ হয়েছে। উচ্চপর্যায়ের এ আলোচনার পর প্রক্রিয়াটি এখন কারিগরি পর্যায়ে পৌঁছেছে, যেখানে উভয় পক্ষ লিখিত প্রস্তাব বিনিময় করছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে (সাবেক টুইটার) দেওয়া এক পোস্টে ইরান সরকার জানিয়েছে, ইসলামাবাদে উচ্চপর্যায়ের বৈঠক শেষে দুই দেশের কারিগরি দল এখন বিস্তারিত প্রস্তাব ও ‘বিশেষজ্ঞ পর্যায়ের খসড়া’ বিনিময় করছে। পোস্টে আরও বলা হয়, কিছু বিষয়ে এখনো মতপার্থক্য থাকলেও আলোচনা অব্যাহত থাকবে। এর মাধ্যমে ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে যে, গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোর দূরত্ব কমিয়ে আনতে আলোচনা এখন খসড়া তৈরির চূড়ান্ত পর্যায়ে প্রবেশ করেছে। মধ্যপ্রাচ্যে টেকসই যুদ্ধবিরতি এবং আঞ্চলিক উত্তেজনা প্রশমনের লক্ষ্যে পাকিস্তান এ প্রক্রিয়ায় মধ্যস্থতা করছে। কয়েক সপ্তাহের পরোক্ষ কূটনীতির পর এ আলোচনা এখন একটি কাঠামোগত রূপ পেয়েছে। বর্তমানে কারিগরি, রাজনৈতিক ও নিরাপত্তাসংক্রান্ত প্রস্তাবগুলোর ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
ইরানকে শেষ করে দেওয়ার হুমকি ট্রাম্পের:
ইরানকে ‘শেষ করে দেওয়ার’ হুমকি দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ট্রাম্প নিজের মালাকানাধীন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ‘ট্রুথ সোশ্যালে’ দেওয়া এক পোস্টে বলেছেন, ওয়াশিংটন যুদ্ধের জন্য পুরোপুরি প্রস্তুত। ‘উপযুক্ত সময়ে’ ইরানকে ‘শেষ করে দেবে’ মার্কিন বাহিনী। পাকিস্তানের ইসলামাবাদে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার প্রায় ২১ ঘণ্টার আলোচনা কোনো চুক্তি ছাড়াই শেষ হওয়ার কয়েক ঘণ্টার মাথায় ট্রাম্প এই হুমকি দিলেন।
যুদ্ধবিরতি রক্ষার আহ্বান পাকিস্তানের:
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে অনুষ্ঠিত ঐতিহাসিক সরাসরি আলোচনা কোনো ধরনের সমঝোতা ছাড়াই শেষ হয়েছে। এই পরিস্থিতিতে দুই পক্ষকে যুদ্ধবিরতির প্রতিশ্রুতি বজায় রাখার আহ্বান জানিয়েছেন পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইশহাক দার। মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি প্রতিষ্ঠায় দুই দেশ আগামীতেও ‘ইতিবাচক মনোভাব’ বজায় রাখবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন। বৈঠক শেষে দেওয়া এক বিবৃতিতে ইশহাক দার বলেন, ‘উভয় পক্ষকে যুদ্ধবিরতির বিষয়ে তাদের প্রতিশ্রুতি রক্ষা করা এবং তা বজায় রাখা অত্যন্ত জরুরি।’ পররাষ্ট্রমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে দেওয়া এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়েছে।
মধ্যস্থতার প্রস্তাব রাশিয়ার:
ইসলামাবাদ সংলাপ ব্যর্থ হওয়ার পর মধ্যস্থতার প্রস্তাব দিল রাশিয়া। ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানের সঙ্গে গতকাল রোববার ফোনালাপ করেছেন রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন। আলাপে পুতিন বলেছেন, মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য মধ্যস্থতার প্রচেষ্টায় সহায়তা করতে তিনি প্রস্তুত। দুই নেতার ফোনালাপের একটি বিবরণ গণমাধ্যমে পাঠিয়েছে ক্রেমলিন। এতে বলা হয়েছে, ভøাদিমির পুতিন সংঘাতের রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক সমাধানের পথ খুঁজে বের করতে এবং স্থায়ী শান্তি অর্জনে মধ্যস্থতার প্রচেষ্টায় আরও সহায়তা করতে চান। তিনি জোর দিয়ে বলেন, সহায়তার জন্য তার প্রস্তুতিও আছে।
হরমুজে টোল দিতে হবে রিয়ালে:
ইসলামাবাদে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে উচ্চপর্যায়ের শান্তি আলোচনা কোনো চুক্তি ছাড়াই শেষ হয়েছে। আলোচনার অন্যতম প্রধান বাধা ছিল কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি নিয়ন্ত্রণের বিষয়টি। এ জলপথ দিয়ে বিশ্বের মোট ব্যবহৃত জ্বালানি তেলের প্রায় ২০ শতাংশ ও এলএনজি (তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস) পরিবহন করা হয়। ইরানের সংবাদ সংস্থা মেহের নিউজ বলেছে, দেশটির পার্লামেন্টের ডেপুটি স্পিকার হাজি বাবেয়ি হরমুজ প্রণালিকে তেহরানের জন্য একটি ‘রেড লাইন’ বা চূড়ান্ত সীমা হিসেবে অভিহিত করেছেন। তিনি সাফ জানিয়ে দেন, প্রণালিটি পুরোপুরি ইরানের নিয়ন্ত্রণে আছে এবং এখান দিয়ে জাহাজ চলাচলের জন্য অবশ্যই ইরানি মুদ্রা ‘রিয়ালে’ টোল পরিশোধ করতে হবে।
সমীকরণ প্রতিবেদন