ময়নাতদন্ত শেষে সেনা হেফাজতে মারা যাওয়া জীবননগর পৌর বিএনপির সাধারণ সম্পাদক শামসুজ্জামান ডাবলুর প্রথম জানাজা গতকাল বুধবার বেলা ১১টায় অনুষ্ঠিত হয়েছে। তার ছোট ভাই আব্দুল্লাহ আল মামুন ফ্রান্স থেকে দেশে ফিরলে আজ বৃহস্পতিবার দ্বিতীয় জানাজা শেষে পৌর কেন্দ্রীয় কবরস্থানে তাকে দাফন করা হবে। এদিকে, সেনাবাহিনী এই অভিযানকে যৌথ বাহিনীর অভিযান বললেও জেলা পুলিশ সুপার বলছেন অভিযানের বিষয়ে কিছুই জানত না পুলিশ।
ডাবলুর প্রথম জানাজা:
গতকাল বৃহস্পতিবার বেলা ১১টায় ডাবলুর প্রথম জানাজা অনুষ্ঠিত হয় জীবননগর কেন্দ্রীয় ঈদগাহ ময়দানে। হাজার হাজার মানুষ ডাবলুর জানাজায় অংশ নেয়। ডাবলুর জানাজায় উপস্থিত ছিলেন চুয়াডাঙ্গার অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট ও অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক বি. এম. তারিক-উজ-জামান, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (সদর সার্কেল) মো. মোস্তাফিজুর রহমান, সহকারী পুলিশ সুপার (দামুড়হুদা সার্কেল) মো. আনোয়ারুল কবীর, চুয়াডাঙ্গা জেলা বিএনপি ও বিজিএমইএ’র সভাপতি এবং চুয়াডাঙ্গা-২ আসনে বিএনপির প্রার্থী মাহমুদ হাসান খান বাবু, জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক ও চুয়াডাঙ্গা-১ আসনের বিএনপির প্রার্থী শরীফুজ্জামান শরীফ, বিশিষ্ট ব্যবসায়ী সিআইপি সাহিদুজ্জামান টরিক, চুয়াডাঙ্গা জেলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি ও পাবলিক প্রসিকিউটর মারুফ সারোয়ার বাবু, সাধারণ সম্পাদক খন্দকার অহিদুল আলমসহ বিএনপি, অঙ্গ সংগঠনের নেতা-কর্মী, বিভিন্ন দলের প্রতিনিধি ও শুভানুধ্যায়ী।
জানাজার আগে সংক্ষিপ্ত বক্তব্যে চুয়াডাঙ্গা জেলা বিএনপি সভাপতি মাহমুদ হাসান খান বাবু ও সাধারণ সম্পাদক শরীফুজ্জামান শরীফ বলেন, ‘আমরা আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। আমরা এই বাংলাদেশে এমন মৃত্যু প্রত্যাশা করি না। আমরা এর সঠিক বিচার চাই। আর যেন কাউকে এভাবে মরতে না হয়।’ অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (সদর সার্কেল) মো. মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, ‘আমরা জেলা পুলিশের পক্ষ থেকে খুবই মর্মাহত। পরিবারের প্রতি আমাদের সমবেদনা। আমরা আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকব। পুলিশের পক্ষ থেকে এই ঘটনার বিচারে সার্বিক সহযোগিতা করা হবে।’
অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট ও অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক বি. এম. তারিক-উজ-জামান বলেন, জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে আমরা আপনাদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানাই- কারণ আপনারা আমাদের সার্বিক সহযোগিতা করেছেন। যে ঘটনা ঘটেছে ভাষাই প্রকাশ করা যাবে না। সমবেদনা দেওয়ার মতো ভাষা আমাদের নাই। যার হারায়, সেই একমাত্র বোঝে আমরা কী হারালাম। সুষ্ঠু এবং নিরপেক্ষ তদন্তের জন্য যা যা করার দরকার জেলা প্রশাসনের পক্ষে থেকে সেটি করা হবে। সুষ্ঠু বিচার হবে। তদন্তে জারা জড়িত হবে, কেউ ছাড় পাবে না।
গায়ে আঘাতের চিহ্ন, অভিযোগ হয়নি এখনো:
শামসুজ্জামান ডাবলুর গায়ে আঘাতের চিহ্ন পাওয়া গেলেও এ বিষয়ে প্রশাসনের কেউ কোনো বক্তব্য দেননি। তবে তার গায়ে আঘাতের চিহেৃর বেশ কয়েকটি ছবি দৈনিক সময়ের সমীকরণ পত্রিকার হাতে এসেছে। গত মঙ্গলবার বিকেলে চুয়াডাঙ্গা সদর হাসপাতালে ডাবলুর ময়নাতদন্ত করা হয়। ময়নাতদন্ত শেষে রাতে তার লাশ জীবননগর আশতলাপাড়ার বাড়িতে আনা হয়। বর্তমানে তার লাশ হিমাগার অ্যাম্বুলেন্সে বাড়ির সামনে রাখা হয়েছে। ময়নাতদন্তের আগে মঙ্গলবার সকালে জীবননগর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে জীবননগর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মো. আল-আমীনের উপস্থিতিতে জীবননগর থানা-পুলিশ শামসুজ্জামান ডাবলুর মরদেহের সুরতহাল করে।
জীবননগর উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. মকবুল হাসান বলেন, ‘মঙ্গলবার রাত ১২টা ১৬ মিনিটের দিকে পৌর বিএনপির সাধারণ সম্পাদক শামসুজ্জামান ডাবলুকে জরুরি বিভাগে আনা হয়। ওই সময় ওনার পালস, পিপি কিছুই ছিল না। ইসিজিসহ পরীক্ষা-নিরীক্ষা শেষে তাকে মৃত ঘোষণা করা হয়। তার শরীরে আঘাতের চিহ্ন ছিল।’
ডাবলুর ময়নাতদন্ত করেন চুয়াডাঙ্গা সদর হাসপাতালের সিনিয়র সার্জারি কনসালটেন্ট ডা. এহসানুল হক তন্ময়। তিনি বলেন, সুরতহাল অনুযায়ী শরীরের চিহ্ন সঙ্গতিপূর্ণ পেয়েছি। রিপোর্ট আসার পরই মৃত্যুর প্রকৃত কারণ ও অন্যান্য বিষয়ে বলা যাবে। এ বিষয়ে জানতে চাইলে জীবননগর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সোলায়মান সেখ বলেন, ‘আমাদের কাছে কেউ কোনো অভিযোগ করেনি।’ ডাবলুর গায়ে আঘাতের চিহ্ন আছে কী জানতে চাইলে ওসি বলেন, ‘আমরা যেভাবে পেয়েছি সেভাবেই সুরতহাল প্রস্তুত করে পোর্স্টমর্টেমের জন্য পাঠিয়েছি।’
এদিকে, ডাবলুর মৃত্যুর ঘটনায় ৮ জনের নাম উল্লেখ করে একটি অভিযোগ লেখা হয়েছিল যা, দৈনিক সময়ের সমীকরণ-এর কাছে তথ্য এসেছে। অভিযোগটিতে অভিযোগকারীর নাম শরিফুল ইসলাম। তিনি ডাবলুর ভাই। শরিফুল ইসলামের সাথে মুঠোফোনে কথা হলে তিনি বলেন, ‘আমি থানায় গিয়েছিলাম, ওসি সাহেব কোর্টের একটি পারমিশন চাচ্ছে। আমরা প্রস্তুতি নিচ্ছি, দ্রুতই বিজ্ঞ আদালতের মাধ্যমে মামলা দায়ের করব।’
এ বিষয়ে জানতে চাইলে চুয়াডাঙ্গার অতিরিক্ত জেলা পুলিশ সুপার (ক্রাইম অ্যান্ড অপস্) জামাল আল-নাসের বলেন, ‘জীবননগরে বিএনপি নেতাকে তুলে নেওয়ার সময়ে জেলা পুলিশের কোনো সদস্য ছিলেন না। তবে যখন ওই নেতাকে জীবননগর স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যায়, তখন পুলিশ খবর পায়। পরে সেখানে যান পুলিশ সদস্যরা।’ তবে অভিযোগের বিষয়ে ওসির সাথে কথা বলার পরামর্শ দিয়ে তিনি বলেন, ‘বিষয়টি আমার জানা নেই। ওসি সাহেবের সাথে একটু কথা বলেন।’
পুলিশ সুপার মোহাম্মদ মনিরুল ইসলাম বলেন, ‘এই অভিযানের বিষয়ে পুলিশ কিছুই জানত না। হাসপাতালে নেবার পর আমাদের জানানো হয়েছে। মামলার বিষয়ে রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দসহ সকলেই একমত আদালতের মাধ্যমে তারা মামলাটি করবেন। এ বিষয়ে সেনাবাহিনীও সেনা আইনে পদক্ষেপ নিচ্ছে। পুলিশ অভিযানে থাকলে তো উত্তেজিত জনতা পুলিশের বিরুদ্ধেও অভিযোগ দিতো। কিন্তু সিভিল প্রশাসন এই ঘটনায় উদ্ধারকাজ করেছে।’
ডাবলুর লাশ ধোয়ান সাকিল হোসেন নামের এক যুবক। তিনি বলেন, ‘আমি বিগত ১৪ বছর ধরে লাশ ধোয়াই। আমি আমার চাচা ডাবলুর লাশ ধোয়াইছি। আমি দীর্ঘদিন লাশ ধোয়াই...এবং পোস্টমর্টেমের লাশও ধোয়াইছি আমি। সেই ক্ষেত্রে পোস্টমর্টেমের যেই সিনটমগুলো থাকে..সিনা থেকে নাভি বরাবর সেলাই দেয়। তবে ডাবলু চাচার ক্ষেত্রে অস্বাভাবিক লেগেছে..বাম হাতের কনুই থেকে কব্জি পর্যন্ত একটি সেলাই আছে। ডান পায়ের হাটুর নিচ থেকে গোড়ালির ওপর দুটি সেলাই আছে। এবং ধোয়ানোর সময় যখন চিত করিয়েছি..তখন তার পাছায় আঘাতের চিহৃ দেখেছি। এটা আমার কাছে অস্বাভাবিক মনে হয়েছে। কোনো লাঠির বাড়ি মনে হচ্ছে, থ্যাঁতলানো কালো কালশেরে (কালো দাগ) পড়েছিল। এবং ঘাড়ে তার আঘাত ছিল। অস্বাভাবিক মনে হয়েছে। এবং তার গলা বরাবর একটা দাগ আমার অস্বাভাবিক মনে হয়েছে।’
জব্দ তালিকা নিয়ে প্রত্যক্ষদর্শীদের মধ্যে ধোঁয়াসা:
জীবননগর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের অদূরে শামসুজ্জামান ডাবলুর ব্যবসা প্রতিষ্ঠান হাফিজা ফার্মেসি। এই ফার্মেসিতেই রাতে অভিযান পরিচালনা করে সেনাবাহিনী। অভিযানের সময় আশেপাশের দোকানদার ও ওই বাজারের নাইট গার্ডকে ডেকে নেয় তারা। প্রত্যক্ষদর্শীদের মধ্যে একজন ব্যবসায়ী জুয়েলকেও ওই রাতে সেনাবাহিনী ডেকে নিয়েছিলো। তার সাথে কথা হলে তিনি বলেন, ‘আমার পাশের দোকান ডাবলু ভাইয়ের। আমি দোকানেই ছিলাম। তিন-চারজন এসে বলল, আসেন আমরা দোকান সার্চ করব। তারপর তারা হুড়পাড় করে ভেতরে ঢুকল। তারা ড্রয়ার ভাঙার চেষ্টা করছিল। তখন আমরা বললাম, চাবি আছে, চাবি দিয়ে খোলেন। এরপর খুলে তারা ড্রয়ারের টাকা-পয়সাগুলো আমাদের দিয়ে দেয়। দোকানের পার্ট দুইটি। পিছনের দিকে কয়েকজন ঢুকেছিলো। ওদিকে একটু অন্ধকারও ছিল। লাইট দেবার পর এ কার্টুন ও কার্টুনে হাতাহাতি করতে করতে দুই-তিন মিনিটের মাথায় একজন বেরিয়ে এসে বলে পেয়েছি, পেয়েছি। তখন তারা অস্ত্রটি দেখায়।’
সাদা কাগজে স্বাক্ষরের গুঞ্জনের বিষয়ে জানতে চাইলে জুয়েল বলেন, ‘ওখানে তারা আমার নাম-ঠিকানা লিখে স্বাক্ষর করিয়ে নেয়। কিন্তু ওখানে তো আর প্রশ্ন করা যায় না। মঙ্গলবার বেলা একটার দিকে আমাকে ডেকেছিলো। আমিই এতোটুকুই বলেছি। ওনারা পাশেই যুবদলের একটি পার্টি অফিস আছে। সেখানে ডাবলু ভাইকে নিয়ে যায়। তবে ওখানে কউকে যেতে দেয়নি।’
চুয়াডাঙ্গা জেলা জজ আদালতের পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) অ্যাড. মারুফ সরোয়ার বাবু বলেন, ‘বেলা ১টা বেজে ৫ মিনিটে জীববনগর হাসপাতালের মধ্যে জব্দ তালিকা তৈরি করা হয়। সেখানে জেলা প্রশাসক, পুলিশ সুপার, কয়েকজন বিজ্ঞ আইনজীবীসহ কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।’
এদিকে, রাতের ঘটনায় পরেরদিন দুপুরে জব্দ তালিকা লেখা নিয়েও তৈরি হয়ে ধোঁয়াসা। বিশ্বস্ত সূত্রে জানা গেছে, ‘সেখানে জেলা প্রশাসক আপত্তি তুলে বলেন, এখন লেখা হলে আমি এটা মানব না। সাক্ষীদের বক্তব্য শোনার পরই এটি গ্রহণযোগ্য হবে। এসময় তিনজন সাক্ষীর মধ্যে শুধু জুয়েলকেই হাজির করা হয় বলে জানা গেছে।’
নিজস্ব প্রতিবেদক