সব জল্পনা-কল্পনার অবসান ঘটিয়ে নির্বাচনী যাত্রা শুরু হয়েছে। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে ঘিরে সব ধরনের প্রস্তুতিমূলক কার্যক্রমের পরিকল্পনা ঘোষণা করেছে নির্বাচন কমিশন। গতকাল বৃহস্পতিবার আগারগাঁওয়ের নির্বাচন ভবনের মিডিয়া সেন্টারে আনুষ্ঠানিকভাবে আসন্ন জাতীয় নির্বাচনের কর্মপরিকল্পনা ঘোষণা করেন ইসি’র অতিরিক্ত সচিব আখতার আহমেদ। পরিকল্পনা অনুযায়ী আগামী বছরের ফেব্রুয়ারির শুরুতে ভোট গ্রহণ করা হবে। আসছে ডিসেম্বরে তফসিল ঘোষণা করা হবে। ভোটের এই রোডম্যাপ ঘোষণাকে স্বাগত জানিয়েছে বিএনপি। দলটির নেতারা পৃথক প্রতিক্রিয়ায় বলেছেন, রোডম্যাপ ঘোষণায় তারা সন্তুষ্ট। দেশের মানুষ নির্বাচন চায়। বিএনপি’র সমমনা দলগুলোও রোডম্যাপকে স্বাগত জানিয়েছে। অন্যদিকে জামায়াত, ইসলামী আন্দোলন, জাতীয় নাগরিক পার্টি ভিন্ন প্রতিক্রিয়া দিয়েছে। জুলাই সনদ চূড়ান্ত না করে রোডম্যাপ ঘোষণা সঠিক হয়নি বলে জানিয়েছে এসব দল। এই রোডম্যাপ ঘোষণায় জটিলতা বাড়বে বলেও কোনো কোনো দল মত দিয়েছে।
সংবাদ সম্মেলনে ইসি’র অতিরিক্ত সচিব বলেন, প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয় থেকে আমাদের চিঠি দেয়া হয়েছিল, যাতে বলা হয়েছে রমজানের (ফেব্রুয়ারি-২০২৬) আগে নির্বাচন আয়োজন করতে হবে। তাই আজ আমরা আপনাদের আমাদের অ্যাকশন প্ল্যান জানাচ্ছি। আসন্ন জাতীয় নির্বাচনকে লক্ষ্য করে আমরা এই পদক্ষেপগুলোকে মূলত ২৪টি ভাগে ভাগ করে অ্যাকশন প্ল্যান প্রস্তুত করেছি। সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টার দপ্তর থেকে জানানো হয়েছে, আগামী রমজানের আগে ভোটের ব্যবস্থা করতে হবে। আগামী বছরের ১৭ থেকে ১৯ শে ফেব্রুয়ারি রমজান শুরু হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। সে হিসাবে ভোট রমজানের আগেই অনুষ্ঠিত হবে। নির্বাচনকে কেন্দ্র করে কমিশন কোনো প্রতিবন্ধকতা দেখছে কি না, এমন প্রশ্নের উত্তরে ইসি সচিব বলেন, প্রতিটি জিনিস চ্যালেঞ্জের। তবে পরিস্থিতি আসবে, সেটা মোকাবিলা করার জন্য যে মানসিক দৃঢ়তা প্রয়োজন, তা আমাদের সবারই আছে। নির্বাচনের আগে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে জানতে চাইলে সচিব বলেন, এটা স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিষয়। আমাদের কাজ হলো- নির্বাচন সম্পর্কিত কার্যক্রম এগিয়ে নিয়ে যাওয়া। আমরা স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে আলোচনা করবো। এটা পারস্পরিক একটা আলোচনার বিষয়। পরিস্থিতি অনুযায়ী আমরা এ আলোচনা এগিয়ে নেবো। যে ২৪ গুরুত্বপূর্ণ কার্যক্রম ইসি’র রোডম্যাপের মধ্যে রয়েছে তা হলো- অংশীজনের সংলাপ, ভোটার তালিকা প্রণয়ন, নির্বাচনী আইন বিধি সংস্কার, দল নিবন্ধন, নির্বাচনী এলাকার সীমানা নির্ধারণ, ভোটকেন্দ্র স্থাপন, পোস্টাল ভোটিং, পর্যবেক্ষক সংস্থার নিবন্ধন, দেশি-বিদেশি সাংবাদিক অনুমোদন; নির্বাচনের জন্য জনবল ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা, নির্বাচনী দ্রব্যাদি সংগ্রহ, আইনশৃঙ্খলা বিষয়ক কাযক্রম। অন্যান্য আইন-বিধি সংস্কার ও একীভূতকরণ; ম্যানুয়াল, নির্দেশিকা, পোস্টার, পরিচয়পত্র মুদ্রণ; প্রশিক্ষকদের প্রশিক্ষণ, স্বচ্ছ ব্যালট বাক্স উপযোগীকরণ, নির্বাচনী বাজেট বরাদ্দ, প্রচারণা ও উদ্বুদ্ধকরণ, টেলিযোগাযোগ ব্যবস্থা সুসংহতকরণ, ডিজিটাল মনিটর স্থাপন ও যন্ত্রপাতি সংযোজন, বেসরকারি প্রাথমিক ফলাফল প্রচার, ফলাফল প্রদর্শন, প্রকাশ ও প্রচার (বিভিন্ন মাধ্যমে); বিবিধ।
অংশীজনের সঙ্গে সংলাপ:
এর মধ্যে সেপ্টেম্বরের শেষ সপ্তাহ থেকে রাজনৈতিক দলসহ সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের সঙ্গে সংলাপ শুরু হবে, যা প্রায় দেড় মাস চলবে। অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে থাকবেন নিবন্ধিত রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধি, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, সুশীল সমাজ ও নারী সমাজের প্রতিনিধি, গণমাধ্যম সম্পাদক ও সাংবাদিক, পর্যবেক্ষক সংস্থার প্রতিনিধি, নির্বাচন বিশেষজ্ঞ ও আহত জুলাইযোদ্ধারা।
ভোটার তালিকা চূড়ান্তকরণ:
ইসি’র পরিকল্পনা অনুযায়ী ভোটার তালিকা চূড়ান্তকরণের সময়সূচি অনুযায়ী, ৩০ শে নভেম্বরের মধ্যে চূড়ান্ত ভোটার তালিকা প্রকাশ করা হবে। তফসিল ঘোষণার ন্যূনতম ৩ দিন আগে জাতীয় পরিচয় নিবন্ধন অনুবিভাগ থেকে আসনভিত্তিক যাচাই-বাছাইকৃত ভোটার তালিকা, ছবিসহ বা ছবিহীন, সংশ্লিষ্ট রেজিস্ট্রেশন অফিসারদের কাছে সিডি অথবা পিডিএফ লিংক আকারে পাঠানো হবে। এছাড়া নির্ধারিতসংখ্যক কপি মুদ্রণের মাধ্যমে ভোটার তালিকা বিতরণ করা হবে। নভেম্বর মাস জুড়ে ভোটার তালিকা হালনাগাদ কার্যক্রম চলবে, যেখানে শুধুমাত্র নতুন তথ্য ও ডাটা সন্নিবেশ করা হবে।
আরপিও সংশোধনী:
পরিকল্পনায় বলা হয়, নির্বাচন পরিচালনার আইনি ভিত্তি হিসেবে নির্বাচন পরিচালনা বিধিমালা, নির্বাচন কর্মকর্তা (বিশেষ বিধান) আইন ১৯৯১ এবং নির্বাচন কমিশন সচিবালয় আইন ২০০৯ বর্তমানে আইন মন্ত্রণালয়ে বিবেচনাধীন রয়েছে। এছাড়া সংসদীয় আসনের সীমানা নির্ধারণ আইন সংশোধন, ভোটার তালিকা আইন সংশোধন, ভোটকেন্দ্র নীতিমালা, দেশি-বিদেশি পর্যবেক্ষক ও সাংবাদিক নীতিমালা, নির্বাচন পরিচালনা (সংশোধন) ২০২৫, নির্বাচন কর্মকর্তা (বিশেষ বিধান) আইন ১৯৯১ এবং নির্বাচন কমিশন সচিবালয় আইন ২০০৯-এর সংশোধনী প্রক্রিয়া ৩০শে সেপ্টেম্বরের মধ্যে চূড়ান্ত হবে।
ভোটকেন্দ্র চূড়ান্ত:
ভোটকেন্দ্র স্থাপন ও ব্যবস্থাপনার নীতিমালা অনুযায়ী, গড়ে প্রতি ৩ হাজার ভোটারের জন্য একটি ভোটকেন্দ্র স্থাপন করা হবে। এছাড়া প্রতি ৬০০ পুরুষ ভোটারের জন্য একটি কক্ষ এবং প্রতি ৫০০ নারী ভোটারের জন্য একটি কক্ষ বরাদ্দ থাকবে। নির্বাচনী ম্যানুয়েল, নির্দেশিকা ও পোস্টারসহ সংশ্লিষ্ট সামগ্রী ১৫ই সেপ্টেম্বরের মধ্যে মুদ্রিত হবে। নির্বাচনী প্রশিক্ষণ ২৯শে আগস্ট থেকে শুরু হয়ে ভোটগ্রহণের ৪৫ দিন আগে শেষ হবে।
রাজনৈতিক দল নিবন্ধন:
রাজনৈতিক দল নিবন্ধন ৩০শে সেপ্টেম্বরের মধ্যে সম্পন্ন করে গেজেট প্রকাশ করা হবে- উল্লেখ করে সচিব জানান, সংসদীয় আসনের সীমানা নির্ধারণের কাজও ৩০শে সেপ্টেম্বরের মধ্যে শেষ হবে এবং ৩১ আগস্ট পর্যন্ত চূড়ান্ত ভোটার সংখ্যা ব্যবহার করে জিআইএস ম্যাপ প্রস্তুত ও প্রকাশ করা হবে। দেশি পর্যবেক্ষক নিবন্ধন ২২ শে অক্টোবরের মধ্যে চূড়ান্ত করা হবে এবং ১৫ই নভেম্বর নিবন্ধন সনদ প্রদান করা হবে। একই তারিখের মধ্যে বিদেশি পর্যবেক্ষক ও সাংবাদিক অনুমতি প্রদানের যাবতীয় কার্যক্রমও শেষ হবে। নির্বাচনী তথ্য প্রচারের জন্য ১৫ই নভেম্বরের মধ্যে তথ্য মন্ত্রণালয়, আইসিটি মন্ত্রণালয়, টিঅ্যান্ডটি, বিটিআরসি এবং মোবাইল অপারেটরদের সঙ্গে বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে।
আইনশৃঙ্খলা সংক্রান্ত ব্রিফিং:
আইনশৃঙ্খলা রক্ষা ও ভোটকেন্দ্র নিরাপত্তা বিষয়ক কার্যক্রমের জন্য স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, সশস্ত্র বাহিনী বিভাগ, আইজিপি, বিজিবি, র্যাব, কোস্টগার্ড, আনসার-ভিডিপি, ডিজিএফআই, এনএসআই এবং বিশেষ শাখার সঙ্গে কেন্দ্রীয় সমন্বয় সভা অনুষ্ঠিত হবে। প্রথম সভা ২৫ শে সেপ্টেম্বর অনুষ্ঠিত হবে এবং তফসিল ঘোষণার ১৫ দিন আগে দ্বিতীয় সভা অনুষ্ঠিত হবে। তফসিল ঘোষণার সার্বিক প্রস্তুতি, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি, ঋণ খেলাপি সংক্রান্ত তথ্য সংগ্রহ, ভোটকেন্দ্র থেকে ফলাফল প্রেরণ ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট নিয়োগের মতো কার্যক্রমের প্রস্তাবনা প্রস্তুত করতে ৩১শে অক্টোবর আন্তঃমন্ত্রণালয় সভা অনুষ্ঠিত হবে।
পোস্টাল ভোটিং ও ব্যালট:
ইসি’র পরিকল্পনায় বলা হয়, প্রকল্প অনুমোদন, সফটওয়্যার চূড়ান্ত, মোবাইল অ্যাপ ডেভেলপমেন্ট, নিবন্ধন ও প্র্যাক্টিসিং মডিউল, প্রচারের কাজ অক্টোবরের মধ্যে সম্পন্ন করা। প্রবাসে নভেম্বরে ব্যালট পেপার পাঠানো। কারাবন্দিদের ভোটের দুই সপ্তাহ আগে ব্যালট পাঠানোর পরিকল্পনা।
সমীকরণ প্রতিবেদন