বুধবার, ৩০ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
সর্বশেষ স্থানীয় সংবাদ জাতীয় রাজনীতি আর্ন্তজাতিক সারাদেশ অর্থনীতি খেলা বিনোদন আজকের পত্রিকা প্রযুক্তি চাকরি

শিক্ষার্থীদের আন্দোলনে উত্তপ্ত রাজপথ

  • আপলোড তারিখঃ ২৬-১১-২০২১ ইং
শিক্ষার্থীদের আন্দোলনে উত্তপ্ত রাজপথ
ছাত্র-ছাত্রীদের জন্য বাস ভাড়া হাফ করে প্রজ্ঞাপন জারি, ময়লার ট্রাকের চাকায় পিষ্ট ছাত্র নাঈম হত্যা এবং বাস-ট্রাক চাপায় সকল হত্যাকাণ্ডের বিচারসহ ৯ দফা দাবি নিয়ে রাজপথে নেমেছেন শিক্ষার্থীরা। রাজধানীর বিভিন্ন স্পটে অবরোধ, বিক্ষোভ, যানবাহন থামিয়ে লাইসেন্স তল্লাসীর কারণে পথে পথে থমকে দাঁড়িয়ে ছিল হাজার হাজার যানবাহন। ছাত্ররা ঘোষণা দিয়েছে দাবি না মানলে ২৭ নভেম্বর থেকে রাজপথে লাগাতার কর্মসূচি পালন করা হবে। অথচ এখন পর্যন্ত শিক্ষার্থীদের হাফ ভাড়া কার্যকরে রাজি হয়নি বাস মালিক সমিতি। বিআরটিএ’র সঙ্গে বাস মালিকদের বৈঠক সিদ্ধান্ত ছাড়াই শেষ হয়েছে। হাফ পাস ইস্যুর সিদ্ধান্ত নিতে বাস মালিকদের এক সাপ্তাহ সময়সীমা বেঁধে দেয়া হয়েছে। বাস মালিকরাও সরকারের কাছে প্রণোদনা চেয়েছে। চট্টগ্রামেও শিক্ষার্থীরা রাস্তা অবরোধ করে বিক্ষোভ করেছে। গতকাল রাজধানীর ফার্মগেট, গুলিস্তান, মিরপুর রোড, শান্তিনগর, মতিঝিলসহ কয়েকটি এলাকার সড়কের নিয়ন্ত্রণ ছিল কার্যক শিক্ষার্থীদের দখলে। ‘আমার ভাই মরলো কেন? সব সাথীদের খবর দে; শক্ত-কঠিন দূর্গ গড়ে, বেপরোয়াদের কবর দে’ সেøাগানসহ নানা সেøাগানে উত্তাল হয়ে উঠে ওইসব এলাকা। রাজধানীর গুলিস্তান, ফার্মগেটসহ বিভিন্ন পয়েন্টে তারা রাজপথ অবরোধ করে বিক্ষোভ করেন। ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের গেইট দীর্ঘ সময় অবরুদ্ধ করে রাখা হয়। বিক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীরা দাবি আদায়ের আল্টিমেটাম দিয়েছে। ফার্ম গেইটে দেখা যায় আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা যানবাহন থামিয়ে ড্রাইভারের লাইসেন্স ও গাড়ির ফিটনেস পরীক্ষা করছেন। এমনকি পুলিশের যানবাহন থামিয়ে গাড়ির ফিটনেস পরীক্ষা করা হয়। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বহন করা একাধিক যানবাহনে ফিটনেস না থাকায় তারা ওই সব যানবাহনে ‘ফিটনেস নেই’ সাইনবোর্ড ঝুলিয়ে দেয়। শিক্ষার্থীদের আন্দোলন ক্রমেই দানা বেঁধে উঠছে। আন্দোলনে গতকাল অবরুদ্ধ হয়ে পড়েছিল ঢাকা মহানগর। এ যেন ২০১৮ সালের চিত্র। ওই সময় ক্ষুদে শিক্ষার্থীরা ‘নিরাপদ সড়ক চাই’ দাবিতে আন্দোলন করে হুলুস্তুর ফেলে দিয়েছিল। দেশি-বিদেশি গণমাধ্যমের শিরোনাম হয়েছিল সেই শিক্ষার্থীদের আন্দোলন। সরকার দাবি মেনে নেয়ার প্রতিশ্রুতি দেয়ায় তখন তারা ঘরে ফিরে গিয়েছিল। আবার পুরনো ‘নিরাপদ সড়ক চাই’ সেই দাবি নিয়েই শিক্ষার্থীরা পথে নেমেছে। গত কয়েকদিনের আন্দোলনের গতি প্রকৃতি এবং বাস মালিকদের একগুয়েমি দেখে মনে হচ্ছে এবারের আন্দোলনও দীর্ঘমেয়াদি রূপ ধারণ করতে পারে। সিটি করপোরেশনের ময়লার গাড়ির চাপায় নটর ডেম কলেজের শিক্ষার্থী নাঈম হাসানের মৃত্যুর ঘটনায় দ্বিতীয় দিনের মতো রাজধানীতে বিক্ষোভ করে হাজার হাজার শিক্ষার্থী। ঢাকার বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সড়কে শিক্ষার্থীদের অবরোধের কারণে অনেক এলাকায় যানবাহন চলাচল বন্ধ রয়েছে; যানজটে কার্যত অচল হয়ে পড়েছে অন্যান্য এলাকাও। নটর ডেম কলেজের কয়েকশ শিক্ষার্থী সকালে মতিঝিল হয়ে গুলিস্তানে দুর্ঘটনাস্থলের কাছে অবস্থান নিলে সেখানে যানবাহন চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। সেখান থেকে শিক্ষার্থীরা পরে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের নগর ভবনের সামনে গিয়ে অবস্থান নেয়। সেখানে তারা সেøাগান দিতে থাকেন: ‘মেয়র তোমার দেখা চাই, নাঈম হত্যার বিচার চাই’। ঢাকা মহানগর পুলিশের (ট্রাফিক) নিয়ন্ত্রণ কক্ষ জানায়, ফার্মগেট, গুলিস্তান ও শান্তিনগরে শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভে রাস্তা বন্ধ হয়ে যায়। এছাড়া মিরপুর ১৩ নম্বর এলাকায় বিক্ষোভ করে পোশাক শ্রমিকরা। ফলে মতিঝিল, পল্টন, কাকরাইল, শান্তিনগর, মালিবাগ, ফার্মগেট, মিরপুর সড়ক, বিমানবন্দর সড়ক ব্যাপক যানজট দেখা দেয়। এমনকি যাত্রাবাড়িতে ছিল দিনভর যানজট এবং মেয়র মোহাম্মদ হানিফ ফ্লাইওভারে মাইলের পর মাইল যানবাহন দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায়। ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজের শিক্ষার্থীরা বেইলি রোডের মুখে শান্তিনগরের রাস্তা আটকে বিক্ষোভ করলে সেখানে কয়েক ঘণ্টা যানবাহন চলাচল বন্ধ থাকে। হলিক্রস, বিজ্ঞান কলেজ ও ঢাকা রেসিডেন্সিয়াল মডেল কলেজের শিক্ষার্থীরা ফার্মগেট এলাকায় সড়ক অবরোধ করলে সেখানে যানবাহন চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। সেখানে পুলিশ সদস্যদের বহনকারী একটি বাস তারা এক ঘণ্টা আটকে রাখেন চালক লাইসেন্স দেখাতে না পারার কারণে। মিরপুর রোডের স্যাইন্স ল্যাবরেটরি পয়েন্টে রাস্তা বন্ধ করে শিক্ষার্থীরা বিক্ষোভ করে। রাজধানীর বিভিন্ন পয়েন্টে শিক্ষার্থীরা যখন বিক্ষোভ করে তখন খবর আসে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের ময়লার গাড়ির চাকায় পিষ্ট হয়ে পান্থপথ রোডের বসুন্ধরার মার্কেট সামনে আহসান কবীর নামের এক গার্মেন্টস এক্সেসরিজ ব্যবসায়ী নিহত হয়েছেন। ছাত্রদের ৯ দফা দাবি: দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত সকল শিক্ষার্থী হত্যার বিচারসহ ৯ দফা দাবি জানিয়েছেন আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা। এসব দাবি না মানা হলে আগামী শনিবার থেকে আবারও অবস্থান কর্মসূচি ঘোষণা করেছেন তারা। গতকাল রাজধানীর ফার্মগেট এলাকায় নিরাপদ সড়কের দাবিতে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা এই ঘোষণা দেন। শিক্ষার্থীদের ৯ দফা দাবি হচ্ছে- নটর ডেম কলেজের শিক্ষার্থী নাঈমসহ সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত সব শিক্ষার্থীর পরিবারকে এক জীবনের ক্ষতিপূরণ দিতে হবে। সড়ক দুর্ঘটনায় আহত সব যাত্রী ও পরিবহন শ্রমিকদের যথাযথ ক্ষতিপূরণ ও পুনর্বাসন নিশ্চিত করতে হবে। ঢাকাসহ সারাদেশে সড়ক, নৌ ও রেলপথে শিক্ষার্থীদের হাফ পাস নিশ্চিত করে প্রজ্ঞাপন জারি করতে হবে। বৈধ-অবৈধ যানবাহন চালকদের প্রশিক্ষণের মাধ্যমে বৈধতার আওতায় আনতে হবে। বিআরটিএ’র সকল কার্যক্রম নজরদারি ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। ঢাকাসহ সারাদেশে ডিজিটাল বাংলাদেশের প্রত্যয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা অবিলম্বে স্বয়ংক্রিয় আধুনিকায়ন এবং পরিকল্পিত নগরায়ন সুনিশ্চিত করতে হবে। গণপরিবহনে নারীর প্রতি যৌন হয়রানি ও সহিংসতা বন্ধ করে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে এবং পরিকল্পিত বাস স্টপেজ ও পার্কিং স্পেস নির্মাণ এবং এর যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা জানান, ২৭ নভেম্বর সকাল ১১টা থেকে আবারও তারা সড়কে অবস্থান নেবেন এবং দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলন চালিয়ে যাবেন। হাফ পাসে রাজি নন বাস মালিকরা: বাসে শিক্ষার্থীদের জন্য হাফ পাস চালুর বিষয়ে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ) ও অংশীজনদের মধ্যে বৈঠক হয়েছে। বৈঠকে কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি। আপাতত মালিকরা হাফ পাসে রাজি নন। বৈঠকে বাস মালিকদের পক্ষ থেকে জানানো হয়, বেসরকারি বাসে সরকার ভর্তুকি দিচ্ছে না। যানজটে সড়কে ট্রিপ কমে গেছে। টায়ারসহ বিভিন্ন যন্ত্রাংশের দাম বেড়ে গেছে। এ অবস্থায় ঢাকাসহ বিভিন্ন মহানগরে শিক্ষার্থীদের জন্য হাফ পাস চালু করা হলে বাসমালিকদের লোকসান গুনতে হবে। এই পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির নেতারা নিজেদের মধ্যে আলাপ আলোচনা করে বাসে হাফ পাসের বিষয়ে তাদের একটি প্রস্তাব সরকারের কাছে তুলে ধরবে। বৈঠক শেষে গণমাধ্যমকর্মীদের এ তথ্য জানান সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ের সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের সচিব মো. নজরুল ইসলাম। তিনি বলেন, আমরা পরিবহন মালিক সমিতিকে নিজেদের মধ্যে আলাপ-আলোচনা করে একটি যুক্তিসঙ্গত প্রস্তাব দেয়ার জন্য বলেছি। তারা দ্রুত সময়ের মধ্যে এ প্রস্তাব আমাদের কাছে দেবেন। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের প্রতিনিধিকে বলা হয়েছে, তারাও তাদের একটি প্রস্তাব আমাদের কাছে দেবেন। সব পক্ষ দ্রুত প্রস্তাব জমা দেবে। সভায় সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের সচিবের সভাপতিত্বে জননিরাপত্তা বিভাগের সিনিয়র সচিব, মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের সচিব, কারিগরি ও মাদরাসা বিভাগের সচিব, আইজিপি, পরিবহন মালিক সমিতির প্রতিনিধি, শ্রমিক ফেডারেশনের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন। চট্টগ্রামে শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ: গণপরিবহনে অর্ধেক ভাড়ার দাবিতে রাজধানী ঢাকা ছাড়াও বিভিন্ন বিভাগীয় শহরে শিক্ষার্থীরা বিক্ষোভ করেছে। বন্দরনগরী চট্টগ্রামে শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভে পুলিশ লাঠিচার্জ করেছে। এতে অন্তত ১০ জন আহত হয়েছে বলে শিক্ষার্থীরা দাবি করেছেন। নগরীর ষোলশহর ২ নম্বর গেট মোড়ে অবস্থান নিয়ে প্রায় শতাধিক শিক্ষার্থী বিক্ষোভ করে। এ সময় তাদের সঙ্গে যোগ দেন সমাজতান্ত্রিক ছাত্রফ্রন্ট, ছাত্র ফেডারেশন, গণতান্ত্রিক ছাত্র পরিষদসহ বিভিন্ন বামপন্থী ছাত্র সংগঠনের কর্মীরা। তারা সে সময় রাস্তা অবরোধ করার চেষ্টা করলে, পুলিশ লাঠিচার্জ করে তাদের সেখান থেকে সরিয়ে দেয় এবং ৪ জনকে আটক করে। তারা হলেন-চট্টগ্রাম মহানগর ছাত্র ফেডারেশনের যুগ্ম-আহ্বায়ক সাইফুর রুদ্র, সমাজতান্ত্রিক ছাত্রফ্রন্ট চট্টগ্রাম মহানগর শাখার সাংগঠনিক সম্পাদক মিরাজ উদ্দিন, পটিয়া সরকারি কলেজের ছাত্র জাহেদুল রাফি ও জামশেদুল হক। তবে পুলিশের লাঠিচার্জে অন্তত ১০ জন শিক্ষার্থী আহত হয়েছে বলে সমাজতান্ত্রিক ছাত্র ফ্রন্টের চট্টগ্রাম মহানগর শাখার সভাপতি রায়হান উদ্দিন দাবি করেন। পরে দুপুর ৩টার দিকে শিক্ষার্থীরা নিউমার্কেট মোড়ে সমাবেশের চেষ্টা করলেও, সেখানেও পুলিশ তাদের ছত্রভঙ্গ করে দেয়। নিউমার্কেট মোড়ে পুলিশের হামলায় অন্তত ৫ নেতাকর্মী আহত হয়েছেন বলে দাবি করেন শিক্ষার্থীরা। ফিরে দেখা: ২০১৮ সালের ২৯ জুলাই রাজধানীর বিমানবন্দর সড়কে জাবালে নূর পরিবহনের দুটি বাসের রেষারেষিতে শহীদ রমিজ উদ্দিন ক্যান্টনমেন্ট কলেজের ২ শিক্ষার্থী নিহত হন। তাদের সহপাঠীরা বিচার ও নিরাপদ সড়কের দাবিতে রাস্তায় নামেন। এরপর, অন্যান্য স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীরা তাদের সঙ্গে যোগ দিলে সেই আন্দোলন দেশের বিভিন্নস্থানে ছড়িয়ে পড়ে। শিক্ষার্থীদের তীব্র আন্দোলনে সরকার নিরাপদ সড়ক দাবি মেনে নেয়। অতপর ২০১৮ সালের ২০ সেপ্টেম্বর শিক্ষার্থীদের দাবির মুখে কঠোর শাস্তির বিধানসংবলিত একটি আইন সংসদে পাস হয়। অতপর ২০১৯ সালের মার্চ মাসে রাজধানীর বসুন্ধরা আবাসিক এলাকার কাছে নর্দ্দায় বাসচাপায় বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব প্রফেশনালস (বিইউপি)-এর শিক্ষার্থী আবরার আহমেদ চৌধুরী নিহত হন। সেসময় সারাদেশে ক্লাস ছেড়ে রাজপথে নেমে শিক্ষার্থীরা ধর্মঘটের ডাক দিয়েছিলেন। রাজপথে নিরাপদ সড়কের দাবিতে শিক্ষার্থীরা আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়েন। অথচ নিরাপদ সড়কের আইন তিন বছর আগে প্রণয়ন করা হলেও এখনো সেই আইনটি এখনো পুরোপুরি কার্যকর হয়নি।


কমেন্ট বক্স
notebook

সীমান্তে চুয়াডাঙ্গা-৬ বিজিবির পৃথক অভিযানে ১৬ লক্ষাধিক টাকার মালামাল জব্দ