আটকে আছে সড়ক পরিবহন আইন
- আপলোড তারিখঃ
২৭-০৮-২০১৯
ইং
সংসদে পাস হওয়ার ১১ মাসেও বিধিমালা তৈরি হয়নি
সমীকরণ প্রতিবেদন:
জাতীয় সংসদে পাস হওয়া ‘সড়ক পরিবহন আইন-২০১৮’ বাস্তবায়ন না করে মালিক ও শ্রমিকদের স্বার্থ রক্ষায় কাজ করছে সরকার। আইন পাসের ১১ মাস অতিক্রম হলেও এখনো আইন বাস্তবায়নে বিধিমালা তৈরি করতে পারেনি সড়ক ও মহাসড়ক বিভাগ। পরিবহন মালিক ও শ্রমিকদের দাবির প্রেক্ষিতে গত ফেব্রুয়ারি মাসে আইন বিশ্লেষণ করে তা বাস্তয়নের সুপারিশের জন্য স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খাঁনকে প্রধান করে তিন সদস্যের একটি উচ্চপর্যায় কমিটি গঠন করা হয়। অন্য সদস্যরা হলেন আইন ও রেলমন্ত্রী। কিন্তু ৬ মাস অতিক্রম হলেও এখন পর্যন্ত কোন প্রতিবেদন জমা দেয়নি ওই কমিটি। তাই এখন আইন বাস্তবায়ন না করে পরিবহন মালিক ও শ্রমিকদের সুপারিশ বাস্তবায়নের দিকে নজর দিচ্ছে সরকার। এর ফলে বিশৃঙ্খল সড়ক ও পরিবহন সেক্টরকে শৃঙ্খলা ফিরানোর কাজ আরও দীর্ঘায়িত করে তুলবে। অনেকের অভিমত আইনটি বাস্তবায়নে বাধার সৃষ্টি করতে ১১১টি সুপারিশ করা হয়েছে। যা একটি দীর্ঘ প্রক্রিয়া। বর্তমান সরকার তৃতীয়বার ক্ষমতার আসার পরও গণপরিবহন ব্যবস্থায় শৃঙ্খলা ফেরাতে ব্যর্থ হলে এর দায় সরকারকেই নিতে হবে। পরিবহন মালিক ও শ্রমিকদের কাছে সরকারের অসহায়ত্ব প্রকাশ পাবে। বিদ্যুৎ সমস্যা সমাধানে যেভাবে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কঠোরভাবে হস্তক্ষেপ করেছিলেন। তেমনি সড়ক ও পরিবহন খাতে প্রধানমন্ত্রী সরাসরি হস্তক্ষেপ ছাড়া বিশৃঙ্খল সেক্টরকে শৃঙ্খলা আনা সম্ভব নয় বলে জানান পরিবহন বিশেষজ্ঞরা।
এ বিষয়ে বুয়েটের পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক ও পরিবহন বিশেষজ্ঞ ড. শামছুল হক সংবাদকে বলেন, সড়ক নিরাপত্তার ক্ষেত্রে সুপারিশে কোন কাজ হয় না। একই সুপারিশ বারবার ঘুরে ফিরে আসে। বাস্তবায়ন হয় না। সুপারিশের ভারে সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো কুঁজো হয়ে যাচ্ছে। কিন্তু কাজের কাজ কিছুই হয় না। সড়ক নিরাপত্তার জন্য এ পর্যন্ত যতগুলো সুপারিশ করা হয়েছে। এর কিছু অংশ বাস্তবায়ন করা হলেও কিছুটা সুবিধা পাওয়া যেত। এক্ষেত্রে সড়ক ও মহাসড়ক বিভাগ থেকেও একাধিক সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে তাও বাস্তবায়ন হয়নি। যেমন ২২টি মহাসড়কে সিএনজিচালিত অটোরিকশা নিষিদ্ধ করা হয়েছে। তা কতটুকু বাস্তবায়ন হচ্ছে। এছাড়া প্রধানমন্ত্রীর দফতর থেকে নির্দেশনা দেয়া হয়েছে ৫ ঘণ্টার বেশি কোন চালক গাড়ি চালাবে না। তা কতকুটু কার্যকর হচ্ছে? সড়ক আইন বাস্তবায়নে অনিহা ও আইন না মেনে বিশৃঙ্খলা তৈরি করা যায় এইসব কারণে শৃঙ্খলা ফেরানো যাচ্ছে না। দুর্ঘটনাও কমানো যাচ্ছে না। তাই এখন সুপারিশের থেকে গুরুত্বপূর্ণ হলো বাস্তবায়ন। বর্তমান সরকার একধারে তিনবার ক্ষমতায় আছে এখন একটি পর্যালোচনা করা দরকার। সড়কে শৃঙ্খলা ফেরানোর জন্য প্রথমবার কাকে দায়িত্ব দেয়া হয়েছিল, দ্বিতীয়বার কে দায়িত্ব পালন করেছে। এখন তৃতীয়বার অ্যাকশনে যাওয়ার কথা। কিন্তু এখনো যদি দীর্ঘমেয়াদি সুপারিশ গ্রহণ করা হয় তাহলে তা বাস্তবায়ন হবে কবে? এর আগেও একাধিক সুপারিশ গ্রহণ হয়ে কিন্তু কার্যকর হয়নি। এর আগে ‘মোটর ভেহিকল অডিয়েন্স-১৯৮৩’ একাধিক বিধিমালা ছিল তা সঠিকভাবে বাস্তবায়ন হয়নি। তাই সড়কে শৃঙ্খলা ফেরানোর জন্য আইন বাস্তবায়ন আগ্রহী না। তাহলে ১০টি আইন করে শৃঙ্খলা ফেরানো যাবে না। তাই এ ক্ষেত্রে সরকারপ্রধানের সরাসরি হস্তক্ষেপ ছাড়া পরিবহন সেক্টরের বড় বড় মাফিয়াদের নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়।
জানা গেছে, গত বছর ১৯ সেপ্টেম্বর জাতীয় সংসদে পাস হয় ‘সড়ক পরিবহন আইন-২০১৮’। কিন্তু ১১ মাস সময় অতিক্রম হলেও আইন বাস্তবায়নের বিধিমালা এখনো তৈরি করা হয়নি। আইন বাস্তবায়নে সড়ক পরিবহন মালিক ও শ্রমিক সংগঠনের পক্ষ থেকে চাপ থাকার কারণে বিধিমালা এখনো তৈরি করা হচ্ছে না বলে সংশ্লিষ্টরা জানান। এছাড়া নতুন সড়ক পরিবহন আইনের বিভিন্ন ধারার বিরোধিতা করে আসছেন পরিবহন মালিক-শ্রমিকরা। তারা আইনের বিভিন্ন ধারা বাতিলের দাবিতে আন্দোলনেও নামেন। মালিক-শ্রমিকদের দাবির মধ্যে রয়েছে সড়ক পরিবহন আইনের সব ধারা জামিনযোগ্য করা, সড়ক দুর্ঘটনায় শ্রমিকের অর্থদন্ড পাঁচ লাখ টাকার বিধান বাতিল করা, ড্রাইভিং লাইসেন্স পাওয়ার শিক্ষাগত যোগ্যতা পঞ্চম শ্রেণী করা ইত্যাদি।
এ বিষয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খাঁন কামাল সচিবালয়ে এক বৈঠকে সাংবাদিকদের বলেন, সড়ক পরিবহন আইন বাস্তবায়নে আইনমন্ত্রী, আমি ও রেলমন্ত্রীকে নিয়ে তিন সদস্যবিশিষ্ট একটি কমিটি করা হয়েছিল। আমরা বসেছিলাম। আইনটির যেসব বিষয়ে তারা (পরিবহন মালিক-শ্রমিক) আপত্তির কথা বলেছেন সবগুলো ধারা আমরা দেখেছি। আমাদের মনে হলো আমরা এটাকে আরেকটু ভালো করে দেখে স্টেকহোল্ডারদের সঙ্গে শীঘ্রই বসে আমাদের মতামত প্রকাশ করব। (দাবিগুলো) আমরা চুলচেরা বিশ্লেষণ করেছি, সবগুলো পয়েন্টই আলাপ করেছি। আলোচনার জন্য আমরা আরেকটা দিন ধার্য করেছি, সেদিন স্টেকহোল্ডাররা (পরিবহন মালিক-শ্রমিক) থাকবেন। তাদের কথা শুনে আমাদের মতামতটাও বলব। আইনে যদি কোন কিছু যোগ-বিয়োগ করতে হয় সেটা আমরা দেখছি। সেজন্য আইনমন্ত্রী মহোদয় আছেন মতামত দেবেন। আমরা তাদের দাবিগুলো পরীক্ষা-নিরীক্ষা করছি, দাবিগুলোর যৌক্তিকতা আছে কিনা সেগুলো দেখছি। আইন হয়ে যাওয়ার পর এভাবে বসার কোন সুযোগ আছে কিনা? এ বিষয়ে সাংবাদিকরা জানতে চাইলে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, আইন আইনের গতিতে চলছে। এটা গেজেট হয়ে যেখানে চলে যাওয়ার চলে যাচ্ছে। আইন বাস্তবায়নে কোন বাধা নেই। আমরা দেখছি, তারা যে আপত্তি করেছে সেটার কোন যৌক্তিকতা আছে কিনা।
এ বিষয়ে আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়কমন্ত্রী আনিসুল হক সংবাদিকদের বলেন, আইনটি খতিয়ে দেখার জন্য স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর নেতৃত্বে একটি কমিটি করা হয়েছিল। বৈঠকে আমরা আইনটি পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে দেখেছি। দেখার পর আমরা সিদ্ধান্ত নিয়েছি এখন স্টেকহোল্ডারদের সঙ্গে কথাবার্তা বলব। স্টেকহোল্ডারদের সঙ্গে কথাবার্তা বলে যে সিদ্ধান্ত নিয়েছি তা প্রকাশ করব। বিধি প্রণয়নের কাজ অলরেডি শুরু হয়ে গেছে। আমরা যে প্রস্তাবগুলো করতে চাই। তাদের সঙ্গে আলাপ-আলোচনা করে একটা ঐকমত্যে এসে তারপর ঘোষণা দিতে চাই। এ বিষয়ে সড়ক ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বলেন, আইনের বিধিমালা প্রণয়নের জন্য স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও আইনমন্ত্রী বসে আলোচনা করেছেন। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বিদেশ থেকে ফিরলে বিষয়টি আলোচনা করে দ্রুত সিদ্ধান্ত নেয়া হবে। আইন ঠিক রেখে কোন অ্যাডজাস্টমেন্ট করা যায় কিনা- সে বিষয়ে দেখা হচ্ছে।
কমেন্ট বক্স