চুয়াডাঙ্গার দর্শনা সীমান্তে কোনোভাবেই থামছে না স্বর্ণ ও মাদক পাচার। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তৎপরতা বাড়লেও কৌশল পাল্টে সক্রিয় রয়েছে চোরাচালান সিন্ডিকেট। অভিযোগের কেন্দ্রে থাকা সামাদ (৩৫) নামে এক ব্যক্তির সম্পৃক্ততার নানা তথ্য মিললেও তিনি এখনও ধরাছোঁয়ার বাইরে।
অনুসন্ধানে জানা যায়, পারকৃষ্ণপুর-মদনা ইউনিয়নের কামারপাড়া গ্রামের কিতাব আলীর ছেলে সামাদ দীর্ঘদিন ধরে সীমান্তপথে স্বর্ণ পাচার ও হুন্ডি ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ করে আসছেন। তার নেতৃত্বাধীন চক্রের বিরুদ্ধে ভারত থেকে ফেনসিডিল, ইয়াবা ও হেরোইনসহ বিভিন্ন মাদক দেশে আনার অভিযোগ রয়েছে।
প্রতিবেদকের হাতে আসা একাধিক অডিও ও ভিডিও রেকর্ডিংয়ে দেখা যায়, সামাদ নিজেই স্বর্ণ পাচারে সম্পৃক্ততার কথা উল্লেখ করেছেন। কিছু রেকর্ডিংয়ে তাকে সীমান্ত দিয়ে অবৈধ যাতায়াত, সিন্ডিকেট পরিচালনা এবং আটক হওয়া কয়েকটি স্বর্ণের চালান নিজের বলে দাবি করতে শোনা যায়। অন্য একটি রেকর্ডিংয়ে তার কাছে অস্ত্র থাকার কথাও উঠে এসেছে।
এছাড়া একটি ভিডিওতে রাতের অন্ধকারে সীমান্তের কাটাতারের ওপারে গিয়ে ধারণ করা দৃশ্য পাওয়া গেছে। সেখানে তার কণ্ঠে ভারতীয় সীমান্ত এলাকার দৃশ্য দেখানোর কথাও শোনা যায়। আরেক ভিডিওতে তাকে একটি ধারালো দেশীয় অস্ত্র প্রদর্শন করতে দেখা গেছে, যা চক্রটির সহিংস সক্ষমতার ইঙ্গিত দেয়।
এদিকে, সাম্প্রতিক সময়ে দর্শনা সীমান্তে একাধিক অভিযানে স্বর্ণসহ কয়েকজন পাচারকারী আটক হলেও মূল হোতা হিসেবে অভিযুক্ত সামাদ অধরাই রয়ে গেছেন। ২০২৫ সালের ২৯ সেপ্টেম্বর কামারপাড়া সীমান্তে ৩টি স্বর্ণের বারসহ এক নারী আটক হন। চলতি বছরের ১১ এপ্রিল হৈবতপুর এলাকায় ৪টি বারসহ এক ব্যক্তি গ্রেপ্তার হন। গত ১৩ এপ্রিল দর্শনা পুরাতন রেলস্টেশন এলাকা থেকে ১০টি স্বর্ণের বারসহ আরেকজন আটক হন। এসব চালান নিজের বলে অডিও-ভিডিও বার্তায় দাবি করেছেন সামাদ, যা তদন্তে গুরুত্বপূর্ণ সূত্র হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।
স্থানীয় সূত্র বলছে, দর্শনা সীমান্ত এখন স্বর্ণ পাচারের একটি গুরুত্বপূর্ণ রুটে পরিণত হয়েছে। এখানে বাংলাদেশ থেকে স্বর্ণ ভারতে পাচার করা হয়, আর বিপরীতে দেশে প্রবেশ করে মাদক। প্রতি চালানে মোটা অঙ্কের কমিশন পাচ্ছে সিন্ডিকেট সদস্যরা। নগদ লেনদেন এড়িয়ে মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে অর্থ আদান-প্রদানের কারণে তাদের শনাক্ত করা আরও কঠিন হয়ে পড়ছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক স্থানীয়দের অভিযোগ, কামারপাড়া এলাকায় রাত হলেই অপরিচিত লোকজনের আনাগোনা বাড়ে। মাদকের বিস্তারে কিশোর-যুবসমাজ ঝুঁকির মুখে পড়ছে, পাশাপাশি সামাজিক অস্থিরতাও বাড়ছে। তবে ভয়ের কারণে অনেকেই মুখ খুলতে চান না।
গতকাল বুধবার চুয়াডাঙ্গায় মাদকদ্রব্য ধ্বংস কার্যক্রম চলাকালে ৬ বিজিবি ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল মো. নাজমুল হাসান জানান, সীমান্তে নিয়মিত অভিযানে বিপুল পরিমাণ মাদক ও স্বর্ণ জব্দ করা হচ্ছে। গতকাল ৩ কোটি ১৮ লাখ টাকার মাদক ধ্বংস করা হয়েছে। গত এক বছরে ৩৪ কোটির বেশি টাকার চোরাচালান পণ্য জব্দের তথ্যও দিয়েছে বিজিবি। এছাড়া ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে চলতি বছরের এপ্রিল পর্যন্ত প্রায় ১৮ কোটি ৯১ লাখ টাকার স্বর্ণ এবং ৯ কোটি ৭০ লাখ টাকার মাদক উদ্ধার করা হয়েছে।
বিজিবি কর্মকর্তারা জানান, চোরাকারবারিরা প্রতিনিয়ত কৌশল পরিবর্তন করছে। তবে গোয়েন্দা নজরদারি জোরদার করে অভিযান অব্যাহত রাখা হয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, শুধু বাহক বা বাহক পর্যায়ের সদস্যদের গ্রেপ্তার করে এই চোরাচালান বন্ধ করা সম্ভব নয়। মূল হোতাদের আইনের আওতায় আনতে না পারলে সিন্ডিকেট ভাঙা কঠিন হবে। সামাদকে গ্রেপ্তার করে জিজ্ঞাসাবাদ করা গেলে পুরো নেটওয়ার্ক সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া যেতে পারে।
স্থানীয় সচেতন মহলের দাবি, দর্শনা সীমান্তে স্বর্ণ ও মাদক পাচার এখন অর্থনৈতিক, সামাজিক ও নিরাপত্তাজনিত বড় হুমকিতে পরিণত হয়েছে। তাই দ্রুত মূল হোতাসহ জড়িতদের আইনের আওতায় আনার পাশাপাশি নজরদারি আরও জোরদার করার দাবি জানিয়েছেন তারা।
এ বিষয়ে জানতে অভিযুক্ত সামাদের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি। তবে বাড়াদি বিজিবি ক্যাম্প কমান্ডার বলেন, সামাদ কামারপাড়া গ্রামের বাসিন্দা হিসেবে পরিচিত হলেও তার চোরাচালানের সঙ্গে সম্পৃক্ততার বিষয়ে নিশ্চিত কোনো তথ্য তাদের কাছে নেই।
দর্শনা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. হিমেল রানা বলেন, ‘সামাদের সম্পৃক্ততার বিষয়ে অডিও ও ভিডিওসহ কিছু তথ্য আমাদের হাতে এসেছে। বিষয়টি তদন্তাধীন রয়েছে। তদন্ত শেষে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
নিজস্ব প্রতিবেদক