রবীন্দ্র মহাপ্রয়াণ দিবস আজ
- আপলোড তারিখঃ
০৬-০৮-২০১৯
ইং
সমীকরণ প্রতিবেদন:
আজ বাইশে শ্রাবণ, কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ৭৮তম মহাপ্রয়াণ দিবস। ১৩৪৮ বঙ্গাব্দের ২২ শ্রাবণ তিনি কলকাতায় পৈতৃক বাসভবনে মৃত্যুবরণ করেন। কলকাতার জোড়াসাঁকোর বিখ্যাত ঠাকুর পরিবারের দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর ও সারদাসুন্দরী দেবীর চতুর্দশ সন্তান রবীন্দ্রনাথ বাংলা সাহিত্যের আকাশে রবি হয়েই উদিত হয়েছিলেন। জন্ম ১২৬৮ বঙ্গাব্দের পঁচিশে বৈশাখ। রবীন্দ্রনাথ কবি, উপন্যাসিক, নাট্যকার, সঙ্গীতজ্ঞ, প্রাবন্ধিক, দার্শনিক, ভাষাবিদ, চিত্রশিল্পী, গল্পকার- সবগুলো শৈল্পিক গুণের সমন্বিত এক বিস্ময়কর প্রতিভা। আট বছর বয়সে তিনি কবিতা লেখা শুরু করেন। বিশ্বের বিভিন্ন ভাষায় তার সাহিত্যকর্ম অনূদিত হয়েছে। বিভিন্ন দেশের পাঠ্যসূচিতে তার লেখা সংযোজিত হয়েছে। প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘কবিকাহিনী’ প্রকাশিত হয় ১৮৭৮ সালে। ১৯১০ সালে প্রকাশিত হয় তার ‘গীতাঞ্জলি’ কাব্যগ্রন্থ। এই কাব্যগ্রন্থের ইংরেজি অনুবাদের জন্য তিনি ১৯১৩ সালে সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার লাভ করেন। ১৯০১ সালে পশ্চিমবঙ্গের শান্তিনিকেতনে ব্রহ্মচর্যাশ্রম প্রতিষ্ঠা করে তিনি সেখানেই বসবাস করেন। ১৯২১ সালে গ্রাম্যোন্নয়নের জন্য ‘শ্রীনিকেতন’ নামে একটি সংস্থা প্রতিষ্ঠা করেন। ১৯২৩ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে 'বিশ্বভারতী' প্রতিষ্ঠিত হয়। ১৮৯১ সাল থেকে পিতার আদেশে কবি কুষ্টিয়ার শিলাইদহে, পাবনা, নাটোরে জমিদারি তদারকিতে ছিলেন, যা বাংলাদেশের এক আলোকোজ্জ্বল অধ্যায়। শিলাইদহে তিনি দীর্ঘদিন অতিবাহিত করেন। এখানে জমিদারবাড়িতে তিনি অসংখ্য কবিতা ও গান রচনা করেন। ১৯০১ সালে শিলাইদহ থেকে সপরিবারে কবি বোলপুরে শান্তিনিকেতনে চলে যান।
বাংলাদেশ ও ভারতের জাতীয় সংগীত নেয়া হয়েছে এই প্রতিভাধর কবির রচনা থেকেই। তার লেখা ও সুর করা আড়াই হাজারের বেশি গান বাংলা সাহিত্যের অতুলনীয় সম্পদ। রবীন্দ্রনাথ বোলপুরের শান্তিনিকেতনে বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে শিক্ষাব্যবস্থায় নতুন ধারা প্রবর্তন করেন। কৃষির উন্নতির জন্য তার প্রতিষ্ঠিত শ্রীনিকেতনও এক যুগান্তকারী প্রতিষ্ঠান। কবির ওপর প্রকাশিত বিভিন্ন গ্রন্থ থেকে জানা যায়, রবীন্দ্রনাথ মূলত কবি। তার মৌলিক কাব্যগ্রন্থ ২৫টি। তবে বাঙালি সমাজে তার জনপ্রিয়তা সংগীতেও রয়েছে। তিনি অসংখ্য গান রচনা ও সুরারোপ করেন। তার সমগ্র গান ‘গীতবিতান’ গ্রন্থে রয়েছে। কবির লেখা ‘আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালোবাসি’ গানটি বাংলাদেশের জাতীয় সংগীত। ভারতের জাতীয় সংগীতটিও কবির লেখা। জীবিতকালে তার প্রকাশিত মৌলিক কবিতাগ্রন্থ হচ্ছে ৫২টি, উপন্যাস ১৩, ছোটগল্পের বই ৯৫টি, প্রবন্ধ ও গদ্যগ্রন্থ ৩৬টি, নাটকের বই ৩৮টি। কবির মৃত্যুর পর ৩৬ খন্ডে ‘রবীন্দ্র রচনাবলি’ প্রকাশ পায়। এ ছাড়া ১৯ খন্ডের রয়েছে ‘রবীন্দ্র চিঠিপত্র।’ ১৯২৮ থেকে ১৯৩৯ পর্যন্ত কবির আঁকা চিত্রকর্মের সংখ্যা আড়াই হাজারেরও বেশি। এর মধ্যে ১৫৭৪টি চিত্রকর্ম শান্তিনিকেতনের রবীন্দ্রভবনে সংরক্ষিত আছে। কবির প্রথম চিত্র প্রদর্শনী হয় দক্ষিণ ফ্রান্সের শিল্পীদের উদ্যোগে ১৯২৬ সালে প্যারিসের পিগাল আর্ট গ্যালারিতে।
রবীন্দ্রনাথের কবিতা ও গানের বাণীসহ সৃষ্টিকর্মের মূল সুর হচ্ছে ভাবগভীরতা, গীতিধর্মিতা, চিত্ররূপময়তা, আত্মচেতনা, ঐতিহ্যপ্রীতি, প্রকৃতিপ্রেম, মানবপ্রেম, স্বদেশপ্রেম, রোমান্টিকতা ও সৌন্দর্য চেতনা। রয়েছে ভাব, ভাষা, ছন্দ ও আঙ্গিকের বৈচিত্র্য, বাস্তবচেতনা ও প্রগতিচেতনা। তার গদ্যভাষাও কাব্যিক। তার রচনাসমগ্রে রয়েছে, বাঙালির জীবনবোধ ও ঐতিহ্য সাধনার কালপ্রবাহ। ভারতীয় উপমহাদেশের ধ্রম্নপদি ও লৌকিক সংস্কৃতি এবং পাশ্চাত্য বিজ্ঞানচেতনা ও শিল্পদর্শন তার রচনায় গভীর প্রভাব বিস্তার করেছে। কথাসাহিত্য ও প্রবন্ধগুলোতে রয়েছে সমাজ, রাজনীতি, রাষ্ট্রনীতি সম্পর্কে নিজস্ব মতামত ও মানুষের আকাক্সক্ষার প্রতিফলন। প্রগতিশীল, শিক্ষিত দেশ ও জাতি এবং বিশ্ব গঠনের বাণীও অধিকাংশ কর্মে পরিস্ফুট হয়েছে। ইত্যকার কারণে কবির জন্মের পর দেড় শতাধিক বছর অতিক্রান্ত হলেও তার সৃষ্টিকর্ম দেশ-বিদেশে আজও সমাদৃত রয়েছে বলে রবীন্দ্র গবেষকরা বিভিন্ন পুস্তকে মতামত রেখেছেন। বাইশে শ্রাবণ তার পার্থিব জীবনের সমাপ্তি ঘটলেও বাংলা সাহিত্যে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর শ্রেষ্ঠ আসন অধিকার করে আছেন চিরদিনের জন্য। বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ৭৮তম মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে সরকারি ও বেসরকারিভাবে রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও সংগঠন নানা কর্মসূচি নিয়েছে।
কমেন্ট বক্স