পুলিশ কনস্টেবল নিয়োগে দর উঠেছে ১৪ লাখ
- আপলোড তারিখঃ
২৪-০৬-২০১৯
ইং
সমীকরণ প্রতিবেদন:
পুলিশ কনস্টেবল নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের পর দুর্নীতিবাজ কতিপয় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যসহ প্রতারকরা ঘুষ বাণিজ্য মিশনে নেমেছে। এ বছর পুলিশ কনস্টেবল নিয়োগে ১০ লাখ থেকে ১৪ লাখ টাকা পর্যন্ত বাজার দর উঠেছে। সরকারি এই চাকরি দেয়ার নামে প্রতারক ও জালিয়াতচক্র সারাদেশেই প্রতারণার জাল ছড়িয়ে দিয়েছে। যদিও বাংলাদেশ পুলিশের পক্ষ থেকে ঘুষ ছাড়া পুলিশে নিয়োগে ব্যাপক প্রচার-প্রচারণা চালানো হচ্ছে। পুলিশ, সাংবাদিকসহ সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন পেশার দুর্নীতিবাজ প্রতারকরা ব্যাপকভাগে তৎপরতা শুরু করেছে। আর এই প্রতারণা ও দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত থাকায় ইতোমধ্যে বেশ কয়েকজন পুলিশ সদস্য আটকও হয়েছেন। এ বছর বাংলাদেশ পুলিশে ট্রেইনি রিক্রুট কনস্টেবল বা টিআরসি পদে নিয়োগের লক্ষে ৬ হাজার ৮০০ জন পুরুষ এবং ২ হাজার ৮৮০ জন নারী সর্বমোট ৯ হাজার ৬৮০ জন প্রার্থীকে বাছাই করা হবে। আগ্রহী প্রার্থীদের শারীরিক মাপ ও শারীরিক পরীক্ষাসহ লিখিত পরীক্ষায় অংশগ্রহণের জন্য বিজ্ঞপ্তিতে বর্ণিত তারিখ ও সময়ে তাদের নিজ জেলাস্থ পুলিশ লাইন্সে প্রয়োজনীয় কাগজপত্রসহ আগামী ১ জুলাই থেকে নির্ধারিত দিন ও সময়ে উপস্থিত থাকার জন্য আহ্বান করা হয়েছে।
অপরদিকে বাংলাদেশ পুলিশ হেড কোয়ার্টার্সের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, পুলিশ কনস্টেবল পদে নিয়োগের ক্ষেত্রে কোনো প্রকার আর্থিক লেনদেন বা অবৈধ পন্থা অবলম্বন করলে নিয়োগ বাতিলসহ আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। এদিকে টাঙ্গাইল জেলায় কনস্টেবল পদে চাকরি দেয়ার কথা বলে ১০ লাখ টাকা লেনদেনের সময় হাতেনাতে পুলিশের এক উপ-পরিদর্শকসহ (এসআই) দুজনকে আটক করেছে জেলা গোয়েন্দা পুলিশ। গত শুক্রবার রাত ৮টায় টাঙ্গাইল পুলিশ সুপারের কার্যালয়ের সামনে থেকে তাদের আটক করা হয়। আটকরা হলেন- জামালপুর কোর্ট পুলিশের এসআই মোহাম্মদ আলী ও জামালপুরের ইসলামপুর উপজেলার মো. খায়রুল বাশারের স্ত্রী শাহানাতুল আরেফিন সুমি (৩৫)। এসআই মোহাম্মদ আলী টাঙ্গাইল সদর উপজেলার চৌবাড়িয়া গ্রামের মৃত ইনছান আলীর ছেলে বলে জানা গেছে। গত শনিবার দুপুরে টাঙ্গাইলের পুলিশ সুপার সঞ্জিত কুমার রায় তার নিজ কার্যালয়ের সম্মেলন কক্ষে এক সংবাদ সম্মেলনে এ তথ্য সাংবাদিকদের জানিয়েছেন।
পুলিশ সুপার জানান, শেরপুর সদর থানার তারাগড় নামাপাড়া গ্রামের মৃত আব্দুল বারিকের ছেলে মো. ওয়াজেদ আলী তার ভাতিজা কবির হোসেনকে ১০ লাখ টাকার বিনিময়ে পুলিশ কনস্টেবল পদে চাকরি দিতে এসআই মোহাম্মদ আলী ও সুমির স্বামী খায়রুল বাশারের সঙ্গে চুক্তি করেন। সেই ১০ লাখ টাকা নিয়ে ওয়াজেদ আলী মাইক্রোবাসযোগে এসআই মোহাম্মদ আলী, খায়রুল বাশার ও তার স্ত্রী সুমির সঙ্গে শুক্রবার জামালপুর থেকে টাঙ্গাইলের উদ্দেশে রওনা হন। গাড়িতে বসেই তারা টাকা লেনদেন করেন। পরে টাঙ্গাইল পুলিশ সুপারের কার্যালয়ের সামনে গাড়িতে ওয়াজেদ আলীকে রেখে ১০ লাখ টাকা ভ্যানিটি ব্যাগে করে সুমি পুলিশ সুপারের কার্যালয়ে যান। কিছুক্ষণ ঘোরাঘুরি করে সুমি নিচে গিয়ে ভ্যানিটি ব্যাগ থেকে টাকা তার স্বামী কথিত সাংবাদিক খায়রুল বাশারের কাছে দেন। টাকাগুলো নিয়ে খায়রুল বাশার চলে যান। বিষয়টি ওয়াজেদ আলী দেখে ফেলায় তার মনে সন্দেহের সৃষ্টি হয়। ওয়াজেদ আলী পুলিশ সুপারের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে চাইলে সুমি তাকে জানায়, এসপির গেস্ট এসেছে, তিনি এখন দেখা করতে পারবেন না। পরে সুমি ও এসআই মোহাম্মদ আলীর সঙ্গে ওয়াজেদ আলীর বাকবিত-া ও হট্টগোলের সৃষ্টি হয়।
এ সময় গোয়েন্দা পুলিশের এসআই ফরিদ উদ্দিনসহ কয়েকজন যাওয়ার সময় তাদের জিজ্ঞাসাবাদ করলে ওয়াজেদ আলী বিস্তারিত খুলে বলেন। তখন তাদের আটক করে সুমির ব্যাগ থেকে ১ লাখ ৯৫ হাজার টাকা, সুমির স্বামীর নামে সাংবাদিক আইডি কার্ড ও তাদের ব্যবহূত একটি মাইক্রোবাস জব্দ করা হয়। সুমিকে জিজ্ঞাসা করলে তিনি বাকি ৮ লাখ ৫ হাজার টাকা তার স্বামী খায়রুল বাশারের কাছে রয়েছে বলে জানান। এ ঘটনায় টাঙ্গাইল সদর থানায় মামলা দায়ের করা হয়েছে বলে জানান তিনি। পুলিশ সুপার আরও জানিয়েছেন, আগামী ১ জুলাই টাঙ্গাইল পুলিশ লাইন্স থেকে পুলিশ কনস্টেবল পদে লোক নেয়া হবে। সেখানে সরকার নির্ধারিত ফি ১০০ টাকা ও ফরম ৩ টাকার বিনিময়ে চাকরি দেয়া হবে। এ বিষয়ে কোনো অবৈধ টাকা লেনদেন করলে তার বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে বলে জানান তিনি।
এছাড়া, বগুড়ায় পুলিশ কনস্টেবল পদে চাকরি পাইয়ে দেয়ার নামে টাকা হাতিয়ে নেয়ার অভিযোগে আনোয়ার হোসেন (৩৫) নামের এক সরকারি কর্মচারীকে গ্রেপ্তার করেছে গোয়েন্দা পুলিশ। গ্রেপ্তারকৃত ব্যক্তি বগুড়া মোহাম্মদ আলী হাসপাতালের রেকর্ড কিপার বলে জানা গেছে। ২১ জুন বিকালে চাকরি প্রার্থী সুজন মাহমুদের ভগ্নীপতি রাশেদুর রহমান শিপন বাদি হয়ে গ্রেপ্তারকৃত আনোয়ার হোসেনের নামে বগুড়া সদর থানায় মামলা করেছেন।
জানা গেছে, সুজন মাহমুদকে পুলিশ কনস্টেবল পদে চাকরির জন্য রাশেদুর রহমান শিপন তাদের পূর্বপরিচিত আনোয়ার হোসেনের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। আনোয়ার হোসেন ১৪ লাখ টাকার চুক্তিতে সুজন মাহমুদকে চাকরি দেয়ার প্রতিশ্রুতি দেন। সেই অনুযায়ী গত ১৩ জুন আনোয়ার হোসেন তার অফিসে বসে এক লাখ টাকা অগ্রিম এবং প্রার্থীর কাগজপত্রের ফটোকপি গ্রহণ করেন। কিন্তু পুলিশ নিয়োগে ঘুষ বিরোধী প্রচারণার কারণেই ভুক্তভোগীরা অভিযোগ করলে পুলিশ তাকে গ্রেপ্তার করে। জেলা গোয়েন্দা পুলিশের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, পুলিশ নিয়োগে এবার ঘুষ বাণিজ্যের বিরুদ্ধে গোয়েন্দারা কাজ করছে। আর গ্রেপ্তারকৃত আনোয়ার হোসেনের বিরুদ্ধে এ ধরনের প্রতারণার অভিযোগ আরও রয়েছে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে একজন পুলিশ সদস্য জানান, এই প্রতারণা ও নিয়োগ বাণিজ্য প্রতিবছরই প্রতারকচক্ররা করে থাকে। তারা ইতোমধ্যেই পুলিশ সদর দপ্তরের সামনে পার্কের পাশের রাস্তায় অনবরত ঘুর ঘুর করছে। ঊর্ধ্বতন পুলিশ কর্মকর্তাদের সঙ্গে সখ্যতা গড়তেই এলাকায় প্রতিনিয়ত আসা-যাওয়া করছে। এদের সঙ্গে এক শ্রেণির পুলিশ সদস্যরা জড়িত রয়েছে। এর আগে গত বছর পুলিশ নিয়োগের কোচিং সেন্টার গড়ে তোলা হয়েছিল। সেখানে পুলিশের চাকরি নিশ্চিত করতে ৮ থেকে ১০ লাখ টাকা নেয়া হয়েছে। একপর্যায়ে নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লায় প্রতারকচক্র পুলিশের হাতে গ্রেপ্তার হয়।
এ ব্যাপারে বাংলাদেশ পুলিশ হেড কোয়ার্টার্সের এআইজি (মিডিয়া এন্ড পিআর) মো. সোহেল রানা জানান, পুলিশ কনস্টেবল পদে নিয়োগের ক্ষেত্রে কোনো প্রকার আর্থিক লেনদেন বা অবৈধ পন্থা অবলম্বন করলে নিয়োগ বাতিলসহ আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
কমেন্ট বক্স