প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেছেন, দেশের ২০ কোটি মানুষের ৪০ কোটি হাতকে অলস বসিয়ে রাখলে চলবে না। এই বিশাল জনশক্তিকে দেশের মানুষের ভাগ্যের পরিবর্তনে কাজে লাগাতে হবে। তাহলেই এই দেশের মানুষের ভাগ্যের পরিবর্তন হবে। তিনি বলেন, বিএনপি মানুষের ভাগ্য পরিবর্তনের রাজনীতি করে। আমরা যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছি, তিলে তিলে রক্ত দিয়ে হলেও তা রক্ষা করা হবে। গতকাল সোমবার বিকালে যশোর ঈদগাহ ময়দানে জেলা বিএনপি আয়োজিত বিশাল সমাবেশে তিনি এসব কথা বলেন।
যশোর জেলা বিএনপির সভাপতি সৈয়দ সাবেরুল হক সাবুর সভাপতিত্বে সমাবেশে অন্যদের মধ্যে বক্তব্য দেন বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান নার্গিস বেগম, পানিসম্পদমন্ত্রী শহীদউদ্দীন চৌধুরী এ্যানি, প্রতিমন্ত্রী ফরহাদ হোসেন আজাদ, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিতসহ বিএনপি ও সহযোগী সংগঠনগুলোর নেতারা। এসময় মঞ্চে উপস্থিত ছিলেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার সাখাওয়াত হোসেন বকুল, সংসদ সদস্য রকিবুল ইসলাম বকুল ও মাওলানা আজিজুর রহমান, সাবেক সংসদ সদস্য মফিকুল হাসান তৃপ্তি প্রমুখ। এর আগে দুপুরে যশোরের শার্শা উপজেলায় শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের স্মৃতিবিজড়িত ঐতিহাসিক ‘উলসী-যদুনাথপুর’ খাল পুনঃখনন কর্মসূচির উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী। বক্তব্যে তারেক রহমান বলেন, রাজনৈতিক স্বার্থে যারা গণভোট ও জুলাই সনদ নিয়ে বিভ্রান্তি সৃষ্টির চেষ্টা করছে তাদের প্রশ্রয় দেবে না জনগণ।
রাজনৈতিক দলগুলোর স্বাক্ষরিত ‘জুলাই সনদ’ ধাপে ধাপে এবং সম্পূর্ণভাবে বাস্তবায়ন করা হবে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, নারীদের জন্য ফ্যামিলি কার্ড, কৃষকদের কৃষক কার্ড, খাল খনন কর্মসূচি, বেকার যুবকদের কর্মসংস্থানের জন্য বন্ধ মিলকারখানা চালু, স্বাস্থ্যসেবা গ্রামে গ্রামে পৌঁছে দেওয়া, বৃক্ষরোপণসহ সরকারের নেওয়া সব কর্মসূচি বাস্তবায়নে ব্যাঘাত সৃষ্টি করতেই দেশে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির চেষ্টা চালানো হচ্ছে। তাদের বিষয়ে সবাইকে সতর্ক থাকতে হবে। সরকারের বিভিন্ন উন্নয়ন পরিকল্পনার বর্ণনা দিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, এসব কার্যক্রম সফলভাবে বাস্তবায়ন হলে দেশের মানুষের জীবনে ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে। প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আমাদের চোখের সামনে আশপাশের অনেক দেশ বিগত ৫০ বছরে তাদের ভাগ্যের পরিবর্তন করেছে। যেই সিঙ্গাপুরকে নিয়ে আমরা গল্প করি, সেই দেশটির অবস্থা ১৯৭১ সালে আমাদের চেয়েও খারাপ ছিল। আজ তারা কোথায় চলে গিয়েছে? তারা যদি পারে আমরা কেন পারব না? ইনশাল্লাহ আমরাও পারব। এই দেশের মানুষ পারবে।’
প্রধানমন্ত্রী জনগণকে সতর্ক করে দিয়ে বলেন, ‘আমরা দেখেছি আন্দোলনের নামে কীভাবে ১৭৩ দিন হরতাল পালনের মাধ্যমে দেশের অর্থনীতিকে ধ্বংস করে দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছিল। সেই ভূত এখন আরেকজনের কাঁধে ভর করেছে।’ তিনি বলেন, ‘আমরা যদি সতর্ক এবং আমাদের কর্মসূচি বাস্তবায়নে অঙ্গীকারবদ্ধ থাকি, তাহলে দেশের মানুষের ভাগ্য নিয়ে কেউ ছিনিমিনি খেলতে পারবে না।’ তিনি বলেন, ‘আমরা যারা শহীদ জিয়ার দল করি, দেশনেত্রী খালেদা জিয়ার সৈনিক, আমরা বিশ্বাস করি, এই দেশই হচ্ছে আমাদের প্রথম, এই দেশই হচ্ছে আমাদের শেষ ঠিকানা। সে জন্যই আমরা বলি, ‘প্রথম বাংলাদেশ আমার শেষ বাংলাদেশ’।’ প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘বাংলাদেশের প্রায় ২০ কোটি জনসংখ্যার অর্ধেক নারী। দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া এই নারীদের জন্য শিক্ষাব্যবস্থাকে ইন্টারমিডিয়েট পর্যন্ত ফ্রি করে দিয়েছেন। আমরা সিদ্ধান্ত নিয়েছি মেয়েদের পড়ালেখার ব্যবস্থা ডিগ্রি পর্যন্ত ফ্রি করব। একই সঙ্গে যে মেয়েরা ভালো রেজাল্ট করবে, তাদের জন্য আমরা উপবৃত্তি দেব।’
শার্শার উলসী খাল পুনঃখনন উদ্বোধন :
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান গতকাল যশোরের শার্শা উপজেলা উলাশীতে কোদাল দিয়ে নিজ হাতে মাটি কেটে ঐতিহাসিক উলসী খালের (জিয়া খাল) পুনঃখনন কর্মসূচির উদ্বোধন করেছেন। এসময় দেশ ও জাতির কল্যাণ কামনা করে তিনি আল্লাহর দরবারে দোয়া ও মোনাজাত করেন। ১৯৭৬ সালের ১ নভেম্বর যশোরের শার্শার উলসী থেকে যদুনাথপুর পর্যন্ত প্রায় চার কিলোমিটার দীর্ঘ খালটি তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান স্বেচ্ছাশ্রমে খনন করেছিলেন। যা ‘জিয়া খাল’ নামে পরিচিত। এই খালটি বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের মাধ্যমে পুনঃখনন করা হচ্ছে।
এদিকে প্রধানমন্ত্রীর খালকাটা কর্মসূচি ঘিরে শার্শা ও তার আশপাশের এলাকার সাধারণ মানুষের মধ্যে ব্যাপক উৎসাহ-উদ্দীপনা লক্ষ্যু করা যায়। প্রধানমন্ত্রীকে একনজর দেখতে ভোর থেকে অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করতে থাকেন তারা। তাদের সবার হাতে ছিল গোলাপ আর রজনীগন্ধা ফুল। চোখমুখে ছিল খুশির আনন্দ ও উচ্ছ্বাস। প্রধানমন্ত্রী খালে নেমেই প্রথমে চারপাশে অপেক্ষায় থাকা মানুষজনের সঙ্গে কুশলবিনিময় করেন। পরে একই স্থানে সংক্ষিপ্ত এক সভায় বক্তৃতাও করেন। তিনি বলেন, খাল খননের মাধ্যমে ১ হাজার ৪০০ টন বাড়তি খাদ্যশস্য উৎপাদন হবে এবং প্রায় ৭২ হাজার মানুষ সরাসরি সুফল পাবে। খালের দুই পাড়ে ৩ হাজার বৃক্ষ রোপণ করা হবে।
যশোর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ভিত্তিপ্রস্তর উন্মোচন :
গতকাল দুপুরে যশোর শহরের চাচড়া এলাকায় যশোর মেডিকেল কলেজ চত্বরে ৫০০ শয্যাবিশিষ্ট হাসপাতালের ভিত্তিফলক উন্মোচন করেন প্রধানমন্ত্রী।
পাবলিক লাইব্রেরি পরিদর্শন :
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান পৌনে দুই শ বছরের প্রাচীন যশোর ইনস্টিটিউট পাবলিক লাইব্রেরি পরিদর্শন করেছেন। এসময় সেখানে উপস্থিত নাগরিকদের উদ্দেশে তিনি বলেন, ‘আমরা বই পড়ার অভ্যাস গড়ে তুলতে চাই। আমাদের বাচ্চাদের মোবাইল ফোন থেকে বের করে খেলার মাঠ ও বইয়ের মধ্যে নিয়ে আসতে চাই। এজন্য আমাদের পরিকল্পনা আছে, কাজটা শুরু করতে চাচ্ছি।’ তিনি বলেন, ‘আপনারা নিশ্চয় এর মধ্যে দেখেছেন, অধ্যাপক আব্দুল্লাহ আবু সায়ীদের সঙ্গে আমি বসেছিলাম। সরকারের পক্ষ থেকে আমরা তাঁদের সঙ্গে কাজ করতে চাচ্ছি। প্রতি উপজেলায় দুটি করে প্রাইমারি স্কুল টার্গেট করে এগোনোর চিন্তা করছি।’
মা-বোনদের স্বাবলম্বী করতে ‘ফ্যামিলি কার্ড’ ও ‘এলপিজি কার্ড’ চালুর কথা উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘নারীপ্রধান পরিবারগুলোকে আমরা ফ্যামিলি কার্ড দেব। এর মাধ্যমে প্রতি মাসে সরকার থেকে ২ হাজার ৫০০ টাকা সরাসরি পৌঁছে দেওয়া হবে। এছাড়া রান্নার কষ্ট লাঘবে দেওয়া হবে এলপিজি কার্ড।’ ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের কথা স্মরণ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘স্বৈরাচার বিদায় হয়েছে, এখন দেশ গড়ার পালা। আমরা জাতীয় সংসদের দক্ষিণ প্লাজায় সব দল মিলে “জুলাই সনদ” স্বাক্ষর করেছি। সেই সনদের প্রতিটি শব্দ আমরা বাস্তবায়ন করব।’
সমীকরণ প্রতিবেদক