উচ্চকক্ষ নাকি স্পিকার, আলোচনায় নতুন ফর্মুলা
নির্বাচনকালীন নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা ফিরিয়ে আনতে চায় ক্ষমতাসীন দল বিএনপি। তবে সেই সরকার কীভাবে গঠিত হবে, কে হবেন প্রধান এবং নিয়োগপ্রক্রিয়ায় কোন কোন প্রতিষ্ঠান বা পক্ষ যুক্ত থাকবে-এসব প্রশ্নে এখনো চূড়ান্ত সমাধানে পৌঁছানো যায়নি। তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা পুনর্বহালের প্রশ্নে দলটির অবস্থান স্পষ্ট হলেও সরকার গঠনের সাংবিধানিক কাঠামো নিয়ে রয়েছে ভিন্নমত। বিশেষ করে রাষ্ট্রপতি ও বিচার বিভাগকে এ প্রক্রিয়ায় যুক্ত করার বিষয়ে বিএনপির আপত্তি নতুন করে সামনে এসেছে।
এই পরিস্থিতিতে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান নিয়োগ ও সরকার গঠনের বিকল্প পদ্ধতি খুঁজছে জাতীয় সংসদের সংবিধান সংশোধন বিষয়ক বিশেষ কমিটি। আলোচনায় এসেছে সংসদের উচ্চকক্ষকে কেন্দ্র করে সরকার গঠন, উচ্চকক্ষে ভাইস প্রেসিডেন্টের পদ সৃষ্টি করে তাকে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দায়িত্ব দেওয়া এবং সরকার ও বিরোধী দলের সম্মতিতে নির্বাচিত স্পিকারকে সরকারপ্রধান করার মতো প্রস্তাব।
তবে এসবের কোনোটিই এখনো চূড়ান্ত নয়। ফলে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা ফিরিয়ে আনার রাজনৈতিক অঙ্গীকারের পাশাপাশি কীভাবে এর নিয়োগপ্রক্রিয়া এমনভাবে সাজানো যায়, যাতে সব পক্ষের আস্থা বজায় থাকে, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন। সংবিধান সংশোধন বিষয়ক বিশেষ কমিটির সভাপতি ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদের বক্তব্যেও আলোচনার এই অনিশ্চয়তা উঠে এসেছে। সম্প্রতি জাতীয় সংসদ ভবনের কেবিনেট কক্ষে সংবিধান সংশোধন বিষয়ক বিশেষ কমিটির নবম বৈঠক শেষে তিনি জানান, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের গঠনপ্রক্রিয়া, কর্মপরিধি ও অন্যান্য বিষয় নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে। বিভিন্ন বিকল্প প্রস্তাব এসেছে, তবে কোনো সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত হয়নি।
সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, তত্ত্বাবধায়ক সরকার পদ্ধতি, এর গঠনপ্রক্রিয়া এবং কর্মপরিধি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে। উচ্চকক্ষ গঠিত হলে সেটিকে কেন্দ করে তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠনের ব্যবস্থা করা যায় কি না, তা নিয়েও মতবিনিময় হয়েছে। বিশেষ কমিটির আলোচনায় উচ্চকক্ষকে কেন্দ্র করে তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠনের ধারণাটি গুরুত্বপূর্ণ বিকল্প হিসেবে এসেছে। এ ক্ষেত্রে উচ্চকক্ষে ভাইস প্রেসিডেন্টের পদ সৃষ্টি করে তাকে নির্বাচনকালীন সরকারের দায়িত্ব দেওয়ার প্রস্তাব রয়েছে। তবে উচ্চকক্ষের সঙ্গে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সম্পর্ক কী হবে, ভাইস প্রেসিডেন্ট কীভাবে নির্বাচিত বা মনোনীত হবেন এবং তার প্রতি রাজনৈতিক পক্ষগুলোর আস্থা কীভাবে নিশ্চিত করা হবে- এসব বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি।
অন্য একটি প্রস্তাবে সরকার ও বিরোধী দলের সম্মতিতে স্পিকার নির্বাচনের পর তাকে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান করার সম্ভাবনা বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি স্পিকার ছাড়াও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের ব্যক্তিদের সরকার ও বিরোধী দলের সম্মতিতে উপদেষ্টা হিসেবে নিয়োগ দেওয়ার বিধান রাখা যায় কি না, তা নিয়ে আলোচনা হয়েছে। এই প্রস্তাবগুলোর মূল লক্ষ্য হলো নির্বাচনকালীন সরকার গঠনে একক কোনো পক্ষের প্রভাব কমিয়ে রাজনৈতিক গ্রহণযোগ্যতা নিশ্চিত করা। তবে রাজনৈতিক সমঝোতা অর্জনের পদ্ধতি এবং কোনো পক্ষ সম্মত না হলে পরবর্তী পদক্ষেপ কী হবে, তা এখনো নির্ধারিত হয়নি।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানিয়েছেন, আলোচনায় আসা প্রস্তাবগুলো পর্যালোচনা করে বিশেষ কমিটির প্রতিবেদনে তুলে ধরা হবে। এ বিষয়ে সবার লিখিত মতামতও চাওয়া হয়েছে। অর্থাৎ, এখন পর্যন্ত আলোচনাগুলো বিকল্প কাঠামো নির্ধারণের পর্যায়েই রয়েছে। তত্ত্বাবধায়ক সরকারপ্রধান নিয়োগের প্রশ্নে বিএনপির আপত্তির একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক উঠে এসেছে জুলাই জাতীয় সনদের প্রস্তাবে। সেখানে পাঁচ সদস্যের একটি প্যানেলের মাধ্যমে প্রধান উপদেষ্টা নিয়োগের কথা বলা হয়েছে।
প্রস্তাবিত প্যানেলে থাকবেন প্রধানমন্ত্রী, বিরোধীদলীয় নেতা, স্পিকার, বিরোধী দলের ডেপুটি স্পিকার এবং দ্বিতীয় বৃহত্তম বিরোধী দলের একজন প্রতিনিধি। এই প্যানেল ঐকমত্যে পৌঁছাতে ব্যর্থ হলে পরবর্তী ধাপে বিচার বিভাগের প্রতিনিধিদের যুক্ত করে বিকল্প পদ্ধতিতে প্রধান উপদেষ্টা নির্বাচনের প্রস্তাবও রয়েছে। কিন্তু রাষ্ট্রপতি ও বিচার বিভাগকে সরকার গঠনের প্রক্রিয়ায় যুক্ত করার বিষয়ে বিএনপির ভিন্নমত রয়েছে। এখানেই তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা পুনর্বহালের বিষয়ে রাজনৈতিক ঐকমত্যের পাশাপাশি নিয়োগপ্রক্রিয়ার নকশা নিয়ে মতপার্থক্য সামনে এসেছে। বিএনপি নির্দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন চাইলেও সেই সরকারের প্রধান ও উপদেষ্টাদের নিয়োগে কোন বিকল্প কাঠামোকে সমর্থন করবে, রবে, তা এখনো স্পষ্ট নয়।
বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সেলিমা রহমান এ বিষয়ে বলেন, সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা অত্যন্ত জরুরি। তাঁর ভাষ্য, বিগত আওয়ামী লীগ সরকার এই ব্যবস্থা বাতিল করায় দেশের নির্বাচনি পদ্ধতি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। জনগণের ভোটাধিকার প্রতিষ্ঠায় তত্ত্বাবধায়ক পদ্ধতিতে নির্বাচন অনুষ্ঠানের বিষয়ে সরকার আন্তরিক। তবে বিএনপি কোন প্রক্রিয়ায় এই ব্যবস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠা করতে চায়, তা এখনই চূড়ান্তভাবে বলা সম্ভব নয় বলে জানান তিনি। সংবিধান সংশোধনের মাধ্যমেই সরকার এ বিষয়ে এগোতে চায় উল্লেখ করে সেলিমা রহমান বলেন, চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের আগে প্রয়োজনে অংশীজনদের সঙ্গে আরও আলোচনা হতে পারে।
নির্বাচনকালীন সরকার গঠনের প্রশ্নে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে সমঝোতা ও সংঘাত- দুই ধরনের অভিজ্ঞতাই রয়েছে। বর্তমান বিতর্কের গুরুত্ব বুঝতে হলে সেই ইতিহাসের দিকে ফিরে তাকানো প্রয়োজন। ১৯৯১ সালের নির্বাচনে জয়ী হয়ে বিএনপি সরকার গঠন করে। এরশাদ সরকারের পতনের পর বিচারপতি সাহাবুদ্দীন আহমদের নেতৃত্বে যে অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব পালন করেছিল, তা রাজনৈতিক সমঝোতার ভিত্তিতে গঠিত হয়েছিল। তখন সংবিধানে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা অন্তর্ভুক্ত ছিল না।
১৯৯৪ সালের ২০ মার্চ মাগুরা-২ আসনের উপ-নির্বাচনকে কেন্দ্র করে নির্বাচনব্যবস্থার নিরপেক্ষতা নিয়ে বিরোধী দলগুলোর অভিযোগ ও আন্দোলন জোরালো হয়। আওয়ামী লীগসহ বিরোধী দলগুলো নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচনের দাবি জানায়। এর ধারাবাহিকতায় ১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি প্রধান বিরোধী দলগুলোর বর্জনের মধ্যে ষষ্ঠ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। ওই নির্বাচনের পর ১৯ মার্চ খালেদা জিয়া দ্বিতীয়বার প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন। রাজনৈতিক সংকটের মধ্যে ২৬ মার্চ সংসদে ত্রয়োদশ সংশোধনী পাস হয়। ৩০ মার্চ খালেদা জিয়া পদত্যাগ করলে বিচারপতি মুহাম্মদ হাবিবুর রহমানের নেতৃত্বে তত্ত্বাবধায়ক সরকার দায়িত্ব নেয়। ওই সরকারের অধীনে ১২ জুনের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ জয়ী হয়।
২০০১ সালের ১ অক্টোবরের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় বিচারপতি লতিফুর রহমানের নেতৃত্বাধীন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে। বিএনপি নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট জয়ী হওয়ার পর ১০ অক্টোবর খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে সরকার গঠিত হয়। কিন্তু ২০০৬ সালে বিএনপি সরকারের মেয়াদ শেষে নতুন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান নিয়োগ নিয়ে আবারও রাজনৈতিক বিরোধ দেখা দেয়। রাষ্ট্রপতি ইয়াজউদ্দিন আহম্মেদ নিজেই প্রধান উপদেষ্টার দায়িত্ব নেওয়ার পর সংকট আরও গভীর হয়। ২০০৭ সালের ১১ জানুয়ারি জরুরি অবস্থা জারি করা হয়। পরদিন ফখরুদ্দীন আহমদের নেতৃত্বে নতুন তত্ত্বাবধায়ক সরকার দায়িত্ব নেয়। ওই সরকারের অধীনে ২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বর জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়।
এই অভিজ্ঞতা দেখিয়েছে, নির্বাচনকালীন সরকার গঠনের সাংবিধানিক বিধান থাকলেই রাজনৈতিক সংকটের আশঙ্কা পুরোপুরি দূর হয় না। সরকারপ্রধান নিয়োগে পক্ষগুলোর আস্থা, ঐকমত্য অর্জনের কার্যকর পদ্ধতি এবং নির্বাচনকালীন সরকারের ক্ষমতার সীমা- সবকিছুই ব্যবস্থাটির গ্রহণযোগ্যতার সঙ্গে জড়িত। তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠনের বিকল্প পদ্ধতি নিয়ে বিএনপির অতীতেও একটি নির্দিষ্ট প্রস্তাব ছিল। ২০১৩ সালে দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে তৎকালীন বিরোধীদলীয় নেতা খালেদা জিয়া ১৯৯৬ ও ২০০১ সালের তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টাদের মধ্য থেকে ১০ জনকে নিয়ে নির্বাচনকালীন সরকার গঠনের প্রস্তাব দিয়েছিলেন। ওই প্রস্তাবে সরকারপক্ষ থেকে পাঁচজন এবং বিরোধী দল থেকে পাঁচজনকে মনোনয়নের কথা বলা হয়। দুই পক্ষের সম্মতিতে একজনকে প্রধান উপদেষ্টা করার ধারণাও ছিল তাতে।
এটি ছিল সে সময়কার রাজনৈতিক সমঝোতার উদ্যোগ: বিএনপির বর্তমান প্রস্তাব হিসেবে একে বিবেচনা করার সুযোগ নেই। তবে দলটি অতীতে কীভাবে রাজনৈতিক ঐকমত্যের ভিত্তিতে নির্বাচনকালীন সরকার গঠনের কথা ভেবেছিল, তার একটি নজির হিসেবে প্রস্তাবটি গুরুত্বপূর্ণ। বর্তমান পরিস্থিতিতে সেই ধরনের সমঝোতাভিত্তিক কাঠামো আবার বিবেচনায় আসবে কি না, তা এখনো জানা যায়নি। বিশেষ কমিটির আলোচনায় উচ্চকক্ষ, স্পিকার এবং সরকার ও বিরোধী দলের সম্মতিকে কেন্দ করে যে বিকল্পগুলো এসেছে, সেগুলোর সঙ্গে বিএনপির চূড়ান্ত অবস্থানের সম্পর্কও এখনো পরিষ্কার নয়।
তত্ত্বাবধায়ক সরকার পুনর্বহালের উদ্যোগে প্রধান উপদেষ্টা নিয়োগের পদ্ধতিই একমাত্র প্রশ্ন নয়। সরকার গঠনে ঐকমত্য না হলে বিকল্প ব্যবস্থা কী হবে, উপদেষ্টাদের নিয়োগ কীভাবে সম্পন্ন হবে, সরকারের মেয়াদ কত দিন থাকবে এবং নির্বাচন আয়োজনের বাইরে সরকারের ক্ষমতা কতটুকু থাকবে- এসব বিষয়েও স্পষ্ট সাংবিধানিক বিধান প্রয়োজন।
একই সঙ্গে নির্বাচনকালীন সরকারের নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করার পাশাপাশি প্রশাসন পরিচালনা, আইনশৃঙ্খলা রক্ষা এবং নির্বাচন কমিশনকে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা দেওয়ার ক্ষেত্রে দায়িত্ব ও ক্ষমতার সীমারেখা নির্ধারণ জরুরি। কোনো রাজনৈতিক পক্ষ নিয়োগপ্রক্রিয়া নিয়ে আপত্তি তুললে সেই অচলাবস্থা নিরসনের বিধানও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
বিশেষ কমিটির সামনে এখন তাই দ্বিমুখী চ্যালেঞ্জ- একদিকে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা পুনর্বহালের সাংবিধানিক কাঠামো তৈরি, অন্যদিকে এমন নিয়োগপদ্ধতি নির্ধারণ করা, যাতে সরকার ও বিরোধী দল উভয়েই ব্যবস্থাটিকে গ্রহণযোগ্য মনে করে। বিএনপি তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা পুনর্বহালের পক্ষে থাকলেও সরকারপ্রধান নিয়োগের পদ্ধতি নিয়ে তাদের আপত্তি এবং অতীতের অভিজ্ঞতা নতুন কাঠামো নির্ধারণে বড় বিবেচ্য বিষয় হয়ে উঠেছে। উচ্চকক্ষ, স্পিকার কিংবা রাজনৈতিক ঐকমত্যের ভিত্তিতে সরকার গঠনের প্রস্তাবগুলোর মধ্যে শেষ পর্যন্ত কোনটি গুরুত্ব পাবে, তা নির্ভর করবে বিশেষ কমিটির পর্যালোচনা, বিএনপির চূড়ান্ত অবস্থান এবং সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর মধ্যে সমঝোতার ওপর।
সমীকরণ প্রতিবেদন