চুয়াডাঙ্গায় চার দিনব্যাপী ‘চুয়াডাঙ্গা ক্রিয়েটিভ শপিং ফেস্ট-২০২৬’ ঘিরে স্টল ভাড়া ও বিদ্যুৎ বিল আদায়ে অসংগতি, চরম অব্যবস্থাপনা এবং হকারদের কাছ থেকে টাকা তোলার অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয় অনলাইন উদ্যোক্তাদের ব্যবসার প্রচার ও প্রসারের উদ্দেশ্যে আয়োজিত এ মেলায় দোকানভেদে ভিন্ন ভিন্ন ভাড়া আদায়ের তথ্য পাওয়া গেছে। মেলার শেষ পর্যায়ে এসেও কোনো কোনো দোকানির সঙ্গে ভাড়ার বিষয়ে নির্দিষ্ট সমঝোতা হয়নি। এতে আয়োজকদের ব্যবস্থাপনা ও অর্থ আদায়ের স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
অভিযোগ উঠেছে, বাইরের বড় বড় দোকানগুলোকে বিশেষ সুযোগ দেওয়া হলেও স্থানীয় উদ্যোক্তাদেরই গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে না। স্থানীয় উদ্যোক্তাদের ছোট দোকান থেকেও নেওয়া হচ্ছে দুই হাজার টাকা করে। অনলাইনে ব্যবসা পরিচালনাকারী স্থানীয় সৃজনশীল উদ্যোক্তাদের ব্যবসার প্রচারের জন্য এ আয়োজন করা হয়েছে দাবি করা হলেও তাদের দেওয়া হচ্ছে না ছাড়। বিশেষ সুবিধা ও বড় স্টলগুলো দেওয়া হয়েছে বাইরের ব্যবসায়ীদের।
জানা যায়, গত ২১ থেকে ২৪ অক্টোবর পর্যন্ত চুয়াডাঙ্গা সরকারি কলেজের বিপরীতে মুক্তমঞ্চে ৪০টি স্টল নিয়ে এ মেলার আয়োজন করে ‘উদ্যোক্তা ডট কম’। তবে মেলায় স্থানীয় অনলাইন উদ্যোক্তাদের পাশাপাশি বাইরের বেশ কিছু দোকানও দেখা গেছে। মেলায় অংশ নেওয়া কয়েকজন উদ্যোক্তার ভাষ্য, স্টল নেওয়ার জন্য মেলা কর্তৃপক্ষকে দুই হাজার টাকা করে দিতে হয়েছে। পাশাপাশি প্রতিদিন ৫০ টাকা করে বিদ্যুৎ বিল দিতে হচ্ছে।
রাজা গুড়া মসলার মালিক আব্দুল খালিদ, ফ্লোরেন বাই আফিয়ার স্বত্বাধিকারী মনিকা, ক্রাফটস অ্যান্ড জুয়েলারি বাই আয়শার স্বত্বাধিকারী সোহা, এএস ফ্যাশন হাউসের স্বত্বাধিকারী অপু, ওয়েডিং ক্যাপচারের স্বত্বাধিকারী সাইফুল্লাহ মানসুর সিফাত, মিকোন গ্ল্যামারের স্বত্বাধিকারী ফারজানা মিম এবং সোহা কেক হাউসের মালিক সোহাসহ কয়েকজন উদ্যোক্তা জানান, স্টল নেওয়ার জন্য তাঁদের দুই হাজার টাকা করে দিতে হয়েছে। এছাড়া প্রতিদিন বিদ্যুৎ বিল বাবদ ৫০ টাকা করে দিতে হচ্ছে।
তবে কসমেটিকসের দোকানমালিকদের বক্তব্যে ভিন্ন তথ্য পাওয়া গেছে। আক্তার নামের এক দোকানমালিক বলেন, “আমাদের কাছ থেকে প্রাথমিকভাবে এক হাজার টাকা করে নেওয়া হচ্ছে। তবে পরবর্তী সময়ে কত টাকা দিতে হবে, সে বিষয়ে স্পষ্ট করে কিছু জানানো হয়নি।” তাঁর ভাষ্য, চূড়ান্ত অর্থের পরিমাণ বিক্রিবাট্টার ওপর নির্ভর করতে পারে বলে তাঁদের জানানো হয়েছে।
অন্য কয়েকজন কসমেটিকস ব্যবসায়ী জানান, তাঁরা এখনো মেলা কর্তৃপক্ষকে নির্দিষ্ট কোনো টাকা দেননি। তাঁদের সঙ্গে ভাড়ার পরিমাণ নিয়েও চূড়ান্ত আলোচনা হয়নি। মেলার মাঠে একাধিক দোকানির সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, স্টলভেদে ভাড়া ও বিদ্যুৎ বিলের বিষয়ে ভিন্ন ভিন্ন তথ্য পাওয়া যাচ্ছে। মেলার শেষ দিনেও কোনো কোনো দোকানি ভাড়ার নির্দিষ্ট পরিমাণ জানেন না। আবার কয়েকজন দোকানির কাছে ভাড়া সম্পর্কে জানতে চাইলে তাঁরা জানান, এ বিষয়ে তাঁদের ওপর থেকে কিছু বলতে নিষেধ করা হয়েছে।
স্টলের বাইরে মেলার ভেতরে ও বাইরে থাকা হকারদের কাছ থেকেও টাকা নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক উদ্যোক্তা দাবি করেন, স্টল বাবদ দুই হাজার টাকা নেওয়া হলেও বিদ্যুৎ সরবরাহসহ সার্বিক সেবা সন্তোষজনক নয়। ঠিকমতো বিদ্যুৎ পাওয়া যাচ্ছে না বলেও অভিযোগ করেন তিনি। এছাড়া মেলার ভেতরে থাকা হকারদের কাছ থেকেও ১০০ টাকা করে নেওয়া হচ্ছে বলে দাবি করেন ওই উদ্যোক্তা।
সার্বিক বিষয়ে মেলার আয়োজক কমিটির সদস্য হাসনা জাহান খুশবু বলেন, “মেলায় মোট ৪০টি স্টল রয়েছে। স্টল ভাড়া নির্দিষ্ট করে নির্ধারণ করা হয়নি; উদ্যোক্তারা নিজেদের সামর্থ্য ও সন্তুষ্টি অনুযায়ী অর্থ দিচ্ছেন।” তবে স্টলপ্রতি দুই হাজার টাকা করে নেওয়া হচ্ছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন। বিদ্যুৎ সরবরাহের বিষয়ে তিনি বলেন, “ডিসি অফিসের অনুমতিক্রমে বিদ্যুৎ অফিসের মাধ্যমে সংযোগ নেওয়া হয়েছে এবং সেখানে আলাদা মিটার রয়েছে। বিদ্যুৎ বিল পরিশোধ করতে হচ্ছে।” এ ছাড়া অন্য কোনো ‘হিডেন চার্জ’ নেওয়া হচ্ছে না বলে দাবি করে খুশবু আরও বলেন, “স্টল থেকে পাওয়া অর্থ মেলার ব্যবস্থাপনা, সাজসজ্জা, বিদ্যুতের কাজসহ বিভিন্ন আনুষঙ্গিক খরচে ব্যয় করা হচ্ছে। সকাল থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত মেলা চালু রাখা হয়েছে।”
এদিকে মেলায় স্থানীয় অনলাইন উদ্যোক্তাদের পাশাপাশি বাইরের দোকান থাকার বিষয়ে জেলা প্রশাসনের দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে জেলা প্রশাসক লুৎফুন নাহার বলেন, “এ বিষয়ে মেলার আয়োজক কমিটির সঙ্গে কথা বলতে হবে।”
অন্যদিকে আয়োজক কমিটির পক্ষ থেকে জেলা প্রশাসনের অনুমতি নিয়ে বিদ্যুৎ অফিসের মাধ্যমে সংযোগ নেওয়া হয়েছে বলে দাবি করা হলেও জেলা প্রশাসকের বক্তব্য বিপরীত। বিদ্যুৎ সংযোগের অনুমতির বিষয়ে জানতে চাইলে জেলা প্রশাসক বলেন, তিনি এ বিষয়ে কিছুই জানেন না। একই সঙ্গে বিদ্যুৎ সংযোগ দেওয়ার ক্ষেত্রে তাঁর ভূমিকা কী—এমন প্রশ্নও তোলেন তিনি। এছাড়া মেলা থেকে জেলা প্রশাসন কোনো অর্থ পাচ্ছে কি না, জানতে চাইলে ক্ষোভ প্রকাশ করে জেলা প্রশাসক বলেন, জেলা প্রশাসন কোনো টাকা পাচ্ছে কি না, তা খোঁজ নিয়ে দেখতে পারেন। একই সাথে এ ধরনের প্রশ্নকে তিনি অবান্তর বলে মন্তব্য করেন।
উদ্যোক্তাদের ব্যবসার প্রসারে আয়োজিত এ মেলায় স্টল ভাড়া, বিদ্যুৎ বিল ও বিবিধ অর্থ আদায় নিয়ে ধূম্রজালের সৃষ্টি হয়েছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, আয়োজক কমিটি যদি নির্ধারিত ভাড়া ও ব্যয়ের স্বচ্ছ হিসাব প্রকাশ করে, তবেই এসব অভিযোগ ও অসংগতির নিরসন হওয়া সম্ভব।
নিজস্ব প্রতিবেদক