মহালয়ায় দেবীপক্ষের সূচনাকে ঘিরে চুয়াডাঙ্গার বিভিন্ন মন্দিরে অনুষ্ঠিত হয়েছে ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান, চণ্ডীপাঠ, নৃত্য ও সংগীত পরিবেশনা। মন্দিরে মন্দিরে ভক্ত-দর্শনার্থীদের সমাগম, প্রজেক্টরের বড় পর্দায় মহালয়া প্রদর্শনী এবং বর্ণিল আলোকসজ্জায় উৎসবমুখর হয়ে উঠেছে পূজামণ্ডপগুলো। ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতার পাশাপাশি পরিবার-পরিজন ও পরিচিতজনদের সঙ্গে আনন্দ ভাগাভাগি করে নিতে মন্দির প্রাঙ্গণে ভিড় করছেন নানা বয়সী মানুষ। মহালয়াকে কেন্দ্র করে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের মধ্যে তৈরি হয়েছে উৎসবের আমেজ ও উচ্ছ্বাস।
গতকাল শনিবার ভোর থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত চুয়াডাঙ্গা শহরসহ জেলার বিভিন্ন এলাকার মন্দিরে মহালয়া উপলক্ষে নানা আয়োজন করা হয়। এর মধ্য দিয়ে শারদীয় দুর্গাপূজাকে ঘিরে ধর্মীয় আবহ আরও প্রাণবন্ত হয়ে ওঠে। জেলার ১১৬টি মন্দিরে দুর্গোৎসব ঘিরে চলছে প্রস্তুতি ও আনুষ্ঠানিক আয়োজন।
সরেজমিনে জেলার বিভিন্ন মন্দির ঘুরে দেখা যায়, চুয়াডাঙ্গা শহরের দৌলতদিয়াড় দক্ষিণপাড়া বারোয়ারী দুর্গামন্দিরে ভোরে প্রজেক্টরের বড় পর্দায় মহালয়া প্রদর্শনের আয়োজন করা হয়। এসময় মহালয়ার অনুষ্ঠান উপভোগ করতে মন্দির প্রাঙ্গণে ভিড় করেন ভক্ত-দর্শনার্থীরা। চণ্ডীপাঠ ও সনাতন ধর্মাবলম্বীদের দেবী দুর্গার আবাহনের মধ্যদিয়ে সেখানে সৃষ্টি হয় এক আবেগঘন ধর্মীয় পরিবেশ। প্রদর্শনী শেষে উপস্থিত ভক্ত-দর্শনার্থীদের মধ্যে প্রসাদ বিতরণ করা হয়।
অন্যদিকে, সন্ধ্যা সাড়ে সাতটায় চুয়াডাঙ্গা বড় বাজার সার্বজনীন দুর্গামন্দিরে মহালয়া উপলক্ষে নৃত্য ও সংগীতানুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। ধর্মীয় ঐতিহ্য ও সংস্কৃতিনির্ভর এ আয়োজন উপভোগ করেন উপস্থিত দর্শনার্থীরা। পরে শুরু হয় সনাতন ধর্মাবলম্বীদের দেবী দুর্গার পূজাসংক্রান্ত আনুষ্ঠানিকতা। শহরের অন্যান্য মন্দিরেও মহালয়া উপলক্ষে বিভিন্ন ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক আয়োজন দেখা যায়।
আয়োজকেরা জানান, আগামী ১৬ অক্টোবর মহাষষ্ঠীর মধ্য দিয়ে শুরু হবে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের প্রধান ধর্মীয় উৎসব শারদীয় দুর্গাপূজার মূল আনুষ্ঠানিকতা। এদিন দেবীর বোধন, আমন্ত্রণ ও অধিবাসের মধ্য দিয়ে পূজার সূচনা হবে। এরপর মহাসপ্তমী, মহাষ্টমী, মহানবমী ও বিজয়া দশমীর ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে শেষ হবে ছয় দিনব্যাপী এ উৎসব।
পূজাকে সামনে রেখে জেলার মন্দিরগুলোতে চলছে শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতি। প্রতিমা, মণ্ডপসজ্জা, আলোকসজ্জা ও অন্যান্য আয়োজন সম্পন্ন করতে ব্যস্ত সময় পার করছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। সুষ্ঠু ও উৎসবমুখর পরিবেশে পূজা উদ্যাপনের প্রত্যাশা আয়োজকদের।
প্রচলিত পঞ্জিকা অনুযায়ী, এবার দেবী দুর্গার আগমন ঘোটকে এবং বিজয়া দশমীতে গমন নৌকায়। ধর্মীয় বিশ্বাস ও প্রচলিত পঞ্জিকামতে, ঘোটকে আগমনকে ‘ছত্রভঙ্গ’ এবং নৌকায় গমনকে শস্য ও জলবৃদ্ধির সঙ্গে সম্পর্কিত বলে বিবেচনা করা হয়।
চুয়াডাঙ্গা শহরের দৌলতদিয়াড় দক্ষিণপাড়া বারোয়ারী দুর্গামন্দিরের কোষাধ্যক্ষ অঞ্জন সাহা আবির বলেন, “প্রতিবছরের মতো এবারও আমরা প্রজেক্টরের মাধ্যমে মহালয়া প্রদর্শনীর আয়োজন করেছি। এ আয়োজনের মধ্য দিয়ে পূজার আগেই আমাদের একটি মহামিলনমেলা অনুষ্ঠিত হচ্ছে। পাশাপাশি প্রাচীন ঐতিহ্য সংরক্ষণ ও তা ধরে রাখতেই আমরা এ উদ্যোগ নিয়েছি।”
তিনি বলেন, মহালয়া প্রদর্শনীকে কেন্দ্র করে মন্দির প্রাঙ্গণে ভক্ত-দর্শনার্থীদের মিলন ঘটে। নতুন প্রজন্মের কাছে ধর্মীয় ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির বিভিন্ন দিক তুলে ধরতেও এ ধরনের আয়োজন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
চুয়াডাঙ্গা বড় বাজার সার্বজনীন দুর্গামন্দিরের মহালয়া আয়োজন কমিটির সদস্য বাপ্পা কুণ্ডু বলেন, “মহালয়াকে কেন্দ্র করে আয়োজিত এ প্রদর্শনীতে ধর্মীয় ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির প্রতি মানুষের আগ্রহ প্রকাশ পায়। একই সঙ্গে এ আয়োজনকে ঘিরে মন্দির প্রাঙ্গণে সৃষ্টি হয় উৎসবমুখর পরিবেশ। মহালয়ার মধ্য দিয়ে দেবী দুর্গার আগমনবার্তায় সনাতন ধর্মাবলম্বীদের মধ্যে শারদীয় দুর্গাপূজাকে ঘিরে আনন্দ ও উদ্দীপনা ছড়িয়ে পড়েছে।”
সনাতন ধর্মাবলম্বী অর্পিতা রায় বলেন, “মহালয়ার মধ্য দিয়ে দুর্গাপূজার আয়োজন শুরু হয়েছে। মন্দির প্রাঙ্গণে বিভিন্ন আনুষ্ঠানিকতা চলছে। নৃত্য ও সংগীত পরিবেশনার মধ্য দিয়ে পূজার আনন্দ, উদ্দীপনা ও উচ্ছ্বাস সবার মধ্যে ছড়িয়ে পড়ছে। প্রতিবছরের মতো এবারও আমরা আনন্দের সঙ্গে দুর্গোৎসব উদ্যাপনের অপেক্ষায় রয়েছি।”
সমীকরণ প্রতিবেদন