পাহাড়সম দুর্নীতি ও বেপরোয়া ঘুষ বাণিজ্যের গুরুতর অভিযোগের পর অবশেষে বদলি করা হয়েছে ঝিনাইদহ পরিবেশ অধিদপ্তরের বিতর্কিত সহকারী পরিচালক মো. মুন্তাছির রহমানকে। গত ৭ সেপ্টেম্বর তিনি তার নতুন কর্মস্থল সিলেট বিভাগীয় কার্যালয়ে যোগদান করেন। ঝিনাইদহ জেলায় প্রায় তিন বছর ধরে চলা তার এই অপকর্মের ইতি ঘটায় স্থানীয় ইটভাটা, ক্লিনিক মালিক ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের মাঝে স্বস্তি ফিরে এসেছে।
স্থানীয় একাধিক সূত্রে জানা গেছে, ঝিনাইদহে দায়িত্ব পালনকালে পরিবেশ ছাড়পত্রের ভয় দেখিয়ে ইটভাটা, ক্লিনিক, সমিল ও ক্ষুদ্র শিল্পপ্রতিষ্ঠান থেকে বার্ষিক ও মাসিক ভিত্তিতে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন এই কর্মকর্তা। ঝিনাইদহ ইটভাটা মালিক সমিতির তথ্যমতে, প্রতিটি ইটভাটা থেকে বছরে প্রায় দুই লাখ টাকা হারে ঘুষ আদায় করা হতো। চাহিদামতো টাকা না দিলে ভ্রাম্যমাণ আদালত বসিয়ে ভাটা গুঁড়িয়ে দেওয়া এবং ভারী অঙ্কের জরিমানা করার ভয় দেখানো হতো।
ভুক্তভোগী ব্যবসায়ী আবু তালেব অভিযোগ করেন, গত মৌসুমে চাঁদা দিতে না পারায় তার ইটভাটা ভেঙে দেওয়া হয় এবং ৬ লাখ টাকা জরিমানা করা হয়। একইভাবে কালীগঞ্জের জেকে ব্রিকসের মালিক জয়নাল আবেদীন, বারোবাজারের ওয়াদুদ ইসলাম এবং মহেশপুরের ভাই ভাই ইটভাটার মালিক সুলতানও এই কর্মকর্তার হাতে হয়রানির শিকার হয়েছেন।
চিকিৎসা খাত থেকেও একইভাবে অর্থ আদায়ের অভিযোগ উঠেছে। কালীগঞ্জ ক্লিনিক মালিক সমিতির দায়িত্বশীল সূত্রের দাবি, স্থানীয় ক্লিনিকগুলোর কাছ থেকে সাড়ে ১০ লাখ টাকা নিলেও পরবর্তীতে পরিস্থিতি বেগতিক দেখে সেই টাকা ফেরত দিতে বাধ্য হন মুন্তাছির রহমান।
ইটভাটা ও ক্লিনিকের পাশাপাশি জেলার প্রায় ৩০০টি ক্ষুদ্র শিল্প কারখানা ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠান থেকে নিয়মিত মাসোয়ারা আদায় করতেন এই কর্মকর্তা। বারোবাজারের মজুমদার এগ্রোটেক ইন্টারন্যাশনাল লিমিটেড নামের তেল মিল থেকে প্রতি মাসে ৫০ হাজার টাকা, হরিণাকুণ্ডুর এক মুড়ি ব্যবসায়ীর কাছ থেকে বছরে ৫০ হাজার টাকা এবং কাঠচেরা কল বা সমিলগুলো থেকেও নিয়মিত চাঁদা তোলা হতো।
জানা গেছে, ঘুষের এই লেনদেন পরিচালনা করতে তিনি আটটি সুনির্দিষ্ট বিকাশ নম্বর ব্যবহার করতেন। এভাবে গত তিন বছরে অবৈধভাবে অর্জিত অর্থ দিয়ে তিনি যশোরের তেঁতুলতলা এলাকায় একটি আলিশান বাড়ি নির্মাণ করেছেন বলেও গুঞ্জন রয়েছে। এছাড়া নামে-বেনামে রয়েছে তার অবৈধ সম্পত্তি।
দীর্ঘদিন ধরে চলা এসব কর্মকাণ্ড ওপেন সিক্রেট হয়ে পড়ায় ঝিনাইদহ জেলা প্রশাসনও বেশ বিব্রতকর অবস্থায় পড়েছিল। অবশেষে এই বদলির আদেশে ব্যবসায়ীরা কিছুটা স্বস্তি প্রকাশ করেছেন। পরিচয় গোপন রাখার স্বার্থে জেলা প্রশাসনের এক কর্মকর্তা জানান, মুন্তাছির রহমান যখনই ঘুষ আদায় করতে ব্যর্থ হতেন, তখনই ভ্রাম্যমাণ আদালত বসানোর জন্য পীড়াপীড়ি শুরু করতেন। বিষয়গুলো জানার পর প্রশাসন খুবই বিব্রত বোধ করে।
তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে মো. মুন্তাছির রহমান তা অস্বীকার করে জানান, ঝিনাইদহের ইটভাটা ও ক্লিনিক মালিকদের আনা অভিযোগ সম্পূর্ণ অসত্য ও ভিত্তিহীন। তিনি কারো কাছ থেকে ঘুষ নেননি। তবে যশোরের তেঁতুলতলা এলাকায় একটি আলিশান বাড়ি নির্মাণ করার কথা জানাতেই তিনি লাইন কেটে দেন।
ঝিনাইদহ অফিস