একসঙ্গে পথচলার প্রতিশ্রুতি ছিল। সুখ-দুঃখ ভাগ করে জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত পাশাপাশি থাকার স্বপ্নও ছিল। কিন্তু নিয়তির নির্মম পরিহাস- স্বামী বিদেশে মারা যাওয়ার মাত্র ৫৮ ঘণ্টার ব্যবধানে না ফেরার দেশে চলে গেলেন স্ত্রীও। স্বামীর মরদেহ দেশে ফেরার আগেই সম্পন্ন হলো স্ত্রীর দাফন। এমন হৃদয়বিদারক ঘটনায় দর্শনার শ্যামপুর গ্রামে নেমে এসেছে শোকের ছায়া। বাবা-মাকে হারিয়ে একসঙ্গে এতিম হয়ে পড়েছে তাদের দুই নাবালক সন্তান।
পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, দর্শনা থানার শ্যামপুর গ্রামের মৃত শওকত আলী মোল্লার ছেলে সফর উদ্দিন (৪০) জীবিকার তাগিদে সৌদি আরবের আভা শহরে থাকতেন। গত ১০ আগস্ট সেখানে কর্মরত অবস্থায় ব্রেইন স্ট্রোকে আক্রান্ত হন তিনি। দীর্ঘ নয় দিন মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করে গত ১৮ আগস্ট ভোর ৫টার দিকে স্থানীয় একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান সফর উদ্দিন। সফর উদ্দিন দর্শনা পৌর বিএনপির সমন্বয়ক, সাবেক প্যানেল মেয়র ও সাংবাদিক শরীফ উদ্দিনের ভাই।
এদিকে, স্বামীর অসুস্থতার খবর পাওয়ার পর থেকেই মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন তাঁর স্ত্রী রাখি রাশিদুন নাহার ওরফে ববিতা খাতুন (৩৫)। পরিবারের সদস্যদের ভাষ্য, স্বামীর স্ট্রোকে আক্রান্ত হওয়ার খবর পাওয়ার দিনই তিনি গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েন এবং পরে ব্রেইন স্ট্রোকে আক্রান্ত হন। আশঙ্কাজনক অবস্থায় তাঁকে ঢাকার ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব নিউরোসায়েন্সেস হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।
সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় গত বৃহস্পতিবার বেলঅ সোয়া ৩টার দিকে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান ববিতা খাতুন। তাঁর মৃত্যুর পর স্বামী-স্ত্রীর শেষ ঠিকানা যেন আরও কাছাকাছি চলে আসে- তবে পাশাপাশি নয়, একে অন্যের শেষ বিদায়ের আগেই। ববিতা খাতুন দর্শনা থানা মহিলা জামায়াতের সভানেত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন বলে পরিবার ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে।
গতকাল শুক্রবার সকাল ১০টায় দর্শনা শ্যামপুর কবরস্থানে ববিতা খাতুনের দাফন সম্পন্ন হয়। তখনও সৌদি আরব থেকে দেশে ফেরেনি স্বামী সফর উদ্দিনের মরদেহ। ফলে স্বামীর দাফনের আগেই স্ত্রীর দাফন সম্পন্ন করার বেদনাবিধুর পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয় পরিবারকে। এই দম্পতির এক পুত্র ও এক কন্যা সন্তান রয়েছে। অল্প সময়ের ব্যবধানে বাবা-মা দুজনকেই হারিয়ে তারা এখন সম্পূর্ণ এতিম।
এদিকে ববিতা খাতুনের মৃত্যুর খবর পেয়ে চুয়াডাঙ্গা-২ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য ও জেলা জামায়াতের আমির মো. রুহুল আমিন এবং চুয়াডাঙ্গা-১ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট মাসুদ পারভেজ রাসেল ঢাকার হাসপাতালে পৌঁছে পরিবারের পাশে দাঁড়ান এবং সার্বিক পরিস্থিতি তদারকি করেন। অন্যদিকে সফর উদ্দিনের মরদেহ দ্রুত সৌদি আরব থেকে দেশে ফিরিয়ে আনতে পরিবারের পক্ষ থেকে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করা হচ্ছে। পাশাপাশি জামায়াতের পক্ষ থেকেও মরদেহ দেশে ফেরাতে প্রশাসনিক সহযোগিতার চেষ্টা চলছে।
একদিকে প্রবাসী স্বামীর মরদেহ দেশে ফেরার অপেক্ষা, অন্যদিকে তার আগেই স্ত্রীর জানাজা ও দাফন- স্বল্প সময়ের ব্যবধানে একটি পরিবারের ওপর নেমে আসা এই শোক যেন কোনোভাবেই মেনে নিতে পারছেন না স্বজন ও প্রতিবেশীরা। দুই সন্তানের চোখে এখন বাবা-মায়ের স্মৃতি, আর পরিবারের সদস্যদের মনে রয়ে গেছে একসঙ্গে হারিয়ে ফেলার গভীর শূন্যতা।
দর্শনা অফিস