দেশের অর্থনীতির প্রতিটি স্তরে সরাসরি প্রভাব ফেলতে শুরু করেছে উদ্ভূত জ্বালানি সংকট। ফলে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের পাশাপাশি জীবনরক্ষাকারী ওষুধের সরবরাহও ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। জ্বালানি তেলের অভাবে অনেক প্রতিষ্ঠান তাদের সব যানবাহন রাস্তায় নামাতে পারছে না, ফলে উৎপাদন থেকে বাজারজাত- সব পর্যায়ে সমস্যা তৈরি হচ্ছে। ব্যবসায়ীরা বলছেন, দ্রুত জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক না হলে পরিস্থিতি ভয়াবহ আকার ধারণ করতে পারে। যা দেশের অর্থনীতিতে বড় চ্যালেঞ্জ তৈরি করবে। দেশের বড় শিল্পগোষ্ঠীগুলোর মধ্যে প্রাণ-আরএফএল গ্রুপ ইতোমধ্যে বড় ধরনের সমস্যার মুখে পড়েছে। তাদের প্রায় সাড়ে তিন হাজার ট্রাকের মধ্যে ২০ থেকে ৩০ শতাংশ বর্তমানে অচল পড়ে আছে। ডিপো থেকে পর্যাপ্ত তেল না পাওয়ায় তারা চাহিদা অনুযায়ী পণ্য সরবরাহ করতে পারছে না। একই ধরনের পরিস্থিতি দেখা যাচ্ছে এসিআই গ্রুপেও, যেখানে পণ্য সরবরাহ প্রায় ১০ শতাংশ কমে গেছে। শুধু নিজস্ব পরিবহন নয়, ভাড়ায় ট্রাক পাওয়াও এখন কঠিন হয়ে উঠেছে। ভোজ্যতেল খাতেও এর প্রভাব স্পষ্ট।
উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর সংগঠন জানিয়েছে, তারা নিজেদের পরিবহনের অর্ধেক ব্যবহার করতে পারছে না এবং ভাড়া গাড়ির সংকটও প্রকট। এতে বাজারে সয়াবিন তেলের সরবরাহ ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। একইভাবে ওষুধ শিল্পেও গভীর উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। কারখানা থেকে গুদাম, ডিপো হয়ে খুচরা পর্যায়ে ওষুধ পৌঁছাতে যে জ্বালানি প্রয়োজন, তা না পাওয়ায় ট্রাকগুলোকে দীর্ঘ সময় লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে হচ্ছে। শিল্প সমিতির নেতারা সতর্ক করেছেন, এ অবস্থা চলতে থাকলে জীবনরক্ষাকারী ওষুধের সরবরাহ মারাত্মকভাবে ব্যাহত হতে পারে। শিল্প উৎপাদন খাতেও সংকট তীব্র হচ্ছে। বিশেষ করে তৈরি পোশাক খাতে ডিজেলচালিত জেনারেটর ও বয়লার চালাতে সমস্যা দেখা দিয়েছে। লোডশেডিংয়ের সময় পর্যাপ্ত ডিজেল না থাকায় উৎপাদন বন্ধ রাখতে হচ্ছে। ঈদের আগে উৎপাদনের চাপ থাকায় এ পরিস্থিতি আরও উদ্বেগজনক হয়ে উঠেছে বলে জানিয়েছেন শিল্প মালিকরা। পরিবহন খরচও বেড়ে গেছে উল্লেখযোগ্যভাবে। জ্বালানি সংকটের প্রভাবে ট্রাকভাড়া ৫ থেকে ৬ হাজার টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। চট্টগ্রাম রুটে যেখানে আগে ২৫ হাজার টাকা লাগত, এখন সেখানে ৩০-৩১ হাজার টাকা গুনতে হচ্ছে। ঢাকা রুটেও ভাড়া বেড়েছে কয়েক হাজার টাকা। এতে ব্যবসায়ীরা চাপে পড়েছেন এবং এ অতিরিক্ত ব্যয় শেষ পর্যন্ত পণ্যের দামে গিয়ে পড়বে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা। যদিও কিছু পরিবহন মালিকের দাবি, ডিজেলের প্রকৃত সংকট তেমন নেই, বরং সরবরাহে অনিয়মের কারণে এ পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।
এদিকে, গ্যাস সংকটের কারণে শিল্প উৎপাদনে আরও বড় ধাক্কা এসেছে। সিলেটের ফেঞ্চুগঞ্জে অবস্থিত শাহজালাল ফার্টিলাইজার কোম্পানি লিমিটেড এক মাসের জন্য বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। সরকার গ্যাস সরবরাহে রেশনিং চালু করায় এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। যদিও কর্তৃপক্ষ বলছে, পর্যাপ্ত সার মজুত থাকায় আপাতত কৃষিতে তেমন প্রভাব পড়বে না, তবে দীর্ঘমেয়াদে এর প্রভাব পড়তে পারে। ভোলার বিসিক শিল্পনগরীতেও একই ধরনের সংকট দেখা দিয়েছে। জ্বালানি তেল না পাওয়ায় দুটি উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান বন্ধ হওয়ার পথে রয়েছে। এতে প্রায় দুই শতাধিক শ্রমিকের কর্মসংস্থান ঝুঁকির মুখে পড়েছে। প্রতিষ্ঠান মালিকরা জানিয়েছেন, দ্রুত জ্বালানি সরবরাহ না পেলে উৎপাদন সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে যাবে।
সামগ্রিক পরিস্থিতি নিয়ে সরকারও উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। খোদ অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী জানিয়েছেন, এ মুহূর্তে উত্তরণের লক্ষ্যে পৌঁছানোর মতো পূর্ণ প্রস্তুতি বাংলাদেশের নেই। গতকাল রোববার শেরেবাংলা নগরের এনইসি সম্মেলন কক্ষে আয়োজিত সভা শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি এসব কথা বলেন। দেশের উত্তরণ প্রস্তুতি পর্যালোচনার লক্ষ্যে জাতিসংঘের সংস্থার একটি স্বতন্ত্র মূল্যায়নের মূল বিষয়গুলো এ সভায় উপস্থাপন করা হয়। মন্ত্রী বলেন, বৈদেশিক ঋণ ও অভ্যন্তরীণ দেনার চাপ, উচ্চ সুদের হারে ঋণ গ্রহণের ঝুঁকি এবং সামগ্রিক আর্থিক ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা দেশের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বর্তমান পরিস্থিতিকে ‘প্রতিদিনের সংকট মোকাবিলা’ হিসেবে বর্ণনা করে তিনি বলেন, দেশের অর্থনীতির প্রায় সব সূচকই এখন নিম্নমুখী। সরকার এখন অর্থনীতিকে পুনরুদ্ধারের আপ্রাণ চেষ্টা করছে।
জ্বালানি সংকট ও বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থার বিঘ্ন দেশের অর্থনীতিতে দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলতে পারে বলেও এ সময় আশঙ্কা প্রকাশ করেন আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী। তিনি উল্লেখ করেন, জ্বালানির প্রভাব খাদ্যসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাজারে পড়বে। এর ফলে মূল্যস্ফীতি আরও বেড়ে যাওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। বিশ্ববাজারে জ্বালানির দাম বাড়লেও বাংলাদেশ তা নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করছে, তবে দীর্ঘদিন এ চাপ সরকারের পক্ষে বহন করা সম্ভব নয়। মন্ত্রী বলেন, সরকার জনগণের ওপর হঠাৎ অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করতে চায় না। কিন্তু সরকারি তহবিল থেকে ধারাবাহিক ব্যয় চলতে থাকলে শেষ পর্যন্ত এর প্রভাব জনগণের ওপরই পড়বে। তাই অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত নিতে হচ্ছে। বর্তমান নাজুক পরিস্থিতি বিবেচনায় উত্তরণ প্রক্রিয়া কিছুটা সময় পিছিয়ে দেওয়ার সুযোগ রয়েছে বলে জানান মন্ত্রী।
তিনি বলেন, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে প্রয়োজনীয় সংস্কার বাস্তবায়ন করা গেলে ভবিষ্যতে উত্তরণ একটি বাস্তবসম্মত লক্ষ্য হয়ে উঠবে। এ অন্তর্বর্তী সময়ে দেশের অর্থনীতির মৌলিক সূচকগুলো শক্তিশালী করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। সংকট উত্তরণে সক্ষমতা বৃদ্ধিকে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বলে উল্লেখ করেন অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী। তিনি বলেন, প্রয়োজনীয় সংস্কার ও দক্ষতা উন্নয়নের মাধ্যমে অর্থনীতিকে একটি শক্ত ভিত্তির ওপর দাঁড় করানোর জন্য নির্দিষ্ট নীতিমালার আলোকে কাজ চলছে।
সমীকরণ প্রতিবেদন