প্রস্তুতি চূড়ান্ত। আজ বেলা ১১টায় শুরু হচ্ছে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের নতুন অভিযাত্রা। দ্বাদশ জাতীয় সংসদ ভেঙে দেওয়ার ১৭ মাস পর নতুন সংসদের সামনে রয়েছে বহুমুখী চ্যালেঞ্জ। চলছে ঐতিহাসিক নানা উদ্যোগ বাস্তবায়নের প্রস্তুতি। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের নেতা ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে ২০০৬ সালের পর এবার আবার সরকারি দলের আসনগুলোতে বসছে ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে নিরঙ্কুশ জয় পাওয়া বিএনপি। এছাড়া এবারই প্রথম সংসদের বিরোধী দলের আসনে বসছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। সংসদ সচিবালয় জানিয়েছে, চিরাচরিত রেওয়াজের বাইরে গিয়ে অনেকটা ব্যতিক্রমভাবে শুরু হবে আজকের অধিবেশন। স্পিকারের চেয়ার থাকবে শূন্য। অন্যদিকে এমপিদের আসন থাকবে প্রায় ভরা। সংসদ নেতা ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান স্বাগত বক্তব্য রাখবেন। যেহেতু স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার চূড়ান্ত হয়নি। সে জন্য কে সভাপতিত্ব করবেন, বিধি মোতাবেক তিনি উপস্থাপন করবেন, আহ্বান করবেন একজন প্রবীণ সংসদ সদস্যকে সভাপতিত্ব করার জন্য। সেই প্রস্তাব সমর্থন করবেন আরেক সংসদ সদস্য। অতঃপর তাঁর সভাপতিত্বেই স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার নির্বাচন করা হবে। তারপর সংসদের বিধি মোতাবেক রাষ্ট্রপতি স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকারকে শপথ পড়াবেন। এরপর আবার অধিবেশন বসবে।
সেই অধিবেশনের শুরুতে সভাপতিমণ্ডলীর প্যানেল চূড়ান্ত করা হবে। তারপর শোক প্রস্তাব ও এর ওপর আলোচনা হবে। ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে বিএনপি মোট ২০৯টি আসনে জয়লাভ করেছে। এবার তারাই সরকারি দল। আর প্রধান বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামী এককভাবে ৬৮ আসনে ও তাদের জোটভুক্ত জুলাই গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী নতুন দল জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) ৬টি আসনে, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস ২টি আসনে ও খেলাফত মজলিস একটি আসনে বিজয়ী হয়ে মোট ৭৭ জন এমপি নিয়ে সংসদে বসছে। বিরোধী দল হিসেবে সংসদে তাদের ভূমিকাও হবে নতুন চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার। গতকাল সংসদ সচিবালয়ে সরকার ও বিরোধীদলীয় এমপিরা প্রথমবারের মতো সংসদীয় দলের বৈঠক করেন। সেখানে দুই দলের শীর্ষ নেতার পক্ষ থেকে সংসদে দলীয় অবস্থান ও এমপিদের কী ধরনের ভূমিকা থাকবে সেই পৃথক নির্দেশনা দেওয়া হয়। তবে ওই বৈঠকে চলতি সংসদে কে হচ্ছেন স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার, কে হচ্ছেন সরকারদলীয় উপনেতা-তা খোলাসা হয়নি। সরকারি দল এ বিষয়ে সংসদ নেতা ও প্রধানমন্ত্রীর ওপর পূর্ণ আস্থা সমর্পণ করেছে। এসব পদে বিক্ষিপ্তভাবে নানাজনের নাম শোনা গেলেও দলীয়ভাবে কারও নামই আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করা হয়নি।
তবে সব জল্পনাকল্পনার অবসান হবে আজ। প্রথম অধিবেশনের প্রথম দিনই এসব পদে কারা বসছেন তা চূড়ান্ত করা হবে। জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়ন অনুযায়ী বিরোধী দলের পক্ষ থেকে ডেপুটি স্পিকার নিয়োগ দেওয়া হবে-এমন বিধান রয়েছে। বিএনপির পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে জামায়াতকে ডেপুটি স্পিকারের জন্য অনুরোধও জানানো হয়। কিন্তু এ প্রস্তাবে সরাসরি রাজি হয়নি দলটি। গতকাল সংসদীয় দলের বৈঠক শেষে জামায়াতে ইসলামীর আমির ও বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান বলেছেন, ‘আমরা চাই জুলাই সংস্কারের প্রস্তাব পুরোপুরি বাস্তবায়ন হোক। তার আলোকে বিরোধী দল যতটুকু পাবে, ততটুকুই চাই। সেখানে ডেপুটি স্পিকারের বিষয়টি রয়েছে।’
এদিকে সরকারদলীয় এমপিদের বৈঠক শেষে সংবাদ সম্মেলনে চিফ হুইপ নুরুল ইসলাম বলেন, স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার পদে প্রার্থী চূড়ান্ত করার ভার সংসদ নেতা ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ওপর ছেড়ে দিয়েছে বিএনপির সংসদীয় দল। অন্তর্বর্তী সরকারের সময় জারি করা ১৩৩টি অধ্যাদেশ সংসদে উপস্থাপন করা হবে। এগুলো যাচাইবাছাই করার জন্য সংসদের বৈঠকে একটি বিশেষ কমিটি গঠন করা হবে। সে কমিটিতে সরকারি দলের পাশাপাশি বিরোধী দলের সদস্যরাও থাকবেন। এক প্রশ্নের জবাবে চিফ হুইপ বলেন, প্রধানমন্ত্রী অত্যন্ত উদারতা দেখিয়ে বিরোধী দলকে ডেপুটি স্পিকার পদ দেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছিলেন। কিন্তু এ বিষয়ে তাঁরা কোনো ‘পজেটিভ রেসপন্স’ পাননি। পেলে সে অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তিনি বলেন, আলোচনার মাধ্যমে দেশের সব সমস্যার সমাধান করতে চাই। দেশের মানুষের জীবনমান উন্নয়ন করাই আমাদের প্রধান লক্ষ্য। আমরা চাই বিরোধী দল সংসদে গঠনমূলক ভূমিকা পালন করুক। তাদের যেকোনো যৌক্তিক সমালোচনা ও সহযোগিতাকে আমরা স্বাগত জানাব। সংবাদ সম্মেলনে সরকারি দলের ছয় হুইপ উপস্থিত ছিলেন।
অন্যদিকে সংসদের প্রথম অধিবেশনে ঐতিহাসিক কিছু সিদ্ধান্ত হবে বলে জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। তিনি বলেন, জাতীয় সংসদের এই অধিবেশন জাতীয় জীবনে খুবই গুরুত্বপূর্ণ এবং ঐতিহাসিক। দীর্ঘ ১৬-১৭ বছরের রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের মধ্যদিয়ে গণতান্ত্রিক উত্তরণে আমরা উপনীত হয়েছি। দীর্ঘ ১৭ বছরের প্রবাসজীবন কাটিয়ে রাজসিক প্রত্যাবর্তনের পর তিনবারের সাবেক সফল প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারপারসন মা বেগম খালেদা জিয়ার মৃত্যুর পর দলের হাল ধরেন তারেক রহমান। বিএনপি চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়ে নতুন প্রজন্মকে ঐক্যবদ্ধ করে বিপুল ভোটে দলকে নির্বাচনি বৈতরণি পার করিয়ে হয়েছেন দেশের প্রধানমন্ত্রী ও সংসদ নেতা। নির্বাচনের শুরু থেকে সরকার গঠন পর্যন্ত দৃঢ়ভাবে দলের নেতৃত্ব দিচ্ছেন তিনি। প্রথমবার এমপি হয়ে সংসদ নেতার গুরুদায়িত্ব এখন তাঁর কাঁধে। অন্যদিকে বিরোধীদলীয় নেতা জামায়াত আমির নিজেও এবার প্রথমবার এমপি হিসেবে জয়লাভ করে পেয়েছেন বিরোধী দলের প্রধানের গুরুদায়িত্ব। শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠান থেকেই শুরু হয়ে গেছে সরকারি দল ও বিরোধী দলের দ্বন্দ্ব। সংবিধান সংস্কার পরিষদ সদস্য হিসেবে শপথ না নেওয়ায় বিরোধী দলের তীব্র সমালোচনার মুখে বসছে সংসদ। এর ধারাবাহিকতা সংসদের প্রথম অধিবেশনে চ্যালেঞ্জ হিসেবে আবির্ভূত হতে পারে। অন্তর্বর্তী সরকারের অধ্যাদেশগুলো হবে অন্যতম চ্যালেঞ্জ। এছাড়া দুই দলের সামনে জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়নের অগ্রাধিকার বড় চ্যালেঞ্জ।
সংসদের রেওয়াজ অনুযায়ী প্রথম দিনই রাষ্ট্রপতির ভাষণ দেওয়া নিয়ে চলছে বিতর্ক। মন্তব্য-পাল্টা মন্তব্য। সরকারি দলের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে- প্রথম দিন সংসদের সব কার্যক্রমের সঙ্গে রাষ্ট্রপতি জাতীয় সংসদে ভাষণ দেবেন। এ নিয়ে তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে প্রধান বিরোধী দল জামায়াত। দলটির নায়েবে আমির ডা. সৈয়দ আবদুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের বলেছেন, রাষ্ট্রপতি ফ্যাসিস্টের দোসর, সংসদে তাঁর বক্তব্য দেওয়ার অধিকার নেই। সংসদ সচিবালয় জানায়, ত্রয়োদশ সংসদের প্রথম অধিবেশনের শোক প্রস্তাবে গুরুত্ব পাচ্ছেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বিরোধীদলীয় নেতা বেগম খালেদা জিয়া এবং চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের শহীদরা। তাঁদের ত্যাগ ও অবদান নিয়ে সংসদে বিস্তারিত আলোচনা শেষে শোক প্রস্তাব গ্রহণ করা হবে।
এছাড়া আইনমন্ত্রী ১৩৩টি অধ্যাদেশ উপস্থাপনের পর রাষ্ট্রপতির ভাষণ হবে। তাঁর আগে সংসদের বিজনেস অ্যাডভাইজারি কমিটিসহ আরও কয়েকটি কমিটি হবে। রাষ্ট্রপতির ভাষণের পর অধিবেশন মুলতবি হবে। ১৫ মার্চ সংসদের মুলতবি বৈঠকে রাষ্ট্রপতির ভাষণের ওপর ধন্যবাদ প্রস্তাব উত্থাপন ও আলোচনা শুরু হবে। এরপর আসন্ন ঈদুল ফিতর উপলক্ষে অধিবেশন ১৩ দিনের জন্য মুলতবি রাখা হতে পারে। ঈদের ছুটি শেষে ২৯ মার্চ পুনরায় সংসদের কার্যক্রম শুরু হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
এদিকে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ অধিবেশনকে ঘিরে সংসদ ভবনকে সাজিয়ে তোলা হয়েছে। তৈরি করা হয়েছে কয়েক স্তরের নিরাপত্তাবেষ্টনী। জাতীয় সংসদ ভবন ও আশপাশের বিস্তীর্ণ এলাকায় সব ধরনের অস্ত্র বহন ও সমাবেশের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি)। ২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থানে ব্যাপক ক্ষয়-ক্ষতির শিকার হয় জাতীয় সংসদ ভবন। ভাঙচুর আর লুটপাটের ঘটনা ঘটে। কয়েক ঘণ্টার তা বে ৫০০ কোটি টাকার বেশি ক্ষতি হয় লুই আই কানের তৈরি সংসদ ভবনের। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের অধিবেশন কেন্দ্র করে দ্রুতগতিতে মেরামতের কাজে হাত দেয় অন্তর্বর্তী সরকার। ভবনের ভেতরে থাকা গুরুত্বর্পূর্ণ ব্যক্তিদের অফিস কক্ষের পাশাপাশি অধিবেশন কক্ষকে আগের অবস্থায় ফিরিয়ে আনা হয়। এর আগে দ্বাদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশন অনুষ্ঠিত হয় ২০২৪ সালের ৩০ জানুয়ারি। ওই বছরের ৯ জানুয়ারি এমপিরা শপথ গ্রহণ করেন। ১১ জানুয়ারি মন্ত্রীরা শপথ নেন। তবে জুলাই গণঅভ্যুত্থানে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দেশত্যাগের পর রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন ৬ আগস্ট সংসদ ভেঙে দেন।
সমীকরণ প্রতিবেদন