নতুন মোড় নিয়েছে ইরান যুদ্ধ। সামরিক অবকাঠামোর পর এবার তেল স্থাপনায় হামলা শুরু করেছে দুই দেশ। একে অপরের তেল স্থাপনায় হামলার কারণে বিশ্বে জ্বালানি সংকট বাড়বে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। হামলা হয়েছে কুয়েতের বিমানবন্দরের জ্বালানি ট্যাঙ্কেও। কুয়েত ইতিমধ্যে তেল উৎপাদন কমানোর ঘোষণা দিয়েছে। তেল স্থাপনায় হামলার কারণে ইরানের আকাশ ধোঁয়ায় ঢেকে গেছে। এদিকে গতকাল মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন সামরিক ঘাঁটিতে হামলা চালিয়েছে তেহরান। যুদ্ধ বন্ধের দাবিতে যুক্তরাষ্ট্র জুড়ে বিক্ষোভ হয়েছে।
ইরানের তেল ডিপোতে হামলা:
বার্তা সংস্থা রয়টার্স জানিয়েছে, ইসরাইল জানিয়েছে, তেহরানের একাধিক তেল শোধনাগারে হামলা চালানো হয়েছে। তেহরান ও আলবোর্জ প্রদেশের চারটি তেল ডিপো এবং একটি পেট্রোলিয়াম পণ্য পরিবহন কেন্দ্র ধ্বংস করে দেওয়া হয়। বিবিসি জানায়, শনিবার সন্ধ্যায় ইসরাইলের যুদ্ধবিমান তেহরানের পশ্চিমে শাহরান ও কুহাক এলাকা এবং কারাজ শহরের তিনটি তেল ডিপোতে হামলা চালায়। রাতভর তীব্র হামলার জেরে জ্বালানি সরবরাহে বিঘ্ন ঘটার তথ্য জানিয়ে তেহরানের গভর্নর মোহাম্মদ সাদেঘ মোটামেদিয়ান বলেন, তেলের সংরক্ষণ ট্যাঙ্কগুলোতে হামলার পর জ্বালানি বিতরণ ব্যবস্থায় সমস্যা দেখা দিয়েছে। তবে তিনি বলেছেন, সমস্যা ধীরে ধীরে মেটানো হচ্ছে। আলবোর্জের কারাজ শহরে ফারদিস তেল ডিপোতে হামলায় অন্তত ছয় জনের মৃত্যু হয়েছে। হামলার পর তেল ডিপোর কাছে রাস্তা যেন আগুনের নদীতে পরিণত হয়। আকাশে কালো মেঘ সৃষ্টি হয়। রেড ক্রিসেন্ট জানিয়েছে, ইরানে এসিড বৃষ্টি হতে পারে। মার্কিন জ্বালানি মন্ত্রী ক্রিস রাইট জানিয়েছেন, ইরানের তেল স্থাপনায় হামলার কোনো পরিকল্পনা যুক্তরাষ্ট্রের নেই। এদিকে ইসরাইলি হামলায় লেবাননে নিহতের সংখ্যা বেড়ে ৩৯৪ জনে দাঁড়িয়েছে। নিহতদের মধ্যে ৮৩টি শিশু। ইসরাইলি সেনাবাহিনী জানিয়েছে শনিবার দক্ষিণ লেবাননে এক যুদ্ধে দুই সৈন্য নিহত এবং একজন অফিসার আহত হয়েছেন।
ইসরাইলের তেল শোধানাগারে পাল্টা হামলা:
ইসরাইলের সবচেয়ে বড় তেল শোধানাগার হাইফাতে বড় হামলা চালিয়েছে ইরান। শনিবার রাতে ভূমধ্যসাগরের তীরের এই বন্দর শহরে আছড়ে পড়ে একের পর এক ক্ষেপণাস্ত্র। তছনছ হয়ে যায় তেল শোধনাগার। এখান থেকেই ইসরাইলে ৫০ থেকে ৬০ শতাংশ তেল সরবরাহ করা হয়। ফলে এই হামলায় ইসরাইলের আর্থিক ও প্রতিরক্ষা ক্ষেত্রে বড় ক্ষতির আশঙ্কা করছেন ইসরাইলি বিশেষজ্ঞরা। কারণ, হাইফা তেল শোধনাগার কমপ্লেক্স উপসাগরীয় এলাকার সবচেয়ে বড় শিল্পাঞ্চল। জ্বালানির পাশাপাশি প্লাস্টিকের কাঁচামাল, রাসায়নিক ও অন্যান্য পেট্রোকেমিক্যাল পণ্যও তৈরি হয়। দৈনিক প্রায় ১ লাখ ৯ হাজার ব্যারেল অপরিশোধিত তেল শোধনের ক্ষমতা রয়েছে এই শোধনাগারের। হাইফা তেল শোধনাগারে হামলার কিছু ভিডিও পোস্ট করেছে তেহরান টাইমস। গত কয়েক দিনে ইরানের বেশ কয়েকটি তেল শোধনাগারে হামলা চালিয়েছিল ইসরাইল। তারই পালটা জবাব বলে জানিয়েছে ইসলামিক রেভেলিউশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি)।
তেল উৎপাদন কমানোর ঘোষণা কুয়েতের:
ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলার পর তেল উৎপাদন কমানোর কথা জানাল কুয়েত। ক্রমাগত ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলার জেরে কুয়েত সতর্কতামূলক ব্যবস্থা হিসেবে তেল উৎপাদন কমানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে। কুয়েতের জাতীয় তেল সংস্থা জানিয়েছে, সামপ্রতিক হামলার প্রেক্ষিতে সতর্কতামূলকভাবে অপরিশোধিত তেলের উৎপাদন কমানো হচ্ছে। কুয়েতের সেনাবাহিনী জানিয়েছে, সামপ্রতিক হামলায় দেশের একটি গুরুত্বপূর্ণ সরকারি ভবনও লক্ষ্যবস্তু হয়েছিল। কুয়েত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের জ্বালানি ট্যাঙ্কগুলোয় ড্রোন হামলা চালানো হয়েছে। হামলায় পাবলিক ইনস্টিটিউশন ফর সোশ্যাল সিকিউরিটির প্রধান ভবনে ক্ষয়-ক্ষতি হয়েছে। অন্যদিকে বাহরাইনের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, একটি ইরানি ড্রোন হামলায় একটি পানি পরিশোধন কেন্দ্র ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সংযুক্ত আরব আমিরাত কয়েক দফায় ইরান থেকে আসন্ন ক্ষেপণাস্ত্র এবং ড্রোন ঠেকানোর কথা জানিয়েছে। কিন্তু ঠেকানো অস্ত্রের টুকরা ভূপাতিত হয়ে দুবাইয়ের বাসিন্দা নিহত হয়েছেন। রাজধানী রিয়াদের কূটনৈতিক এলাকা লক্ষ্য করে ড্রোন হামলার পরিকল্পনা ভেস্তে দিয়েছে সৌদি আরব।
কুর্দিরা জড়িত হোক চান না ট্রাম্প:
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প বলেছেন কুর্দিরা সরাসরি যুদ্ধে জড়িত হোক সেটি তিনি চান না। তিনি সাংবাদিকদের বলেছেন, আমরা চাই না যুদ্ধটা যতটা জটিল, তার চেয়ে আরো জটিল হয়ে উঠুক। আমি চাই না কুর্দিরা আহত বা নিহত হোক। আমাদের তাদের সঙ্গে ভালো সম্পর্ক আছে। তারা যুদ্ধে নামতে প্রস্তুত, কিন্তু আমি তাদের বলেছি- আমি চাই না তারা এতে জড়াক। এর আগে রয়টার্স জানিয়েছিল, বৃহস্পতিবার ট্রাম্প তাদের বলেছিলেন যে ইরানি কুর্দি যোদ্ধারা যদি অভিযান চালায়, তবে তিনি পুরোপুরি সমর্থন করবেন। ট্রাম্প বলেছেন, তিনি ইরানের জন্য এমন প্রেসিডেন্ট বেছে নিতে চান, যিনি দেশটিকে যুদ্ধে নিয়ে যাবে না। সোশ্যাল মিডিয়া পোস্টে ট্রাম্প লেখেন, তিনি যুক্তরাজ্যের সহায়তার প্রস্তাবকে স্বাগত জানাচ্ছেন। তবে এই মুহূর্তে যুক্তরাজ্যের বিমানবাহী রণতরি ব্যবহারের পরিকল্পনা নেই।
যুক্তরাষ্ট্র জুড়ে যুদ্ধবিরোধী বিক্ষোভ:
ইরানে হামলার প্রতিবাদে গতকাল যুক্তরাষ্ট্র জুড়ে বিক্ষোভ হয়েছে। হোয়াইট হাউজের বাইরে একদল বিক্ষোভকারী ইরানে হামলা বন্ধের আহ্বান জানান। তারা অতীতের ইরাক যুদ্ধকে স্মরণ করতে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প প্রশাসনকে সতর্ক করেন। এছাড়া সানফ্রান্সিসকো, লস অ্যাঞ্জেলসে বিক্ষোভ হয়। মেক্সিকো সিটিতে মার্কিন কনস্যুলেটের বাইরে বিক্ষোভের আয়োজন করা হয়।
বাড়তে পারে জ্বালানি সংঘাত:
পরিস্থিতি আরো জটিল হতে পারে বলে শিগিগরই। ইরান ইতিমধ্যে উপসাগরীয় অঞ্চলের কয়েকটি জ্বালানি স্থাপনায় পালটা হামলা চালিয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে সৌদি আরামকোর রাস তানুরা কেন্দ্র এবং সংযুক্ত আরব আমিরাত ও কাতারের কিছু জ্বালানি ও ডেসালিনেশন প্ল্যান্ট। উত্তেজনা বাড়লে ইরান হরমুজ প্রণালী লক্ষ্য করেও বড় পদক্ষেপ করতে পারে। বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ তেল এই পথ দিয়েই পরিবাহিত হয়। তাই তখন সমস্যা বাড়তে পারে। দেখা দিতে পারে জ্বালানি সংকট।- বিবিসি, আল-জাজিরা ও সিএনএন
সমীকরণ প্রতিবেদন