রবিবার, ৯ অগাস্ট, ২০২৬
সর্বশেষ স্থানীয় সংবাদ জাতীয় রাজনীতি আর্ন্তজাতিক সারাদেশ অর্থনীতি খেলা বিনোদন আজকের পত্রিকা প্রযুক্তি চাকরি

বিদ্যুতে বড় বিপর্যয়, গ্রামাঞ্চলে হাহাকার

  • আপলোড তারিখঃ ২৩-০৪-২০২৬ ইং
বিদ্যুতে বড় বিপর্যয়, গ্রামাঞ্চলে হাহাকার

গরমের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে বিদ্যুতের লোডশেডিং। চাহিদার তুলনায় বিদ্যুতের উৎপাদন কম হওয়ায় ভোগান্তি বাড়ছে। শহরাঞ্চলে কিছুটা সহনীয় হলেও গ্রামে গড়ে ১২ থেকে ১৪ ঘণ্টা পর্যন্ত বিদ্যুৎ থাকছে না। এতে ভোগান্তির পাশাপাশি ব্যাহত হচ্ছে কৃষি উৎপাদন, শিল্প খাতেও পড়েছে নেতিবাচক প্রভাব। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, জ্বালানি সংকটের কারণে কমেছে বিদ্যুৎ উৎপাদন। গত কয়েক দিনে লোডশেডিং ২ হাজার মেগাওয়াট পর্যন্ত ছাড়িয়েছে। সাধারণত এপ্রিল থেকে জুন পর্যন্ত এই তিন মাস দেশে গরম বাড়ে। এতে বেড়ে যায় বিদ্যুতের চাহিদা। তবে এবার জ্বালানি সংকটসহ নানা কারণে বিদ্যুৎ পরিস্থিতি আরও খারাপের দিকে যাচ্ছে। মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের কারণে জ্বালানি সংকট তৈরি হওয়ার পর বিদ্যুৎ ও জ্বালানির সাশ্রয় রোধে অফিস সময় কমানো, শপিংমল দ্রুত বন্ধ করাসহ নানা প্রচেষ্টা শুরু করেছে সরকার। কিন্তু লোডশেডিং পরিস্থিতির মোটেও উন্নতি হয়নি। সংকট কাটাতে প্রচেষ্টা চালিয়ে যাওয়ার কথা জানিয়েছে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড। সংস্থাটি বলছে, জ্বালানি সংকটের পাশাপাশি যান্ত্রিক ত্রুটি ও রক্ষণাবেক্ষণের কারণে কয়েকটি বিদ্যুৎকেন্দ্রের উৎপাদন কমেছে। কয়লা সরবরাহ বাড়িয়ে এবং কেন্দ্রগুলোর রক্ষণাবেক্ষণ শেষে দ্রুতই পুরোদমে উৎপাদন শুরুর চেষ্টা করছে সরকার।


লোডশেডিংয়ে অন্ধকারে গ্রামাঞ্চল কয়েক বছর ধরেই গ্রীষ্ম মৌসুমে নিয়মিত লোডশেডিং হচ্ছে। আর বিদ্যুতের ঘাটতি পূরণে শুরুতেই সরবরাহ কমানো হয় গ্রামে। ঘাটতি বাড়তে থাকলে একপর্যায়ে শহরে কিছু লোডশেডিং করা হয়। তবে তা গ্রামের তুলনায় অনেক কম। দেশে বিদ্যুৎ উৎপাদন ও সরবরাহের মূল সংস্থা বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি)। তাদের নির্দেশনায় বিদ্যুৎ সঞ্চালন করে পাওয়ার গ্রিড পিএলসি বাংলাদেশ (পিজিসিবি)। আর ছয়টি বিতরণ সংস্থা গ্রাহকের কাছে বিদ্যুৎ দেয়, যার মধ্যে সবচেয়ে বড় পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ড (আরইবি)। আরইবির গ্রাহক ৩ কোটি ৭৭ লাখ। সারা দেশে ৮০টি সমিতির মাধ্যমে এসব গ্রাহককে বিদ্যুৎ বিতরণ করে আরইবি।


সংস্থাটির তথ্য বলছে, গত সোমবার তারা বেলা তিনটা, সন্ধ্যা সাতটা, রাত আটটা ও নয়টার সময় প্রতি ঘণ্টায় ২ হাজার মেগাওয়াটের বেশি লোডশেডিং করেছে। আরইবির তথ্য বলছে, গত সোমবার সন্ধ্যা ৭টায় তাদের চাহিদা ছিল ১০ হাজার ২৩৫ মেগাওয়াট, সরবরাহ পেয়েছে ৭ হাজার ৩৩৮ মেগাওয়াট। এর চেয়ে বেশি চাহিদা ছিল রাত ৮টায় ১০ হাজার ৪৪৭ মেগাওয়াট। ওই সময় সরবরাহ ঘাটতি ছিল ২ হাজার ৪১৪ মেগাওয়াট। পিডিবির নির্দেশনায় বিতরণ সংস্থার মধ্যে বিদ্যুৎ বিতরণের কাজটি করে পিজিসিবির এনএলডিসি (ন্যাশনাল লোড ডেসপাচ সেন্টার) বিভাগ। গত মঙ্গলবার বিদ্যুৎ সরবরাহের জন্য করা একটি পরিকল্পনায় দেখা যায়, ঢাকার দুই বিতরণ সংস্থা ডেসকো ও ডিপিডিসির জন্য কোনো লোডশেডিং রাখা হয়নি। তবে ঢাকার বাইরে বাকি ৫টি বিতরণ সংস্থার মধ্যে সমহারে লোডশেডিং দেওয়ার কথা বলা হয়েছে।


চট্টগ্রামে প্রতিদিন পাঁচ থেকে ছয়বার বিদ্যুৎ যায়। একেকবার আধা ঘণ্টা থেকে এক ঘণ্টা পর্যন্ত বিদ্যুৎ থাকে না। তবে শহরের বাইরে গ্রামাঞ্চলে পরিস্থিতি আরও খারাপ। লোহাগাড়া উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ইকবাল হোছাইন বলেন, লোডশেডিংয়ের কারণে স্বাস্থ্যসেবা কার্যক্রম স্বাভাবিক রাখা কঠিন হচ্ছে। চট্টগ্রাম পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি-১-এর জ্যেষ্ঠ মহাব্যবস্থাপক প্রকৌশলী নূর মোহাম্মদ বলেন, তাদের এলাকায় প্রতিদিন চাহিদার তুলনায় ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ কম সরবরাহ পাওয়া যাচ্ছে।


ঢাকার বাইরে দেশের বিভিন্ন গ্রাম এলাকায় খোঁজ নিয়ে প্রায় একই রকম চিত্র পাওয়া গেছে। সমিতিগুলো চাহিদার তুলনায় ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ সরবরাহ কম পাচ্ছে। কোথাও কোথাও এটি অনেক বেশি, তাই ৬ থেকে ৮ ঘণ্টা লোডশেডিং করতে হচ্ছে। এতে প্রচণ্ড গরমে ভুগছে মানুষ। রাতে থাকতে হচ্ছে অন্ধকারে। এসএসসি পরীক্ষার প্রস্তুতিতেও পিছিয়ে পড়ছে গ্রামের শিক্ষার্থীরা। সেচ ও গ্রামীণ অর্থনৈতিক কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে।


কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) জ্বালানি উপদেষ্টা অধ্যাপক এম শামসুল আলম বলেন, লোডশেডিংয়ের ক্ষেত্রে গ্রামীণ গ্রাহকরা চরম বৈষম্যের শিকার হচ্ছেন। তিনি বলেন, ‘লোডশেডিং এমনভাবে বণ্টন করা হয় যাতে বেশি চাহিদাসম্পন্ন শহরে ও বাণিজ্যিক এলাকাগুলোকে সচল রাখা যায়, আর গ্রামাঞ্চলের ফিডারগুলো দীর্ঘক্ষণ বন্ধ রাখা হয়। বিতরণ ব্যবস্থার ত্রুটির কারণে জাতীয় পর্যায়ে মাঝারি ধরনের ঘাটতি হলেও গ্রামে তা দীর্ঘস্থায়ী লোডশেডিংয়ে রূপ নেয়।’


ব্যাহত কৃষি, উদ্বিগ্ন কৃষক:
যুদ্ধের কারণে বেশ কিছুদিন ধরেই কৃষক চাহিদামতো ডিজেল পাচ্ছেন না। এর সঙ্গে লোডশেডিং বেড়ে যাওয়ায় চরম বিপাকে পড়েছেন তারা। ফসলের উৎপাদন ঠিকমতো হওয়া নিয়ে চরম দুশ্চিন্তা এখন তাদের। কৃষকরা জানান, ঘন ঘন বিদ্যুৎ বিভ্রাটের ফলে বিদ্যুৎচালিত সেচপাম্পগুলো ঠিকমতো চালানো যাচ্ছে না। কোনো কোনো এলাকায় দিনে সাত থেকে আট ঘণ্টা বিদ্যুৎ থাকছে না। খুলনার কৃষকরা জানান, যখন পাম্প চালানো প্রয়োজন, ঠিক তখনই বিদ্যুৎ থাকছে না। এভাবে সেচকাজ ব্যাহত হতে থাকলে শেষ পর্যন্ত ধান উৎপাদন কমে যাওয়ার বড় ধরনের ঝুঁকি রয়েছে।


শিল্পে উৎপাদন ব্যাহত:
ঘন ঘন বিদ্যুৎ বিভ্রাটের ফলে শিল্প উৎপাদন ও ব্যবসায়িক কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে। বিদ্যুতের এই চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে উৎপাদন সচল রাখতে হিমশিম খাচ্ছে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান। নিট পোশাক শিল্প মালিকদের সংগঠন বিকেএমইএর সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, পাম্প থেকে চাহিদামতো ডিজেল কিনতে পারছে না অনেক কারখানার মালিক। জ্বালানি তেলের অভাবে কারখানার নিজস্ব যানবাহনগুলো চলতে পারছে না। আবার ঠিকমতো বিদ্যুৎও থাকছে না। সব মিলে কঠিন সংকটে পড়েছে কারখানার মালিকরা। সময়মতো পণ্য পাঠাতে না পারলে বিদেশি ক্রেতারা অর্ডার বাতিল করতে পারেন। পোশাক খাত ক্ষতিগ্রস্ত হলে দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি চাপের মুখে পড়বে। পোশাক খাতের মতো টেক্সটাইল, চামড়া, ওষুধ, প্লাস্টিক, কৃষি প্রক্রিয়াজাতকরণ, টাইলস, স্টিল ও সিমেন্ট শিল্পও এখন চরম সংকটের মধ্যে রয়েছে। বিদ্যুৎ খাতের কর্মকর্তারা জানান, জ্বালানি সংকটের কারণে দেশের ১৪৩টি বিদ্যুৎকেন্দ্রের মধ্যে অন্তত ৭১টি হয় অচল হয়ে আছে, নয়তো সক্ষমতার চেয়ে অনেক কম উৎপাদন করছে। অকেজো বা ধুকতে থাকা এই কেন্দ্রগুলোর মধ্যে ৪৫টি ফার্নেস অয়েলচালিত, ২৩টি গ্যাসচালিত এবং তিনটি কয়লাভিত্তিক।


পিডিবির একটি অভ্যন্তরীণ বিশ্লেষণে বলা হয়েছে যে, গ্রীষ্মের পিক-আওয়ারে ১৮ হাজার ৫০০ মেগাওয়াট প্রাক্কলিত চাহিদা মেটাতে বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো চালানোর জন্য প্রতিদিন অন্তত এক হাজার ২০০ মিলিয়ন ঘনফুট (এমএমসিএফডি) গ্যাসের প্রয়োজন। কয়লা ও ফার্নেস অয়েলচালিত কেন্দ্রগুলো থেকে যদি লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী বিদ্যুৎ উৎপাদিত হয়, তবেই পিডিবির গ্যাসের চাহিদা এই পর্যায়ে থাকবে। এদিকে এ সংকটের মধ্যে ভারতীয় কোম্পানি আদানির বিদ্যুৎকেন্দ্রের একটি ইউনিট কারিগরি কারণে বন্ধ হয়ে গেছে। এতে লোডশেডিং আরও বেড়েছে।


পিডিবি ও আদানির দায়িত্বশীল সূত্র জানিয়েছে, গত মঙ্গলবার মধ্যরাতের পর ভারতে আদানির পাওয়ারসের বিদ্যুৎকেন্দ্রের একটি ইউনিটের বিয়ারিং থেকে সতর্কসংকেত পাওয়া যায়। সাউন্ড শুনে এটি শনাক্ত করেন কেন্দ্রটির প্রকৌশলীরা। বড় ধরনের দুর্ঘটনা এড়াতে তাৎক্ষণিকভাবে ওই ইউনিটে উৎপাদন বন্ধ করে দেওয়া হয়। এটি উৎপাদনে ফিরতে কয়েক দিন সময় লাগতে পারে। পিডিবি সূত্র বলছে, কিছুদিন ধরে গড়ে দেড় হাজার মেগাওয়াটের মতো বিদ্যুৎ সরবরাহ করছে আদানির কেন্দ্রটি। একটি ইউনিট বন্ধের পর উৎপাদন কমে ৭৫০ থেকে ৭৭০ মেগাওয়াটে নেমে এসেছে।



কমেন্ট বক্স
notebook

গাংনীর বেতবাড়িয়ায় পরিত্যক্ত জমিতে একাধিক মাইনসদৃশ বস্তুর সন্ধান, ঘিরে রেখেছে পুলিশ