ঝিনাইদহে বাসে অগ্নিসংযোগ ও তেল পাম্পে ভাঙচুরের অভিযোগে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ৭ নেতা-কর্মীকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। গত রোববার মধ্যরাতে পৃথক দুটি মামলায় আটকের পরে গতকাল দুপুরে তাদের আদালতে সোপর্দ করা হয়েছে। এদিকে, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের আটক ৭ নেতা-কর্মীকে আটকের পর ডিবি কার্যালয়ে আটকে রেখে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন করা হয়েছে বলে অভিযোগ করা হচ্ছে। প্রিজন ভ্যানে ওঠার সময় চিৎকার তারা পুলিশ প্রশাসনের বিরুদ্ধে এসব অভিযোগ তোলেন। একই সাথে বাসে অগ্নিসংযোগের ঘটনায় জুলাই গণঅভ্যুত্থান বিরোধী রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র রয়েছে বলেও জোর দাবি করেন সংগঠনটির যুগ্ম আহ্বায়ক এজাজ আহমেদ অন্তর।
আটক ব্যক্তিরা হলেন- ঝিনাইদহ জেলা ‘দ্য রেড জুলাই’-এর আহ্বায়ক আবু হাসনাত তানাঈম, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের আহ্বায়ক সাইদুর রহমান, সদস্যসচিব আশিকুর রহমান জীবন, যুগ্ম আহ্বায়ক এজাজ আহমেদ অন্তর, কেন্দ্রীয় যুব শক্তির সদস্য তাশদীদ হাসান, রাসেল হুসাইন ও হুমায়ুন কবির।
দুপুরে জেলা পুলিশ সুপারের কার্যালয় থেকে আদালতে নেওয়ার পথে উপস্থিত গণমাধ্যমকর্মীদের কাছে ক্ষোভ প্রকাশ করেন আটক বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতা-কর্মীরা। প্রিজন ভ্যানে তোলার সময় গণমাধ্যমকর্মীদের উদ্দেশ্যে চিৎকার করে কেন্দ্রীয় যুব শক্তির সদস্য তাশদীদ হাসান বলেন, ‘আমাদের ফাঁসানো হয়েছে। যেসব অভিযোগ তোলা হয়েছে, তার সঙ্গে আমরা কেউ জড়িত নই। সদর থানার ওসিকে জিজ্ঞাসা করুন, বাসে আগুন দেওয়ার সময় আমরা কোথায় ছিলাম, সদর থানার ওসি সব জানে। আমরা বাসে অগ্নিকাণ্ডের সময় সদর থানায় ছিলাম।’
আটক বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের যুগ্ম আহ্বায়ক এজাজ আহমেদ অন্তর প্রিজন ভ্যানে ওঠার সময় বলেন, ‘প্রিয় সাংবাদিক ভাইয়েরা, প্লিজ আপনার সত্যটা তুলে ধরুন। সত্যটা প্রকাশ করুন। এই দেশে রাজনীতির চেয়ে খারাপ আর কিছু নেই। কতিপয় রাজনৈতিক দলের নেতারা ষড়যন্ত্র করে আমাদের ফাঁসিয়ে দিচ্ছে। নিরব হত্যার ঘটনা ধামাচাপা দিতে ষড়যন্ত্র শুরু হয়েছে।’
এসময় জেলা বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সদস্যসচিব আশিকুর রহমান জীবন প্রিজন ভ্যানের দরজায় দাঁড়িয়ে বলেন, ‘অগ্নিসংযোগ বা ভাঙচুরের সঙ্গে আমি জড়িত না। সিসিটিভি ফুটেজ পাবলিকলি প্রকাশ করুক পুলিশ। পুলিশ তো বিক্রি হয়ে গেছে। পুলিশ কেন সিসিটিভি ফুটেজ প্রকাশ করছে না? প্লিজ, সাংবাদিক ভাইয়েরা, আপনারা সত্যটা তুলে ধরুন।’
জেলা পুলিশ সুপার কার্যালয় চত্বরে প্রিজন ভ্যানে ওঠার সময় আটক আসামিরা নানা অভিযোগ করেন। তারা বলেন, আটকের পরে পুলিশ সদস্যরা ‘জুলাই যোদ্ধা’ হওয়ার কারণে আসামিদের অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ করেছে। পুলিশ শারীরিক ও মানসিকভাবে হেনস্তা ও নির্যাতন করেছে।
কেন্দ্রীয় যুব শক্তির সদস্য তাশদীদ হাসান প্রিজন ভ্যান থেকে নেমে আদালতে যাওয়ার সময় গণমাধ্যমকর্মীদের উদ্দেশ্যে বলেন, ‘তাজ ফিলিং স্টেশনের কর্মীরা আমাদের জুলাই যোদ্ধা ফারদিন নিরবকে হত্যা করেছে। হত্যাকাণ্ড ধামাচাপা দিতে ষড়যন্ত্র শুরু করেছে তাজ পাম্পের মালিক হারুন অর রশিদ। হারুন অর রশিদ জেলা আওয়ামী লীগের নেতা ও সাবেক জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান। সৃজনী এনজিও সংস্থার মালিক হারুন টাকার বিনিময়ে পুলিশ কিনে নিয়েছে।’
এসব বিষয়ে অতিরিক্ত পুলিশ সুপার শেখ বিল্লাল হোসেন বলেন, ‘আমরা আপনাদের প্রেসনোট দেব। সুনির্দিষ্ট তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে পুলিশ আসামিদের গ্রেপ্তার করেছে। তথ্যপ্রযুক্তি ও সিসিটিভি ফুটেজ যাচাই করেই তাদের আটক করা হয়েছে। পুলিশ যা প্রমাণ করতে চায়, তা আদালতে উপস্থাপনের মাধ্যমে করা হবে। আপাতত আমরা গণমাধ্যমে কোনো বক্তব্য দিতে চাইছি না।’
এদিকে বৈষম্যবিরোধী নেতাকর্মীদের আটকের বিষয়ে জেলা পুলিশের পক্ষ থেকে গণমাধ্যম কর্মীদের কাছে প্রেস নোট দেওয়া হয়েছে। পুলিশ সুপার মাহফুজ আফজাল স্বাক্ষরিত প্রেস নোটে জানানো হয়েছে, কিছু অসাধু ব্যবসায়ী জ্বালানি তেলের কৃত্রিম সংকট তৈরির চেষ্টা চালাচ্ছে। যে কারণে সাধারণ মানুষ আতঙ্কিত হয়ে অতিরিক্ত তেল সংগ্রহের চেষ্টা করছে। এরই ধারাবাহিকতায় গত শনিবার রাত প্রায় সাড়ে ৮টার দিকে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সদস্য ফারদিন আহমেদ নিরব ঝিনাইদহ কেন্দ্রীয় বাস টার্মিনাল এলাকায় তাজ ফিলিং স্টেশনে তেল নিতে যায়। এসময় ওই পাম্পের কর্মচারীদের সঙ্গে তর্ক-বিতর্কের জেরে ফিলিং স্টেশনের কর্মীরা তাকে মারধর করে। পরে আহত হয়ে ফারদিন আহমেদ নিরব মেসে চলে যান এবং পরে হাসপাতালে ভর্তি হন। হাসপাতালে নেয়া হলে তিনি মারা যান। ওই ঘটনার জেরে শনিবার রাতেই তিনজনকে আটক করে পুলিশ।
প্রেস নোটে আরও বলা হয়েছে, গত শনিবার (৭ মার্চ) রাত সাড়ে ১০টার দিকে তাজ ফিলিং স্টেশনের মালিকের মালিকানাধীন আরাপপুর সৃজনী ফিলিং স্টেশনে হামলা ও ভাঙচুর চালায় বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতাকর্মীরা। এ ছাড়া রাত সোয়া তিনটার দিকে কেন্দ্রীয় বাস টার্মিনালে দাঁড়িয়ে থাকা তিনটি বাসে অগ্নিসংযোগ করে আন্দোলনকারীরা। এ ঘটনায় রোববার বাসে অগ্নিসংযোগের ঘটনায় মো. সাইফ নোমান ও ফিলিং স্টেশন ভাঙচুরের ঘটনায় শামসুল কবির মিলন বাদি হয়ে পৃথক দুটি মামলা দায়ের করেছেন। এসব মামলায় বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ৭ নেতা-কর্মীকে গ্রেপ্তার করে আদালতে সোপর্দ করেছে পুলিশ।
ঝিনাইদহ অফিস