চুয়াডাঙ্গায় সড়ক ও জনপথ (সওজ) বিভাগের বাসভবন এলাকা ও সড়কের পাশে থাকা ২৬টি গাছ চার দফায় নিলামে বিক্রি ও অপসারণ নিয়ে পরিবেশবাদী, স্থানীয় বাসিন্দা এবং সংশ্লিষ্ট দপ্তরের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া ও অসন্তোষের সৃষ্টি হয়েছে। ৪ লাখ ৭৫ হাজার টাকায় চারটি পৃথক কার্যাদেশের মাধ্যমে এসব গাছ কেটে ফেলা হয়েছে। স্থানীয় পরিবেশ কর্মীদের দাবি, অপ্রয়োজনীয়ভাবে এসব সবুজ গাছ কেটে ফেলায় চুয়াডাঙ্গার পরিবেশের ওপর মারাত্মক প্রভাব পড়বে। অন্যদিকে, সওজ কর্তৃপক্ষের দাবি- নিয়মতান্ত্রিক ও দাপ্তরিক প্রক্রিয়া অনুসরণ করেই ঝুঁকিপূর্ণ ও ক্ষতিকারক গাছগুলো অপসারণের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সরকারি চিঠিপত্র পর্যালোচনা করে জানা গেছে, ঘটনাটি শুরু হয় গত বছর। চুয়াডাঙ্গা সড়ক বিভাগের কলেজ রোডে অবস্থিত নির্বাহী প্রকৌশলীর বাসভবনের ভেতরের পুরোনো গাছগুলো অতিরিক্ত ছায়া ও স্যাঁতসেতে পরিবেশ তৈরি করছে এবং যেকোনো সময় ভেঙে পড়ার ঝুঁকিতে রয়েছে জানিয়ে এটি ‘স্পট অকশন’ বা দ্রুত অপসারণের জন্য ২০২৫ সালের ১০ নভেম্বর প্রস্তাব পাঠান চুয়াডাঙ্গা সড়ক বিভাগের উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী মোহাম্মদ সুজাত কাজী। পরবর্তীতে ২০২৫ সালের ২৭ নভেম্বর পুনরায় সড়ক বিভাগ চুয়াডাঙ্গার নির্বাহী প্রকৌশলী জহিরুল ইসলাম একই বিষয়ে রাজশাহীস্থ নির্বাহী বৃক্ষপালনবিদের দপ্তরে দাপ্তরিক পত্র পাঠান। এভাবে সওজ চুয়াডাঙ্গা দপ্তর থেকে দুই দফায় রাজশাহী অপারেশন ডিভিশনে অনুরোধপত্র পাঠানো হয়।
পরবর্তীতে সওজ রাজশাহী অপারেশন ডিভিশন (পশ্চিমাঞ্চল)-এর নির্বাহী বৃক্ষপালনবিদ মীর মুকুট মো. আবু সাঈদ স্বাক্ষরিত পৃথক চারটি কার্যাদেশের মাধ্যমে এসব গাছ অপসারণের দরপত্র অনুমোদন দেওয়া হয়। নথি অনুযায়ী- প্রথম কার্যাদেশে (১৪ জুলাই ২০২৬) চুয়াডাঙ্গা ওল্ড টাউন জেলা মহাসড়কের শিল্পকলা মুক্তমঞ্চের পাশে ঝুঁকিপূর্ণ ১টি মেহগনি গাছ ৬১ হাজার টাকায়, দ্বিতীয় কার্যাদেশে (১৪ জুলাই ২০২৬) বাসভবনের ভেতরের ১৩টি গাছ ১ লাখ ৪২ হাজার টাকায়, তৃতীয় কার্যাদেশে (১৪ জুলাই ২০২৬) বাসভবনের ভেতরের ৪টি গাছ ১ লাখ ৫০ হাজার টাকায় এবং চতুর্থ কার্যাদেশে (২২ জুলাই ২০২৬) বাসভবনের ভেতরের ৮টি গাছ ১ লাখ ২২ হাজার টাকায় বিক্রি করা হয়।
অর্থাৎ মোট চারটি পৃথক দরপত্রের মাধ্যমে ২৬টি গাছ সর্বমোট ৪ লাখ ৭৫ হাজার টাকায় মেসার্স জোয়ারদার ‘ছ’ মিল এবং মেসার্স বকুল এন্টারপ্রাইজ নামক দুটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের কাছে নিলামে হস্তান্তর করা হয়। এর মধ্যে তৃতীয় কার্যাদেশে (১৪ জুলাই ২০২৬) বাসভবনের ভেতরের ৪টি গাছ ১ লাখ ৫০ হাজার টাকায় কাজটি পেয়েছেন রাজশাহীর মেসার্স বকুল এন্টারপ্রাইজ। বাকি তিনটি দরপত্রেই কাজ পেয়েছেন বগুড়ার মেসার্স জোয়ারদার ‘ছ’ মিল। ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান দুটি ইতোমধ্যে সবগুলো গাছ কেটে চুক্তি অনুয়ায়ী গাছ অপসারণের পর স্থান পরিষ্কার ও গর্ত ভরাট করেছে।
তবে গাছ কাটার এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে ক্ষোভে ফুঁসে উঠেছেন স্থানীয় নাগরিক ও পরিবেশবাদীরা। গাছ কাটার তীব্র প্রতিবাদ জানিয়ে সিনিয়র আইনজীবী অ্যাডভোকেট রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘আগেই আইনের আওতায় আনা উচিত। অসভ্য মানুষ।’ ক্ষোভ প্রকাশ করে স্থানীয় বাসিন্দা রাশেদ সালাম হায়াৎ বলেন, ‘সব গাছ কেটে ফেলুক যার যত ইচ্ছা। এমনিতেই চুয়াডাঙ্গা দেশের সর্বোচ্চ তাপমাত্রার প্রথমে থাকে। মরুভূমিতে রূপান্তর করার জন্য সামনে আরো কী কী পদক্ষেপ নেবেন, এখন দেখার বিষয়।’ আলামিন অপু নামে এক যুবক আফসোস করে বলেন, ‘গাছ কাটতে সবাই আগ্রহী, কিন্তু গাছ লাগাতে আমরা কেউ আগ্রহী নই।’ স্থানীয় আলমগীর কবির জোর দাবি জানিয়ে বলেন, ‘আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হোক।’
প্রশাসনের এমন সিদ্ধান্তের কঠোর সমালোচনা করেছেন পরিবেশবিদরাও। নাম প্রকাশ না করার শর্তে একজন পরিবেশবিদ ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘চুয়াডাঙ্গা এমনিতেই কর্কটক্রান্তি রেখার ওপর। তারপর আবার জলাশয় এবং বৃক্ষের পরিমাণ কম। আর এতো সুন্দর থাকা গাছগুলো কেন কাটতে হবে। যে যখন আসেন, তখন গাছ কাটেন। এটা ঠিক নয়।’
আরেক পরিবেশবিদ অনিয়মের অভিযোগ তুলে বলেন, ‘এভাবে ইচ্ছামতো গাছগুলো বিক্রি করা হলো। অথচ এই গাছগুলোতে কোনো সমস্যা ছিল না। ২৬টি গাছ কাটা হয়েছে। সেগুলোর একটি বা দুটি প্রকৃতপক্ষে কাটার মতো ছিল। বাকি সবগুলো গাছ বড় এবং ভালো অবস্থায় ছিল। আর দু-একটার একটি দুইটি ডাল কাটলেই হতো। কিন্তু অসৎ ব্যক্তিদের নজর পড়ায় সবটাই তারা কম মূল্যে সিন্ডিকেট করে বিক্রি করে দিলো।’
তবে সকল অভিযোগ অস্বীকার করে চুয়াডাঙ্গা সড়ক বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী জহিরুল ইসলাম পুরো প্রক্রিয়ার ব্যাখ্যা দিয়ে বলেন, ‘কলেজ রোডের মুক্তমঞ্চের সামনে থাকা গাছগুলো কাটার সিদ্ধান্ত প্রায় এক বছর আগে নেওয়া হয়েছিল। কারণ, গাছগুলোর একটি অংশ প্রায় ২৫ শতাংশ সড়কের ওপর চলে এসেছিল, যা যান চলাচলে বিঘ্ন সৃষ্টি করছিল। এ কারণে সেখানে সড়ক দুর্ঘটনাও ঘটেছে। তবে সেখানে সব গাছ কাটা হয়নি, কেবল যেসব গাছ ঝুঁকিপূর্ণ ছিল এবং দুর্ঘটনার আশঙ্কা তৈরি করছিল, সেগুলোই কাটা করা হয়েছে।’
নিয়ম মেনে গাছ কাটা হয়েছে দাবি করে তিনি আরও বলেন, ‘গাছ কাটা কোনো সহজ বা ইচ্ছাধীন বিষয় নয়। এ ধরনের কাজ নির্ধারিত সরকারি প্রক্রিয়া অনুসরণ করেই করতে হয়। প্রথমে আমরা এখান থেকে রাজশাহীতে চিঠি পাঠাই। পরে সেখান থেকে একটি টিম এসে সরেজমিনে গাছগুলো পরিদর্শন করে। পরিদর্শনে গাছ অপসারণের প্রয়োজনীয়তা পাওয়া গেলে সার্ভে, বিস্তারিত প্রতিবেদন এবং ব্যয় নির্ধারণের পর টেন্ডার প্রক্রিয়ার মাধ্যমে অনুমোদন দেওয়া হয়।’
নতুন গাছ রোপণের কথা উল্লেখ করে তিনি জানান, ‘এবার ২০ থেকে ২৫টি গাছ কাটার টেন্ডার পাওয়া গেছে। তবে যেখানে গাছ কাটা হয়েছে, সেখানে নতুন করে চার থেকে পাঁচটি গাছ রোপণ করা হবে। গাছগুলো ভবিষ্যতে পরিবেশে আরও বেশি অক্সিজেন সরবরাহ করবে কেটে ফেলা গাছগুলোর তুলনায়।’
গাছের অর্থনৈতিক দিক তুলে ধরে তিনি যোগ করেন, ‘গাছের যখন বয়স হয়ে যায়, তখন গাছগুলো খড়ি ছাড়া অন্য কোনো কাজে লাগবে না। পরিবেশের জন্য গাছ আমাদের লাগানোর দরকার আছে এবং এখান থেকে রেভিনিউ ইনকামেরও প্রয়োজন রয়েছে।’
নিজস্ব প্রতিবেদক