ধারাবাহিকভাবে হত্যার শিকার হচ্ছেন বিএনপি ও এর অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীরা। গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে বিএনপি, ছাত্রদল, যুবদল, স্বেচ্ছাসেবক দলের বহু নেতাকর্মী খুন হয়েছেন। এর মধ্যে দলীয় কোন্দল যেমন আছে, তেমনি প্রতিপক্ষ ও অচেনা আততায়ীর হাতেও নিহত হয়েছেন অনেকে। সর্বশেষ গত বুধবার রাতে রাজধানীর তেজগাঁওয়ের তেজতুরী বাজার এলাকায় নিহত আজিজুর রহমান মুছাব্বির নামের এক স্বেচ্ছাসেবক দল নেতাকে গুলি করে হত্যা করেছে দুর্বৃত্তরা। এ সময় তার সঙ্গে থাকা আরও একজন গুলিবিদ্ধ হন। এর আগে গত সোমবার রাতে চট্টগ্রামের রাউজানে নিজ বাড়ির সামনে দুর্বৃত্তদের গুলিতে নিহত হন এক যুবদল নেতা। দলীয় নেতাকর্মীদের নিহতের ঘটনায় বিএনপির পক্ষ থেকে খুব বেশি প্রতিক্রিয়া দেখানো হচ্ছে না। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে বিবৃতি, নিন্দা বা প্রতিবাদ জানিয়ে দায় সেরেছে সংগঠনটি। এসব ঘটনায় কিছু ব্যতিক্রম বাদে বৃহত্তর কোনো কর্মসূচিও দেওয়া হয়নি। দলীয় নেতাকর্মীদের মৃত্যুতে বিএনপির নিস্পৃহতায় ক্ষোভ বাড়ছে তৃণমূলে। গত বুধবার রাতে তেজগাঁওয়ের তেজতুরী বাজার এলাকায় নিহত আজিজুর রহমান স্বেচ্ছাসেবক দলের ঢাকা মহানগর উত্তর শাখার সাবেক সাধারণ সম্পাদক। তিনি বিগত ফ্যাসিস্ট সরকারের সময় একাধিকবার কারাবরণ করেছেন। তাকে গুলি করে হত্যার ঘটনাকে বিচ্ছিন্ন বলে মন্তব্য করেছেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদ। দলীয় কর্মী নিহতের বিষয়ের চেয়ে নির্বাচন নিয়েই আগ্রহী তিনি। বিএনপির এই নেতা বলেন, 'পতিত ফ্যাসিবাদী শক্তি দেশের গণতান্ত্রিক যাত্রাকে ব্যাহত করতে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটাচ্ছে। তবে এসব বিচ্ছিন্ন ঘটনা নির্বাচনে কোনো প্রভাব ফেলবে না।' বিএনপির হাইকমান্ড আজিজুর রহমান মুসাব্বিরের হত্যাকাণ্ডকে বিচ্ছিন্ন ঘটনা বললেও আগামী শনিবার সারা দেশে বিক্ষোভের ডাক দিয়েছে স্বেচ্ছাসেবক দল। আজিজুর রহমান মুসাব্বির হত্যায় জড়িতদের দ্রুত গ্রেপ্তারের দাবিতে এ কর্মসূচি দেয় তারা। গতকাল বৃহস্পতিবার রাজধানীর নয়াপল্টনে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে মুসাব্বিরের জানাজা নামাজের আগে এ কর্মসূচির ঘোষণা দেওয়া হয়। তবে বিশ্লেষকরা বলছেন, দলীয় নেতাকর্মীদের হত্যার শিকার হওয়ার ঘটনাগুলোতে বিএনপি খুব বেশি শক্ত প্রতিক্রিয়া দেখাচ্ছে না। অথচ একই ধরনের ঘটনায়, এমনকি এমনকি হেনস্তার অভিযোগ ভিযোগ এনেও তাদের প্রতিদ্বন্দ্বী দলগুলো কঠোর কর্মসূচি দিয়ে মাঠ দখলে রাখছে। বিশেষ করে জামায়াত এ বিষয়ে বেশ সক্রিয়। নিজেদের কোনো নেতাকর্মী কোনো ঘটনার শিকার হলে সারা দেশে একযোগে তারা মাঠে নেমে যায়। সোশ্যাল মিডিয়ায়ও এ নিয়ে হাইপ তোলে। এতে জনগণের সামনে তাদের সক্রিয়তা ফুটে ওঠে। তারা বলছেন, মুছাব্বির নিহত হয়েছেন গত বুধবার খোদ রাপজধানীতে। কিন্তু বিক্ষোভ কর্মসূচি পালন করা হবে ঘটনার তিন দিন পর। এ অবহেলা কেন? মুছাব্বির হত্যার ঘটনায় পরিবারের মামলা: এদিকে মুছাব্বিরকে গুলি করে হত্যার ঘটনায় মামলা করা হয়েছে। অজ্ঞাতপরিচয় ব্যক্তিদের কথা উল্লেখ করে মামলা করেছে তার পরিবার। গতকাল তেজগাঁও থানার ওসি ক্যশৈন্যু মারমা মামলার বিষয়টি নিশ্চিত করেন। তিনি বলেন, নিহতের স্ত্রী সুরাইয়া বেগম বাদী হয়ে থানায় মামলাটি করেছেন। সেই মামলায় নাম না জানা অজ্ঞাতপরিচয় ৩-৪ জনের বিষয়ে উল্লেখ করা হয়েছে। নিহত মুছাব্বিরের লাশ ময়নাতদন্তের জন্য ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালের মর্গে রাখা হয়েছে। সেখানে লাশের ময়নাতদন্ত সম্পন্ন হবে। আলোচিত যত হত্যাকাণ্ড: গত সোমবার রাতে মোটরসাইকেলে এসে গুলি করে খুন করা চট্টগ্রামের রাউজান হয় উপজেলা যুবদলের এক নেতাকে। নিহত যুবদল নেতার নাম মুহাম্মদ জানে আলম সিকদার (৪৮)। তিনি রাউজান উপজেলা যুবদলের সদস্য এবং পূর্ব গুজরা ইউনিয়ন যুবদলের সাবেক সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। এর আগে গত ২৯ ডিসেম্বর নরসিংদীর মাধবদীতে বাড়ি থেকে ডেকে নিয়ে জাহিদুল ইসলাম (২৫) নামের এক ছাত্রদলকর্মীকে ছুরিকাঘাতে হত্যা করা হয়েছে। নিহত পলাশ উপজেলার জিনারদী ইউনিয়নের গয়েশপুরের মোশাররফ হোসেন ভূঁইয়ার ছেলে ও ওই ইউনিয়ন ছাত্রদলের কর্মী ছিলেন। গত ১৭ নভেম্বর মিরপুরে পল্লবী থানা যুবদলের সদস্যসচিব গোলাম কিবরিয়াকে একটি হার্ডওয়্যার দোকানে মুখোশধারী সন্ত্রাসীরা গুলি করে হত্যা করে। এদিকে ভোলায় পূর্ববিরোধের জেরে রেজওয়ান আমিন শিফাত (২৮) নামের এক ছাত্রদল নেতাকে কুপিয়ে হত্যা করা হয়। গত ২৪ ডিসেম্বর সন্ধ্যায় সদর উপজেলার রাজাপুর ইউনিয়নে এ ঘটনা ঘটে। নিহত শিফাত সদর উপজেলার রাজাপুর ইউনিয়নের ৯ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির সাধারণ সম্পাদক মো. আলাউদ্দিন হাওলাদারের ছেলে ও ভোলা সরকারি কলেজের হিসাববিজ্ঞান বিভাগের স্নাতকোত্তরের ছাত্র এবং ইউনিয়ন ছাত্রদলের সভাপতি পদপ্রার্থী ছিলেন। এ ছাড়া চলতি বছরের শুরুতে কুমিল্লায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হেফাজতে মো. তৌহিদুল ইসলাম (৪২) নামের এক যুবদল নেতার মৃত্যুর অভিযোগ। তৌহিদুল ইসলাম কুমিল্লার পাঁচথুবি ইউনিয়ন যুবদলের আহ্বায়ক ছিলেন। নিহতের পরিবারের পরিবারের অভিযোগ, তৌহিদুল ইসলামকে আগের দিন রাতে বাড়ি থেকে যৌথবাহিনীর সদস্যরা আটক করে নিয়ে যায়। পরের দিন কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে তার মরদেহের খোঁজ পায় পরিবারের সদস্যরা।
সমীকরণ প্রতিবেদক