মেহেরপুরে শীতের শুরুতেই খেজুর রস পেতে ব্যস্ত গাছিরা
- আপলোড তারিখঃ
০৩-১১-২০১৭
ইং
বাবু/হামিদ বারাদী থেকে: শীতের পরশের মাঝেই গ্রাম বাংলার মানুষের কাছে খেজুরের রসে নিজেকে ডুবিয়ে নেওয়ার সুন্দর এক মাধ্যম আবহমান বাংলার চাষী। একঘেয়েমী যান্ত্রিকতার জীবনে অনেক পরিবর্তন এনে থাকে শীত ঋতুচক্র। বৈচিত্রপূর্ণ গ্রামীণ সংস্কৃতির এই শৈল্পীক ঐতিহ্যকে চরম প্রাণোচ্ছলতায় দেখা যায় বারবার এই ঋতুচক্রের আর্শিবাদে।
এই শীতকাল গ্রামীণ মানুষের জীবন-জীবিকার ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। গ্রামীণ জীবনে শীত আসে বিশেষ করে চাষীদের কাছে সে তো বিভিন্ন মাত্রায় রূপ নিয়ে। স্বপ্ন আর প্রত্যাশা পূরণে খেজুর গাছ অনেক খানি তাদের সঙ্গে অঙ্গাঅঙ্গী বসবাস করে। নানাভাবে জড়িত চাষীর জীবন সংগ্রামে বহু কষ্টের মাঝে অনেক প্রাপ্তিই যুক্ত হয় বাংলার এই জনপ্রিয় তরুবৃক্ষ খেজুর গাছের সঙ্গে।
ভূমিহীন চাষী, প্রান্তিক চাষী বা দারিদ্রক্লিষ্ট মানুষের জন্য এই সময়টা হয় অনেক আনন্দদায়ক। কারণ, গাছই তো চাষীর অন্নদাতা। তাদের খেজুর গাছের যতœ-আত্তি না করলে যে রস মিলবে না। আর রস না মিললে গুড় হবে কি করে। পাটালি না দেখলে যেন ঘুম আসে না চাষীর। চাষী তাদের মেয়ে বা বউয়ের হাতের কাঁচা সুপারির কচি পান গালে ভরে বাঁশের ডালি মাথায় করে গঞ্জে বা দূরবর্তী হাটে যাবেই বা কি করে। পাটালি গুড়ের মিষ্টিমধুর গন্ধে চাষীরা বিক্রয় কাজে না থাকলে পেটে ভাতে বাঁচবে কি করে। শীত আমেজে প্রকৃতির মাঝ হতে সংগীহিত খেজুর রস চাষীরা যেন চষে বেড়ায় সকাল, বিকেল ও সন্ধ্যায় মেঠো পথ ধরে, তারই বহিঃপ্রকাশে যেন চমৎকার নান্দনিকতা এবং অপরূপ দৃশ্য অনুভব করে, তা যেন অবশ্যই এক শৈল্পীকতার নিদর্শন। এমন শৈল্পীক আস্থা ও বিশ্বাসকে নিয়ে প্রকৃতির মাঝে বিশাল আকৃতির এক কুয়াশা চাদরে মুড়ি দিতে হয়।
এই শীতেকালে রূপ সৌন্দর্যের আর একটি উপাদেয় সামগ্রী খাঁটি শরিয়া তেল, যা শরীরে মালিশ করে অনেকাংশেই ত্বকের মশ্রিণতা এবং ঠান্ডা দূর করে খেজুর গাছে উঠতে। গ্রামে খুব ভোরে খেজুর গাছ হতে রসের হাড়ি নামিয়ে আনতে ব্যস্ত হন চাষী।
খেজুর গাছ ছয় সাত বছর বয়স থেকে রস দেওয়া শুরু করে। পঁচিশ থেকে ত্রিশ বছর পর্যন্ত রস দেয়। গাছ পুরনো হয়ে গেলে রস কমে যায়। আর পুরনো খেজুর গাছের রস খুব মিষ্টি হয়। মাঝ বয়সী গাছ থেকে সবচেয়ে বেশি রস পাওয়া যায়। বেশি রস সংগ্রহ করা গাছের জন্য অবার অনেক ক্ষতিকর। রস সংগ্রহের জন্য কার্তিক মাসে খেজুর গাছ কাটা শুরু হয়। কার্তিক মাস থেকেই রস পাওয়া যায়। রসের ধারা চলতে থাকে ফাল্গুন মাস পর্যন্ত। শীতের সঙ্গে রস ঝরার ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক আছে। শীত যত বেশি পড়বে তত বেশি রস ঝরবে। রসের স্বাদও তত মিষ্টি হবে। অগ্রহায়ণ, পৌষ, মাঘ মাস হলো রসের ভর মৌসুম। অগ্রহায়ণ থেকে ফাল্গুন মাস পর্যন্ত একটি খেজুর গাছে মাসে ৪০ কেজি রস পাওয়া যেতে পাবে। খেজুর গাছ শুধু রস দিয়েই ক্ষান্ত হয় না। শুকনো খেজুরে ভেষজ গুন অনেক রয়েছে, খেজুরের বীজগুলো বাহির করে নিয়ে দুধে খেজুর গুলো মিশিয়ে ভাল ভাবে ফুটিয়ে গরম করে এই দুধ, খেজুর ঠান্ডা করে শিশুকে খাওয়ালে শক্তি বাড়ে৷ আবার একটি শুকনো খেজুরের ফলের পুষ্টি মান তুলে ধরে বলা যায়, প্রায় ৭৫-৮০% শর্করা, ২% আমিষ এবং প্রায় ২.৫% স্নেহজাতীয় পদার্থ থাকে। ১০০ গ্রাম শাঁসে ২০ ভাগ পানি, ৬০-৬৫ ভাগ শর্করা, ২ ভাগ আমিষ এবং খুব সামান্য কপার, সালফার, ম্যাগনেসিয়াম, ভিটামিন এ, বি-১, বি-২ এবং খনিজ লবণ পাওয়া যায়।
চাষীরা দিনের বেশির ভাগ সময় কাটান এ গাছ থেকে সে গাছে। মাটিতে পা ফেলার সুযোগই যেন হয়ে উঠে না। তারপরও সকল কর্মক্লান্তি যেন নিমিষেই হারিয়ে যায় গাছ থেকে আহোরিত খেজুর রসের মৌ মৌ গন্ধভরা গ্লাসে চুমুক দিয়ে।
কমেন্ট বক্স