দেশে সড়ক যোগাযোগ দিন দিন বিপজ্জনক হয়ে উঠছে। সড়কে বিরাজমান নৈরাজ্য দূর করতে না পারা এর অন্যতম কারণ। ফলে প্রতিনিয়ত সড়ক দুর্ঘটনায় হতাহতের সংখ্যা বাড়ছে বৈ কমছে না। সড়কে চলাচল করতে গিয়ে দুর্ঘটনার শিকার হয়ে যেভাবে যাত্রীসাধারণের প্রাণ যাচ্ছে, তাতে সরকারের কোনো মাথাব্যথা আছে বলে মনে হয় না। এ কথা বললে বাড়িয়ে বলা হবে না যে, সড়ক দুর্ঘটনা নিয়ন্ত্রণে কার্যত সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নেই। দেশের সড়কগুলোতে কী ধরনের নৈরাজ্য ও অব্যবস্থাপনা বিরাজ করছে এর একটি ধারণা মিলবে বেসরকারি সংস্থা রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের তথ্যে। সংস্থাটি গত ১০ আগস্ট রাজধানীতে সংবাদ সম্মেলন করে জানিয়েছে, ২০২০ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৫ সালের জুলাই পর্যন্ত দেশে সড়কে ৩৪ হাজার ৮৯৪টি দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছেন ৩৭ হাজার ৩৮২ জন। এসব দুর্ঘটনায় আহত মানুষের সংখ্যা ৫৯ হাজার ৫৯৭।
সংস্থাটি বলছে, সড়কে নৈরাজ্যের নেপথ্যে আছে জনসংখ্যার উচ্চ ঘনত্ব, অপরিকল্পিত নগরায়ন, দুর্বল ও অপ্রতুল সড়ক অবকাঠামো, সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয়, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির ঘাটতি এবং সড়ক ব্যবহারকারীদের অসচেতনতা। এমন বাস্তবতায় রোড সেফটি ফাউন্ডেশন স্বল্পমেয়াদি (২০২৫-২৭), মধ্যমেয়াদি (২০২৫-২৯) এবং দীর্ঘমেয়াদি (২০২৫-৩১) এ তিন স্তরের রূপরেখা প্রস্তাব করেছে। স্বল্পমেয়াদি রূপরেখায় আছে জাতীয় সড়ক নিরাপত্তা কাউন্সিল (এনআরএসসি) পুনর্গঠন, বিআরটিএ, বিআরটিসি এবং ডিটিসিএর শীর্ষপদে কারিগরি বিশেষজ্ঞ নিয়োগ, কাঠামোগত সংস্কার, ড্রাইভিং লাইসেন্স পরীক্ষার প্রশ্ন সড়ক-সম্পর্কিত হওয়া, যানবাহনের আয়ুষ্কাল ও ডাম্পিং নীতিমালা তৈরি, সড়ক দুর্ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য গঠিত ট্রাস্ট ফান্ডে প্রতি বছর সাত কোটি টাকা বরাদ্দসহ ১০টি প্রস্তাব। মধ্যমেয়াদি রূপরেখায় আছে রোড ট্রাফিক সেফটি ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম (আরটিএমএস) চালুসহ আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার, মেয়াদোত্তীর্ণ যানবাহন প্রত্যাহার, রুট রেশনালাইজেশনের মাধ্যমে কোম্পানিভিত্তিক আধুনিক বাস সার্ভিস চালু, স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীদের জন্য প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব বাস ও মোটরসাইকেলের গতি নিয়ন্ত্রণ করা। দীর্ঘমেয়াদি রূপরেখার মধ্যে আছে রাজধানীতে বহুতলবিশিষ্ট হাইড্রোলিক পার্কিং তৈরি, ছোট যানবাহন নিয়ন্ত্রণ, দুর্ঘটনা রোধে সড়ক, রেল ও নৌপরিবহন একত্র করে অভিন্ন যোগাযোগ মন্ত্রণালয় গঠন করা। সেই সাথে রূপরেখা বাস্তবায়নে বিআরটিএ, বিআরটিসি এবং ডিটিসিএকে একটি কাউন্সিলের অধীন করার প্রস্তাব দিয়েছে সংস্থাটি।
আমাদের সবার নিশ্চয় স্মরণে রয়েছে, ২০১৮ সালে রাজধানীর বিমানবন্দর সড়কে দু’জন কলেজশিক্ষার্থীর বাসের চাপায় মৃত্যু হলে প্রতিবাদে দেশকাঁপানো নিরাপদ সড়ক আন্দোলন গড়ে ওঠে। শিশু-কিশোরদের ওই আন্দোলনের তীব্রতা সারা দেশে ছড়িয়ে পড়লে স্বৈরাচার শেখ হাসিনা বেকায়দায় পড়েন। পতিত স্বৈরাচারী সরকার রাষ্ট্রীয় এবং দলীয় পেটোয়া বাহিনী দিয়ে হামলা চালিয়ে নিয়ন্ত্রণে আনে ওই আন্দোলন। পরবর্তীতে সরকার কিছু পরিবর্তন এনে নামকাওয়াস্তে নতুন একটি সড়ক আইন প্রবর্তন করে। কিন্তু সরকারদলীয় শ্রমিক সংগঠনের আপত্তির মুখে তাতেও পরিবর্তন আনা হয়। ফলে নতুন ওই সড়ক আইন কার্যকারিতা হারিয়ে ভোঁতা অস্ত্রে পরিণত হয়েছে।
সড়কে যেভাবে দুর্ঘটনায় মানুষের প্রাণ ঝরছে, এতে দেশে কত পরিবার যে তাদের আয়ের উৎস হারিয়ে নিঃস্ব হচ্ছে এবং আহত হয়ে পঙ্গুত্ববরণ করে কতজন যে দুর্বিষহ জীবন কাটাচ্ছেন এর হিসাব কারো জানা নেই। দেশের সড়ক যোগাযোগ খাতে এমন অব্যবস্থাপনা ও নৈরাজ্য সত্ত্বেও অন্তর্বতী সরকার সড়ক পরিবহনব্যবস্থা সংস্কারে মনোযোগী নয়। আমরা আশা করি, নৈরাজ্য দূর করে সড়কে শৃঙ্খলা ফেরাতে সরকার প্রয়োজনীয় সংস্কারে হাত দেবে।
প্রধান সম্পাদক