চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থান-পরবর্তী দেশে আবার গণতান্ত্রিক ধারা পুনঃপ্রতিষ্ঠায় অধীর আগ্রহে অপেক্ষার প্রহর গুনছেন দেশবাসী। শেখ হাসিনা দেশের নির্বাচনব্যবস্থা ধ্বংস এবং জাতীয় ও সাংবিধানিক সব প্রতিষ্ঠান অকার্যকর করে দেশে ফ্যাসিবাদী শাসন কায়েম করেন। ৫ আগস্ট হাসিনা সরকারের পতনের মধ্য দিয়ে দেশ একটি টেকসই গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থায় ফিরে আসবে- এটি এখন জন-অভিপ্রায়ের অন্যতম একটি। আমাদের স্মরণে রয়েছে যে, শেখ হাসিনা দীর্ঘ সাড়ে ১৫ বছর দেশের গণতন্ত্রকামী মানুষের ভোটাধিকারসহ মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং মানবাধিকার হরণ করেন। ফলে সাধারণ মানুষের মধ্যে হাসিনাবিরোধী ক্ষোভ পুঞ্জীভূত হতে থাকে। এক পর্যায়ে ছাত্রদের গড়ে ওঠা বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনে সর্বস্তরের মানুষ অংশ নেন। পর্যায়ক্রমে বৈষম্যবিরোধী আন্দোলন জনবিস্ফোরণে রূপ নেয়। ফলে গত বছরের ৫ আগস্ট গণ-অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ফ্যাসিবাদী শাসনের অবসান ঘটে।
তবে গণ-অভ্যুত্থান-উত্তর গত বেশ কয়েক মাস ধরে নির্বাচন নিয়ে কিছু রাজনৈতিক দলের মধ্যে সন্দেহ-সংশয় দানা বাঁধে। ওই সব দলের শীর্ষ নেতাদের বক্তব্যে ধারাবাহিকভাবে দ্রুত নির্বাচন আয়োজনের দাবি জানানো হয়। তারা এ-ও বলতে থাকেন, নির্বাচন নিয়ে একটি অংশ গভীর ষড়যন্ত্রে লিপ্ত। অবশেষে আগামী সংসদ নির্বাচন কবে হবে; তা নিয়ে সব জল্পনার অবসান ঘটেছে গত মঙ্গলবার প্রধান উপদেষ্টার জাতির উদ্দেশে দেয়া ভাষণে। ওই ভাষণে অন্তর্র্বতী সরকারের প্রধান অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস ঘোষণা করেন, আগামী ফেব্রুয়ারিতে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। একই সাথে ওই দিন বিকেলে রাজধানীতে সংসদ প্লাজার সামনে মানিক মিয়া অ্যাভিনিউয়ে গণ-অভ্যুত্থানের এক বছর পূর্তি উপলক্ষে সরকার আয়োজিত সমাবেশে প্রধান উপদেষ্টা জুলাই ঘোষণাপত্র পাঠ করেন।
জাতীয় নির্বাচন আয়োজনের ঘোষণাকে ইতিবাচকভাবে নিয়েছে রাজনৈতিক দলগুলো। জুলাই ঘোষণাপত্র এবং জাতীয় নির্বাচনের সময়সীমা ঘোষণার মধ্য দিয়ে কার্যত রাজনৈতিক দলগুলোকে নির্বাচনমুখী করল। এখন সবার দৃষ্টি থাকবে নির্বাচন কমিশনের (ইসি) ভোটের তফসিল ঘোষণার দিকে।
বাংলাদেশের নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতায় বৃহত্তম দল বিএনপির প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে ওঠা বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী, অভ্যুত্থানে নেতৃত্ব দেয়া ছাত্রদের নতুন গঠিত জাতীয় নাগরিক পার্টি-এনসিপি এবং ইসলামী আন্দোলন- এই দল তিনটি অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনে ‘লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড’ (সবার জন্য সমান সুযোগ) তৈরিতে জোর দিয়েছে। জামায়াত, এনসিপি, ইসলামী আন্দোলনসহ কয়েকটি দল উদ্বিগ্ন অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনে সরকার ‘লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড’ তৈরি করতে পারবে কি না, তা নিয়ে। তারা মনে করছে, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এখনো অগোছালো। এর সাথে সংশ্লিষ্ট অন্যান্য বাহিনী ও সংস্থার কার্যকর ভূমিকা রাখা নিয়ে তারা এখনো নিশ্চিত নয়। এ জায়গায় সরকারের সাথে এখনো দূরত্ব রয়ে গেছে। এসব কারণে ওই তিনটি দল মনে করে, বৃহৎ দলের পক্ষে এখন নির্বাচনী মাঠ একতরফাভাবে ঝুঁকে আছে।
সুস্থ ধারার গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় নির্বাচন মানে প্রতিযোগিতা। আর প্রতিযোগিতায় জয়-পরাজয় একটি প্রক্রিয়া। কিন্তু এটিও স্মরণে রাখা আবশ্যক, প্রতিযোগিতায় অবশ্যই লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড থাকতে হবে। সবার জন্য সমান সুযোগ ও অধিকার নিশ্চিত করা না গেলে প্রতিযোগিতা হয়ে পড়ে পক্ষপাতদুষ্ট। এক্ষেত্রে আগামী ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড তৈরিতে নিরপেক্ষভাবে কাজ করবে বর্তমান অন্তর্র্বতী সরকার, এটি দেশবাসী দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করে।
প্রধান সম্পাদক