শুক্রবার, ২৫ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
সর্বশেষ স্থানীয় সংবাদ জাতীয় রাজনীতি আর্ন্তজাতিক সারাদেশ অর্থনীতি খেলা বিনোদন আজকের পত্রিকা প্রযুক্তি চাকরি

চুয়াডাঙ্গা সদর হাসপাতালে একের পর এক চিকিৎসক বদলি, বিপরীতে আসছে না কেউ

  • আপলোড তারিখঃ ১০-০৪-২০২৫ ইং
চুয়াডাঙ্গা সদর হাসপাতালে একের পর এক চিকিৎসক বদলি, বিপরীতে আসছে না কেউ

এমনিতেই ২২ জন চিকিৎসক পদের ৯ জন চিকিৎসক পদই শূন্য। আবার অ্যানেসথিসিয়া চিকিৎসক না থাকায় থেমে আছে প্রায় চার বিভাগের কার্যক্রমসহ জরুরি অস্ত্রোপচার ও গুরুতর অসুস্থ রোগীদের চিকিৎসা সেবা। চিকিৎসক-জনবল সংকটে খুড়িয়ে খুড়িয়ে চলছে চুয়াডাঙ্গা সদর হাসপাতাল। তারপরও আবার কার্ডিওলজি চিকিৎসকের বদলি যেন মরার ওপর খাড়ার ঘা। চিকিৎসক-নার্স, কর্মকর্তা-কর্মচারীসহ জনবল সংকটের কারণে মারাত্মকভাবে ব্যহত হচ্ছে চুয়াডাঙ্গা সদর হাসপাতালের চিকিৎসাসেবা কার্যক্রম। মাত্র ৫০ শয্যার জনবলে খুড়িয়ে খুড়িয়ে চলা এই হাসপাতালটিতে একের পর চিকিৎসক বদলি চিকিৎসা সেবা কার্যক্রমে নিয়ে এসেছে স্থবিরতা। অ্যানেসথিসিয়া চিকিৎসক না থাকায় প্রায় বন্ধ জরুরি অস্ত্রোপচারসহ গুরুতর অসুস্থ রোগীদের চিকিৎসা সেবা।

আবার গত ২৫ মার্চ তারিখে বদলির আদেশ পেয়েছেন হাসপাতালের একমাত্র মেডিসিন বিশেষজ্ঞ জুনিয়র কনসালটেন্ট (কার্ডিওলজি) ডা. নূরে আলম আশরাফি। এতে চরম ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন চিকিৎসাসেবা নিতে আসা সাধারণ রোগীরা। দীর্ঘদিন ধরে হাসপাতালের সার্জারি, মেডিসিন, গাইনি, অর্থপেডিক্স ও চক্ষুসহ চিকিৎসকদের ৯টি পদ শূন্য রয়েছে। সেবাপ্রার্থীদের দাবি অতিদ্রুত নতুন অ্যানেসথেসিয়া চিকিৎসকের পদায়নসহ নতুন কার্ডিওলজিস্ট পদায়ন না হওয়া পর্যন্ত বর্তমান কার্ডিওলজিস্ট ডা. নুরে আলম আশরাফী বকুলের বদলির আদেশ স্থগিত করার। মূলত দাবি উঠেছে, বিকল্প চিকিৎসক বা রিপ্লেস না করা পর্যন্ত কোনো চিকিৎসকের বদলি করা যাবে না।
জানা গেছে, ১৯৭০ সালে ৫০ শয্যা হিসেবে চুয়াডাঙ্গা সদর হাসপাতাল স্থাপিত হয়। ২০০৩ সালে ৫০ শয্যা থেকে ১০০ শয্যায় উন্নীত হয় চুয়াডাঙ্গা সদর হাসপাতাল। খাতা-কলমে ১০০ শয্যায় রূপ নিলেও শুধু খাবার ও ওষুধ বরাদ্দ দেওয়া হয়। এখনো সেই ৫০ শয্যার জনবল দিয়ে কোনোরকমে খুড়িয়ে খুড়িয়ে চলছে হাসপাতালটি। ২০১৮ সালের ২৮ অক্টোবর তৎকালীন স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম চুয়াডাঙ্গায় ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট ৬ তলা ভবনের আনুষ্ঠানিক কার্যক্রম উদ্বোধন করেন। এতে ব্যয় ধরা হয় সাড়ে ৩০ কোটি টাকা। উদ্বোধনের ৭ বছর পার হলেও চুয়াডাঙ্গা সদর হাসপাতালের ২৫০ শয্যার কার্যক্রম চালু হয়নি। ৫০ শয্যার জনবল দিয়েই এ বিশাল চাপ প্রতিনিয়ত সামলাতে হচ্ছে। এর মধ্যে ৫০ শয্যার জনবলও সংকট রয়েছে।

চুয়াডাঙ্গা সদর হাসপপাতাল সূত্রে জানা যায়, হাসপাতালের সিনিয়র চক্ষু কনসালটেন্ট, সিনিয়র ও জুনিয়র অ্যানেসথেসিয়া কনসালটেন্ট, সিনিয়র শিশু রোগ বিশেষজ্ঞ, সিনিয়র মেডিসিন কনসালটেন্ট, জুনিয়র ইএনটি কনসালটেন্ট, জুনিয়র রেডিওলোজিস্টসহ একজন মেডিকেল অফিসার ও ডেন্টাল সার্জনের পদসহ মোট ৯ জন চিকিৎসকের পদ শূন্য রয়েছে। এছাড়া ২য়, ৩য় ও ৪র্থ শ্রেণির ২৮টি পদ ফাঁকা, যার মধ্যে সুইপারের ৭টি পদের ৪টি দীর্ঘদিন খালি রয়েছে। ফলে হাসপাতালের পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রমও ব্যহত হচ্ছে। এর মধ্যে গত ১০ ফেব্রুয়ারি জুনিয়র অ্যানেসথেসিয়া কনসালটেন্ট ডা. নুরুন্নাহার খানম নদীকে যশোরে বদলি করা হয়। ১২ ফেব্রুয়ারি তিনি ছাড়পত্র নিলে হাসপাতালের অপারেশন থিয়েটারের কার্যক্রম অচল হয়ে পড়ে। আবার নতুন করে একমাত্র জুনিয়র কনসালটেন্ট মেডিসিন (কার্ডিওলজি) ডা. নূরে আলম আশরাফি গত ২৫ মার্চ যশোরের চৌগাছা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে বদলি হয়েছেন। তবে তিনি এখনো ছাড়পত্র নেননি।

জেলার প্রায় ১৩ লাখ মানুষ চুয়াডাঙ্গা সদর হাসপাতালের ওপর নির্ভরশীল। ৫০ শয্যার জনবল দিয়ে খুড়িয়ে খুড়িয়ে চলা এই হাসপাতালটিতে প্রতিদিন গড়ে ইনডোরে ৩৫০ এর বেশি এবং আউটডোরে এক হাজারের বেশি মানুষ চিকিৎসা সেবা নিয়ে থাকেন। এর মধ্যে অধিকাংশই শিশু। চিকিৎসক-নার্সরা এত রোগীর চিকিৎসাসেবা দিতে হিমশিম খাচ্ছেন।

এদিকে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের অভাবে জেলার প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে আসা রোগীরা কাঙ্খিত সেবা না পেয়ে ফিরে যাচ্ছেন। জরুরি অপারেশন বন্ধ থাকায় রোগীরা বাধ্য হয়ে বেসরকারি ক্লিনিক ও হাসপাতালে যাচ্ছেন, যেখানে তাদের কাছ থেকে মোটা অংকের টাকা হাতিয়ে নেওয়া হচ্ছে। আলমডাঙ্গা উপজেলার বেলগাছি গ্রামের আব্দুর রশিদ বলেন, ‘দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে সদর হাসপাতালে এসে জানতে পারি এখানে কোনো চক্ষু বিশেষজ্ঞ নেই। বেসরকারি ক্লিনিকেও তো খরচ বেশি, কোথায় দেখাবো।’

আরেক চিকিৎসাপ্রার্থী জীবননগর উপজেলার মনোহরপুর গ্রামের বাবুল মণ্ডল বলেন, ‘মেডিসিন বিশেষজ্ঞ দেখাতে এসেছিলাম। আসার পর জানলাম ডাক্তার নেই, ঢাকায়। একজন আবার বলছে, সেই একজনই নাকি মেডিসিনের ডাক্তার ছিল, তাও তিনি বদলি হয়েছেন। আমাদের কী হবে? এখন দেখছি খুলনা-রাজশাহী দৌঁড়াতে হবে।’

অপর দিকে, একমাত্র জুনিয়র অ্যানেসথেসিয়া কনসালটেন্ট বদলি হয়ে যাওয়ায় জরুরি অস্ত্রোপচারসহ গুরুতর অসুস্থ রোগীদের চিকিৎসা সেবা ব্যহত হচ্ছে। ফলে গুরুতর রোগীদের কুষ্টিয়া, যশোর ও রাজশাহীর সরকারি হাসপাতাল কিংবা বেসরকারি ক্লিনিকে পাঠিয়ে দেওয়া হচ্ছে, যা সাধারণ রোগীদের জন্য বাড়তি খরচ ও ভোগান্তির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। রোগীর স্বজনরা বলছেন, ‘সরকারি হাসপাতালে সেবা পাওয়ার কথা, কিন্তু এখানে অস্ত্রোপচারই হচ্ছে না। বাইরের বেসরকারি ক্লিনিকে গেলে অনেক টাকা লেগে যাচ্ছে।’

দামুড়হুদা উপজেলার এক রোগীর স্বজন আরাফাত হোসেন বলেন, ‘এই জেলার বেশিরভাগহ মানুষ সরকারি হাসপাতালের ওপর নির্ভরশীল। আমার বাবার এখানে অপারেশন করার কথা ভেবেছিলাম। এখন শুনছি, অ্যানেসথেসিয়া নেই, তাই অপারেশন বন্ধ। এভাবে চললে আমাদের মতো নিম্ন আয়ের মানুষ সেবা নেবে কোথায়? সরকার কি এই জেলার মানুষকে দেখে না। এই জেলার মানুষ কি নাগরিক নয়?’

বিকল্প চিকিৎসক বা রিপ্লেস না করা পর্যন্ত কোনো চিকিৎসকের বদলি না করার দাবি করছেন সচেতন সমাজ ও চিকিৎসা সংশ্লিষ্টরা। চুয়াডাঙ্গা নাগরিক কমিটির সদস্যসচিব অধ্যাপক শেখ সেলিম বলেন, ‘একটি জেলা সদরের হাসপাতাল। এই হাসপাতালের ওপর এই জেলার ৯৯ ভাগ মানুষ নির্ভরশীল। অথচ দীর্ঘদিন চিকিৎসক সংকট, জনবল সংকট। আসলে এটা এই জেলার মানুষের ভোগান্তি। নাগরিক অধিকার সঠিকভাবে বাস্তবায়িত হচ্ছে না। ৩০ কোটি টাকা ব্যয়ে নতুন ভবন হয়েছে। পর্যাপ্ত জায়গা রয়েছে। চিকিৎসক-নিয়োগ দিলেই এই জেলার মানুষ পূর্ণ চিকিৎসা সেবা পাবে। অতি দ্রুত এই সমস্যার সমাধান করতে হবে।’

চুয়াডাঙ্গা সদর হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. বিদ্যুৎ কুমার বিশ্বাস বলেন, ‘সাংঘাতিক মুশকিল অবস্থায় আছি। হাসপাতালে কোনো কার্ডিওলজি থাকছে না। কোনো অ্যানেসথেসিয়ার এখনো পদায়ন হয়নি। যে কাজগুলো হচ্ছে, এগুলো নিয়মবর্হিভূত ও বিবেক বর্জিত কাজ হচ্ছে। জেলা সদর হাসপাতাল খালি রেখে, উপজেলাতে নিয়ে যাচ্ছে, অথচ কোনো রিপ্লেস দিচ্ছে না। একটি অ্যানেসথেসিয়া ডিপার্টমেন্টের ওপর আরও চারটা ডিপার্টমেন্ট নির্ভর থাকে। এই চারটা ডিপার্টমেন্টের কাজকর্ম হচ্ছে না। আমরা একাধিকবার মন্ত্রণালয়ে লিখেছি।’
তিনি আরও বলেন, কনসালটেন্ট সংকট। কনসালটেন্ট সংকট মানে মেডিসিন কনসালটেন্ট, অ্যানেসথিসিয়া, কার্ডিওলজি, চক্ষু, নাক-কান-গলাসহ পাঁচটি কনসালটেন্ট এখন নেই। তারপর ইএমও (ইর্মাজেন্সি মেডিকেল অফিসার) নেই। স্টাফ আছে ৫০ বেডের। মৃত, অবসরে গিয়ে ৫০ বেডের স্টাফও পরিপূর্ণ নেই। অথচ রোগীর চাপ ২৫০ বেডের বেশি। আমরা খুব কষ্টে চালাচ্ছি।’

জেলা সিভিল সার্জন ডা. হাদী জিয়া উদ্দিন আহমেদ বলেন, ‘আমরা বিষয়টি মন্ত্রণালয়ে জানিয়েছি। আশা করা হচ্ছে দ্রুত সময়ের মধ্যে পদগুলো পূরণ হবে এবং হাসপাতালের অপারেশন থিয়েটারের কার্যক্রমসহ সকল কার্যক্রম স্বাভাবিক হবে।’



কমেন্ট বক্স
notebook

আরো ১১ বোয়িং বিমান কিনছে বাংলাদেশ