বৃহস্পতিবার, ৫ নভেম্বর, ২০২৬
সর্বশেষ স্থানীয় সংবাদ জাতীয় রাজনীতি আর্ন্তজাতিক সারাদেশ অর্থনীতি খেলা বিনোদন আজকের পত্রিকা প্রযুক্তি চাকরি
জীবননগরের ইউএনওর আশ্বসে অবরোধ প্রত্যাহার

চার দফা দাবিতে আনসারবাড়ীয়া রেলস্টেশনে রেলপথ অবরোধ

প্রায় সাড়ে ৩ ঘণ্টা বন্ধ ট্রেন চলাচল, যাত্রীদের চরম ভোগান্তি
  • আপলোড তারিখঃ ০৫-১১-২০২৬ ইং
চার দফা দাবিতে আনসারবাড়ীয়া রেলস্টেশনে রেলপথ অবরোধ

জীবননগর উপজেলার ঐতিহ্যবাহী আনসারবাড়ীয়া রেলওয়ে স্টেশন পূর্ণাঙ্গভাবে চালু, আধুনিক প্ল্যাটফর্ম নির্মাণ ও আন্তঃনগর ট্রেনের যাত্রাবিরতিসহ চার দফা দাবিতে রেলপথ অবরোধ, মানববন্ধন ও বিক্ষোভ কর্মসূচি পালন করেছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। গতকাল বুধবার বেলা ১০টা থেকে দেড়টা পর্যন্ত চলা এ কর্মসূচির কারণে খুলনার সঙ্গে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের রেল যোগাযোগ প্রায় সাড়ে তিন ঘণ্টা বন্ধ ছিল। এতে শত শত যাত্রী চরম ভোগান্তিতে পড়ে। পরে জীবননগর উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) সুমাইয়া সুলতানা এ্যানির আশ্বাসে অবরোধ তুলে নেয় আন্দোলনকারীরা।


‘সচেতন নাগরিক সমাজ’-এর ব্যানারে এবং আনসারবাড়ীয়া রেলস্টেশন রক্ষা ও উন্নয়নে সর্বদলীয় সংগ্রাম কমিটির ডাকে গতকাল বুধবার বেলা ১০টায় স্টেশনটির রেলপথ ও প্ল্যাটফর্মে এ কর্মসূচি শুরু হয়। এতে স্থানীয় বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সামাজিক সংগঠনের নেতা-কর্মী, সুধীজন, শিক্ষক, সাংবাদিক, ব্যবসায়ীসহ হাজারো ছাত্র-জনতা ও সর্বস্তরের মানুষ অংশ নেন।


পূর্বঘোষিত কর্মসূচি অনুযায়ী খুলনা থেকে ছেড়ে আসা চিলাহাটিগামী আন্তঃনগর ৭২৭ আপ রূপসা এক্সপ্রেস ট্রেনটি আনসারবাড়ীয়া স্টেশনে থামিয়ে অবরুদ্ধ করে রাখেন আন্দোলনকারীরা। এতে খুলনা-ঢাকা, খুলনা-রাজশাহী, খুলনা-সৈয়দপুর ও খুলনা-চাঁপাইনবাবগঞ্জ পথে ট্রেন চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। আশপাশের বিভিন্ন স্টেশনে আন্তঃনগর সাগরদাঁড়ি, কপোতাক্ষ, মহানন্দা ও রকেট মেইল ট্রেন আটকা পড়ে। ট্রেনের সময়সূচিতে বিপর্যয় দেখা দেয় এবং যাত্রীরা দুর্ভোগে পড়েন।


আন্দোলনকারীরা জানান, আনসারবাড়ীয়া রেলস্টেশন চুয়াডাঙ্গা জেলার অন্যতম প্রাচীন ও গুরুত্বপূর্ণ একটি স্টেশন। অথচ দীর্ঘদিন ধরে প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা ও পর্যাপ্ত ট্রেনের যাত্রাবিরতি না থাকায় এ অঞ্চলের মানুষকে দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে। স্টেশনটি শুধু আন্দুলবাড়ীয়া ইউনিয়নের নয়, জীবননগর উপজেলার কেডিকে ও রায়পুর, চুয়াডাঙ্গা সদর উপজেলার তিতুদহ, বেগমপুর ও গড়াইটুপি ইউনিয়নসহ ঝিনাইদহ জেলার বিভিন্ন এলাকার মানুষের যাতায়াতের গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। স্থানীয় ব্যবসায়ীরাও দূরদূরান্তে মালামাল পরিবহনে এ স্টেশন ব্যবহার করেন।


তাদের অভিযোগ, বর্তমানে স্টেশনটিতে যে ট্রেনটি থামে, সেটিও ২ নম্বর লাইনে দাঁড়ায়। ফলে নিচু স্থান থেকে উঁচুতে উঠে ট্রেনে ওঠানামা করতে গিয়ে অসুস্থ রোগী, নারী, শিশু ও বয়স্ক যাত্রীদের চরম ভোগান্তিতে পড়তে হয়। এ কারণে ১ নম্বর প্ল্যাটফর্ম চালু করে সেখানে ট্রেনের যাত্রাবিরতি নিশ্চিত করার দাবি জানান তারা।




আন্দোলনকারীদের চার দফা দাবির মধ্যে রয়েছে- ঐতিহ্যবাহী আনসারবাড়ীয়া রেলস্টেশন পুনরায় পূর্ণাঙ্গভাবে চালু করে দুজন স্টেশনমাস্টারসহ প্রয়োজনীয় সংখ্যক লোকবল নিয়োগ; আধুনিক মানের প্ল্যাটফর্ম, বিশ্রামাগারসহ স্টেশনের অবকাঠামোগত উন্নয়ন এবং ঢাকা-খুলনা ও খুলনা-রাজশাহী রুটে আন্তঃনগর রূপসা, সাগরদাঁড়ি ও কপোতাক্ষ এক্সপ্রেস ট্রেনের আপ-ডাউন যাত্রাবিরতি নিশ্চিত করা। আন্দোলনকারীরা জানান, ৭২ ঘণ্টার মধ্যে চার দফা দাবি মেনে নেওয়া না হলে আরও কঠোর কর্মসূচি ঘোষণা করা হবে।


মানববন্ধনে বক্তব্য দেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ছাত্রনেতা, শিক্ষানুরাগী ও সমাজসেবক সেলিম আকতার খান মিণ্টু। তিনি বলেন, এ এলাকার পাশাপাশি আশপাশের কয়েকটি ইউনিয়নের মানুষও যাতায়াতের জন্য স্টেশনটি ব্যবহার করেন। অনেক ব্যবসায়ী এখান থেকে দূর-দূরান্তে মালামাল নিয়ে যান। তাই তাদের প্রধান দাবি, ১ নম্বর লাইনে ট্রেন থামাতে হবে। বর্তমানে ২ নম্বর লাইনে ট্রেন থামায় নিচ থেকে ঝুলে ঝুলে ট্রেনে উঠতে গিয়ে অসুস্থ রোগী, নারী-পুরুষসহ সব যাত্রীকে চরম ভোগান্তি পোহাতে হয়।


জীবননগর উপজেলা বিএনপির সভাপতি ও আন্দুলবাড়ীয়া ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান আনোয়ার হোসেন খান খোকন বলেন, স্টেশনটি অনেক পুরোনো হলেও এলাকার মানুষ প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত। এটি পূর্ণাঙ্গভাবে চালু হলে চুয়াডাঙ্গার জীবননগর, দামুড়হুদা ও দর্শনা এবং ঝিনাইদহের মহেশপুরসহ আশপাশের এলাকার মানুষ উপকৃত হবেন। সহজে ঢাকা, রাজশাহীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে যাতায়াত করতে পারবেন। বিশেষ করে চিকিৎসাসেবা নিতে মানুষের দুর্ভোগ কমবে।


চার দফা দাবি বাস্তবায়নের পক্ষে আরও বক্তব্য দেন জীবননগর উপজেলা জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমির ও আন্দুলবাড়ীয়া ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান সাখাওয়াত হোসেন, আন্দুলবাড়ীয়া ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি আতিয়ার রহমান, সাধারণ সম্পাদক আজিম খান, ইউনিয়ন জামায়াতে ইসলামীর ভারপ্রাপ্ত আমির হারুন অর-রশীদ, সেক্রেটারি মোল্লা হাসিবুল হোসেন (শান্ত), দেওয়ান ইয়াছিন উল্লাহ, মোল্লা মো. মোতাহারুল ইসলাম (চঞ্চল) ও চিকিৎসক মোহা. রফিকুল ইসলাম।


এসময় উপস্থিত ছিলেন আন্দুলবাড়ীয়া ইউনিয়ন বিএনপির সাবেক সাধারণ সম্পাদক ও সাবেক ইউপি সদস্য শহিদুর রহমান, শেখ ফরহাদ হোসেন সেলিম, মিন্টু মিয়া, সাইদুর রহমান বাবু, সাবেক আমির হাজী আব্দুর রহমান মাস্টার, আসাদুজ্জামান আড়িয়াল, বিএনপি নেতা শমসের আলী, বজলুর রহমান, ফিরোজ আলম সাফা, মোস্তাফিজুর রহমান মুক্তার, সাইদুর রহমান সাইদুল, জামায়াত নেতা সাঈদ হাসান বাপ্পী, সাখাওয়াত হোসেন, খন্দকার আবুল বাসার, জাহিদুর রহমান সম্রাটসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ।


চুয়াডাঙ্গা রেলওয়ে স্টেশনের স্টেশনমাস্টার মিজানুর রহমান জানান, আনসারবাড়ীয়া রেলওয়ে স্টেশন চালুর দাবিতে স্থানীয়রা আন্তঃনগর ৭২৭ আপ রূপসা এক্সপ্রেস ট্রেনটি আটকে রেখে আন্দোলন করেন। এতে খুলনার সঙ্গে দেশের অন্যান্য অঞ্চলের রেল যোগাযোগ বন্ধ হয়ে পড়ে। বিভিন্ন গন্তব্যে যাওয়ার জন্য আসা যাত্রীরা স্টেশনে অপেক্ষা করছিলেন। ট্রেন চলাচল স্বাভাবিক হতে বিলম্বের পাশাপাশি সার্বিক সময়সূচিতে বিপর্যয় সৃষ্টির আশঙ্কা ছিল।


এদিকে, খবর পেয়ে জীবননগর উপজেলা নির্বাহী অফিসার সুমাইয়া সুলতানা এ্যানি এবং জীবননগর থানার অফিসার ইনচার্জ সোলায়মান শেখ ঘটনাস্থলে যান। এসময় ইউএনও দাবিগুলো রেলমন্ত্রীসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের অবহিত করার আশ্বাস দেন। পাশাপাশি জেলা প্রশাসকের কাছে স্মারকলিপি দেওয়ার পরামর্শ দেন। দ্রুত সময়ের মধ্যে স্টেশনমাস্টারসহ প্রয়োজনীয় লোকবল নিয়োগ, আধুনিক প্ল্যাটফর্ম ও বিশ্রামাগার নির্মাণ এবং ঢাকা-খুলনা ও খুলনা-রাজশাহী রুটে সাগরদাঁড়ি, কপোতাক্ষ ও রূপসা এক্সপ্রেস ট্রেনের আপ-ডাউন যাত্রাবিরতির বিষয়েও আশ্বাস দেন তিনি। পরে আন্দোলনকারীরা অবরোধ তুলে নিলে ট্রেন চলাচল স্বাভাবিক হয়।


চুয়াডাঙ্গার সহকারী নির্বাহী প্রকৌশলী মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, আনসারবাড়ীয়া স্টেশনে রেলপথ অবরোধ করে স্থানীয়দের বিক্ষোভের কারণে ট্রেনের সময়সূচিতে বিপর্যয় ঘটেছে। ট্রেন চলাচল স্বাভাবিক হয়েছে। তবে আপ-ডাউন ট্রেনের সময়সূচির বিপর্যয় কাটাতে প্রায় এক সপ্তাহ সময় লাগবে। উল্লেখ্য, লোকবল সংকটের কারণ দেখিয়ে ২০১০ সালের ২৮ মার্চ ও ২০১৮ সালের ৫ জুলাই আনসারবাড়ীয়া রেলওয়ে স্টেশনের স্বাভাবিক কার্যক্রম বন্ধ ঘোষণা করা হয়।



কমেন্ট বক্স