দিলীপ কুমার আগরওয়ালা
- আপলোড তারিখঃ
২৮-০৯-২০১৭
ইং
দুর্গাপূজার সার্বজনীনতা সকালের কাছে সমাদৃত হোক
দুর্গোৎসব আনন্দ-মিলনের উৎসব। সে আনন্দ ধর্ম সম্প্রদায়ের গ-ি পেরিয়ে সমাজের সবাইকে কাছে ডেকে নেয়। দুর্গোৎসব হয়ে উঠেছে বাঙালি সংস্কৃতির অন্যতম বৃহৎ সামাজিক উৎসব। বাঙালি হিন্দু সম্প্রদায় এই উৎসবকে তাদের ধর্মীয় ও সামাজিক জীবনের একটি কেন্দ্রীয় উৎসব হিসেবে দেখে। দুর্গোৎসব আদিতে ছিল বনেদি জমিদারদের উৎসব। কালক্রমে এর আকর্ষণ বর্ণনির্বিশেষে হিন্দু সমাজের সব অংশেই ছড়িয়ে গেছে। এ উৎসবে হিন্দু, মুসলমান, খ্রিষ্টান, বৌদ্ধসব সম্প্রদায়ের প্রতিবেশীর মধ্যে শুভেচ্ছা ও সম্প্রীতির আদান-প্রদান ঘটে। এর মাধ্যমে প্রতিভাত হয় বাঙালি সংস্কৃতির মিলনাত্মক বৈশিষ্ট্য, প্রকাশিত হয় নারী তথা মাতৃচরিত্রের প্রতি শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা। এই গুণাবলি একই সঙ্গে ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক।
দেশজুড়ে উৎসাহ-উদ্দীপনা ও সম্প্রীতির পরিবেশে দুর্গোৎসব উদ্যাপিত হচ্ছে। রাজধানী ঢাকা, আমার নিজের জেলা চুয়াডাঙ্গাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানের পূজাম-পগুলোতে বিভিন্ন ধর্ম-সম্প্রদায়ের সব বয়সের দর্শনার্থীর ভিড় লক্ষ করা যাচ্ছে। দেশজুড়ে দুর্গোৎসব উদ্যাপনে স্বাভাবিক শান্তিশৃঙ্খলা বিরাজ করছে। আমরা আশা করি, এই শান্তিপূর্ণ, সম্প্রীতিময় উৎসবমুখর পরিবেশেই দুর্গোৎসবের পরিসমাপ্তি ঘটবে। তবে একই সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী কর্তৃপক্ষেরও সজাগ দৃষ্টি রাখা প্রয়োজন, যাতে কোথাও শান্তিশৃঙ্খলার ব্যাঘাত না ঘটে।
বাংলাদেশ যে সত্যিকার অর্থেই সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির দেশ, সে সত্যটি আবারও প্রমাণিত হলো। চলতি বছর মুসলমানদের আশুরা এবং সনাতন ধর্মাবলম্বীদের শারদীয় দুর্গোৎসব এসেছে প্রায় একই সময়ে। আশুরা মুসলমানদের অন্যতম ধর্মীয় উৎসব। বাঙালি হিন্দুদের কাছে শারদীয় দুর্গোৎসব আবেগের অংশ হিসেবে বিবেচিত। ধর্মান্ধতার নোংরা দৈত্য যখন দেশে দেশে অসহিষ্ণুতার বিষ নিঃশ্বাস ছাড়ছে, সে মুহূর্তে কোনো দেশই এ হুমকি থেকে মুক্ত নয়।
আশার কথা, ধর্মান্ধতা থাবা বিস্তার করতে গিয়ে বার বার ব্যর্থ হয়েছে এ দেশের মানুষের উদার ধর্মীয় মনোভাবের কারণে। চলতি বছর আশুরা ও শারদীয় দুর্গোৎসব পাশাপাশি উদযাপিত হলেও কোথাও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির ব্যত্যয় হয়নি।
বাঙালি হিন্দু সম্প্রদায়ের প্রধান ধর্মীয় উৎসব দুর্গাপূজা প্রতি বছরের মতো এবারও হাজির হয়েছিল ভক্তদের মাঝে। ষষ্ঠী তিথিতে বোধন ও অধিবাসের মধ্য দিয়ে যে আনুষ্ঠানিকতার শুরু হয় সপ্তমী, অষ্টমী ও নবমীর পূজা-অর্চনার পর বিজয়া দশমীতে প্রতিমা বিসর্জনের মধ্য দিয়ে তার সমাপ্তি হচ্ছে। দুর্গাপূজা উপলক্ষে দেশের হিন্দু সম্প্রদায়ের মধ্যে এবার যে উৎসবের আমেজ লক্ষ্য করা গেছে তা নজিরবিহীন।
দেশে এ বছর সর্বাধিকসংখ্যক পূজাম-পে দেবী অর্চনা হয়েছে। পূজাম-পগুলোয় সব ধর্মের মানুষের উপস্থিতি লক্ষণীয়। এ সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্ক সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির দেশ হিসেবে বাংলাদেশের অঙ্গীকারকেই বিশ্ববাসীর কাছে পরস্ফুটিত করেছে। দুর্গাপূজার লক্ষ্য হলো শুভশক্তির আরাধনা।
সনাতন ধর্মাবলম্বীদের বিশ্বাস, আদ্যাশক্তি মহামায়া হলেন সৃষ্টির আদি কারণ। অশুভশক্তির বিনাশ ও শুভশক্তির অভ্যুদয় দুর্গা আরাধনার মূল উদ্দেশ্য হিসেবে বিবেচিত। যুগের বিবর্তনে দুর্গোৎসব বাঙালির লোকজ সংস্কৃতির অনুষঙ্গ হিসেবে ঠাঁই পেয়েছে। বাঙালি ঐতিহ্যগতভাবেই উৎসবপ্রিয়।
সারা দুনিয়ার মতো সাম্প্রতিক বছরগুলোয় আমাদের দেশেও জঙ্গিবাদের নোংরা দানব থাবা বিস্তারের চেষ্টা করেছে। অন্ধকারের এই জীবেরা বাংলাদেশের অসাম্প্রদায়িক ভাবমূর্তি বিনষ্টের অপচেষ্টাও চালিয়েছে নানাভাবে। আশার কথা, বাংলাদেশের মানুষের উদার ও অসাম্প্রদায়িক চেতনার কাছে বিভেদকামী অপশক্তি কোনো ঠাঁই পায়নি। এ বছর আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা দুর্গাপূজা উপলক্ষে শান্তিশৃঙ্খলা রক্ষায় যে আন্তরিক ভূমিকা রেখেছেন তা প্রশংসার দাবিদার।
ধর্মীয় উগ্রবাদ দুনিয়াজুড়ে মানুষের অস্তিত্বের জন্য হুমকি সৃষ্টি করছে। অথচ সবারই জানা ধর্ম ও ধর্মীয় উগ্রবাদ পরস্পরবিরোধী দুটি বিষয়। দুনিয়ার সব ধর্মই শান্তির কথা বলে। সত্য, সুন্দর ও কল্যাণ সব ধর্মের উপজীব্য বিষয়। হিংসা ও হানাহানিকে কোনো ধর্মই গ্রহণযোগ্য বলে মনে করেনি। ধর্মীয় উগ্রবাদ হলো বিকৃত চিন্তা-চেতনার নিকৃষ্ট ফসল। যে কারণে কোনো ধর্ম অপর ধর্ম সম্পর্কে অসহিষ্ণু হওয়ার শিক্ষা না দিলেও উগ্রবাদীরা সে ভুল পথ বেছে নিয়েছে। শান্তি ও সহাবস্থানের ধারাকে ক্ষুন্ন করতে চাচ্ছে বিকৃত চেতনার অনুসারীরা। বাংলাদেশ যেমন পীর-আউলিয়ার দেশ তেমন এ দেশ বৈষ্ণব সাধকদের দেশ। পীর-আউলিয়ারা এ দেশবাসীকে ভালোবাসার ডোরে বেঁধে কাছে টেনেছেন। সবার উপরে মানুষ সত্য এই বাণী প্রচার করেছেন বৈষ্ণব কবি চ-ীদাস। আমরা আশা করব, ১৬ কোটি মানুষের এই মহান জাতি ধর্মীয় সহিষ্ণুতাকে তাদের পাথেয় হিসেবে যে কোনো মূল্যে অব্যাহত রাখবে।
(লেখক: পরিচালক, এফবিসিসিআই, সাধারণ সম্পাদক, বাংলাদেশ জুয়েলার্স সমিতি ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক, ডায়মন্ড ওয়ার্ল্ড লিমিটেড।)
কমেন্ট বক্স