ঝিনাইদহের গ্রামাঞ্চলে অনলাইন জুয়ার আসক্তি বাড়ছে। এই জুয়া খেলার প্রবণতা কিশোর, যুবক ও নারীদের মাঝে বেশি লক্ষ্য করা যাচ্ছে। অনলাইন জুয়ার আসক্তি দিনকে দিন ভয়াবহ রূপ ধারণ করলেও প্রশাসনিক কোনো প্রতিকার নেই। টাকার লোভে মানুষ অনলাইন জুয়ায় লগ্নি করে ফতুর হয়ে যাচ্ছে। এদিকে, জুয়ায় সর্বস্ব হারিয়ে হতাশায় আত্মহত্যার ঘটনাও বৃদ্ধি পাচ্ছে। ফলে মোবাইল অ্যাপস নিয়ন্ত্রণকারীদের কাছে জুয়ার মাধ্যমে পাচার হয়ে যাচ্ছে কোটি কোটি টাকা।
তথ্য নিয়ে জানা গেছে, সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রকাশ্যে জুয়ার বিজ্ঞাপন প্রচার করা হচ্ছে। চটকদার এসব বিজ্ঞাপণে সাকিব আল হাসানসহ নামি-দামী তারকাকে ব্যবহার করা হচ্ছে। এতে মানুষ প্রলোভিত হয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ছে অনলাইনে টাকা উপার্জনের নেশায়। ঝিনাইদহ সদর উপজেলার গান্না এলাকায় জুয়ায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে লালু মিয়া নামের এক ব্যক্তি আত্মহত্যা করেছে। স্ত্রী ও তার ছোট ছোট তিন সন্তান এখন নিরুপায়। এছাড়া ঋণগ্রস্ত হয়ে বাড়ি ছাড়া ও দাম্পত্য কলহের বেশ কয়েকটি ঘটনা ঘটেছে জেলায়।
অনলাইনে টিকে-৭৭৭, জয়া-৯৯৯, ক্যাসিনো-৭৭৭, হাউজ অব ফান, স্টার স্লট, লাকি স্পিন স্লট, ওয়ান এক্স বেট, লুডো কিং, তিন পাত্তি গোল্ড, ২৯ গোল্ড কার্ড গেম, বেট কুইন ও ৩৬৫ বেটসহ অসংখ্য জুয়ার অ্যাপে আসক্ত হয়ে পড়ছে সব বয়সের মানুষ। এসব অ্যাপে বিকাশ ও নগদ মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে টাকা লেনদেন হয়। সোশ্যাল মিডিয়ার চটকদার বিজ্ঞাপনের জন্য ব্যবহার করা হয় জনপ্রিয় তারকা, ক্রিকেটার, রাজনৈতিক নেতার ছবি।
সদর উপজেলার বেতাই গ্রামের নিলুফা খাতুন জানান, তার স্বামী লালু মিয়া মোবাইল জুয়ায় আসক্ত হয়ে পড়ে। জুয়া খেলতে গিয়ে সে গরু বিক্রি ও জমি বন্ধক রাখে। জাগরণী চক্রসহ ৪টি এনজিও থেকে ঋণ নিয়ে সেই টাকা দিয়ে জুয়া খেলে হেরে যায়। অবশেষে ঋণের বোঝার চাপে সে আত্মহত্যা করে। ছোট-ছোট ছেলে মেয়ে নিয়ে মহাকষ্টে পড়েছেন তিনি।
ঝিনাইদহ সদর উপজেলার গান্না বাজারের বড় মুদি ব্যবসায়ী মো. কবির হোসেনের দোকানে প্রতিদিন দেড়-দুই লাখ টাকা বেচাকেনা হতো। জুয়াড়ি যুবকদের প্ররোচণায় তিনি জুয়া খেলতে শুরু করেন। জুয়া লাভজনক ভেবে তিনি জনতা ব্যাংক থেকে সিসি ঋণ নিয়ে ১৫ লাখ টাকা জুয়ায় হেরে যায়। কবির হোসেন বলেন, জুয়ার নেশায় আমি নিঃস্ব হয়ে গেছি। এখন আমার কিছুই নেই। সদর উপজেলার চান্দেরপোল গ্রামে তাইজেল হোসেনের ছেলে রেজাউল ইসলাম তরকারির দোকান দিয়ে জীবিকা নির্বাহ করতেন। তিনিও অনলাইন জুয়া খেলায় ৮০ হাজার টাকা হেরেছেন।
রেজাউল ইসলাম জানান, শুনেছিলাম মোবাইলে খেলা করে অনলাইনে টাকা উপার্জন করা যায়। সেই জন্য জুয়ার অ্যাপস মোবাইলে নিয়ে খেলতে শুরু করি। এখন আমি নিঃস্ব হয়ে পড়েছি। তথ্য নিয়ে জানা গেছে, ঝিনাইদহের অনেক বাজারে কিছু যুবক নিজস্ব এ্যাপস বানিয়ে জুয়ার রমরমা আসর বসিয়েছে। জুয়া খেলে নিঃস্ব যুবকরা ঋণগ্রস্ত হয়ে অপরাধের সাথেও জড়িয়ে পড়ছে বলে তথ্য মিলেছে।
এ বিষয়ে ঝিনাইদহের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ক্রাইম অ্যান্ড অবস) মহিদুর রহমান বলেন, জুয়া খেলার এই বিজ্ঞাপন সরকারী ভাবে বন্ধ না হলে তা রোধ করা যাবে না। এটা বিটিআরসির নিয়ন্ত্রনে হওয়ায় পুলিশের কিছুই করার নেই। রাষ্ট্র উদ্যোগ নিলেই কেবল অনলাইন জুয়া বন্ধ করা সম্ভব। তিনি আরও বলেন, বিভিন্ন সেলিব্রেটির ছবি ব্যবহার করে সোশ্যাল মিডিয়ায় জুয়ার বিজ্ঞাপন দিয়ে থাকে। এতে শুধু গ্রামের মানুষই নয়, অনেক বুঝদার চাকরীজীবীও আসক্ত হয়ে পড়ছে।
সমীকরণ প্রতিবেদন