বেগমপুরের জমিদার বাড়ির কাচারীঘর সংরক্ষণের উদ্যোগ
- আপলোড তারিখঃ
০৫-১১-২০২১
ইং
অবশেষে চুয়াডাঙ্গা সদর উপজেলা নির্বাহী অফিসারের (ইউএনও) উদ্যোগে জমিদার শয়েরাম রায়ের কাচারীঘর সংরক্ষণের উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। সংরক্ষণের লক্ষ্যে ইতোমধ্যে অবৈধ দখল মুক্ত ও ঝোপ জঙ্গল পরিস্কার করা হয়েছে। জমিদার শয়েরাম রায় ও ইতিহাসের আলোচিত-সমালোচিত নারী ঘষেটি বেগমের স্মৃতি বিচারিত স্থাপনা সংরক্ষণ করা হচ্ছে, এমন সংবাদে খুশি এলাকার সচেতন মহল। উপজেলা নির্বাহী অফিসারের এমন উদ্যোগকে সাধুবাদ জানিয়েছেন এলাকাবাসী।
জানা গেছে, চুয়াডাঙ্গা সদর উপজেলার বেগমপুর গ্রামে কালের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে জমিদার শয়েরাম রায়ের ঐতিহ্যবাহী কাচারী ঘর। দীর্ঘদিন যাবত এই কাচারী ঘরটি পরিত্যক্ত অবস্থায় থাকায় যেখানে ঝোপ জঙ্গলে ভরে গিয়েছিল। স্থানীয়রা পরিত্যক্ত কাচারী ঘরটি দখল নিয়ে গরু রাখার গোয়ালঘর হিসেবে ব্যবহার করতো। গত ৩১ অক্টোবর ২০২১ তারিখে বেগমপুর ইউনিয়ন পরিষদে এক মতবিনিময় সভায় ঐতিহ্যবাহী এই কাচারী ঘরটি সংরক্ষণ করার জন্য চুয়াডাঙ্গা সদর উপজেলা নির্বাহী অফিসার শামীম ভুইয়ার দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে তিনি বিষয়টি আমলে নিয়ে মতবিনিময় সভা শেষে সরেজমিনে পরিদর্শন করেন। গত ২ নভেম্বর তিনি আবারও সেখানে উপস্থিত হয়ে ইউনিয়ন ভূমি অফিসের কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের বাড়িটি দখল মুক্ত করে ঝোপ জঙ্গল পরিস্কার করার নিদের্শনা প্রদান করেন। উপজেলা নির্বাহী অফিসারের নির্দেশনা মোতাবেক কাচারীঘরটি দখল মুক্ত করে পরিস্কার-পরিচ্ছন করা হয়।
কথিত সূত্রে জানা যায়, কলকাতার বাসিন্দা কালীচরন রায়ের ছেলে শয়েরাম রায় নাটোরের রাজ পরিবারের রাজা রামক্রান্তের নিকট থেকে এই এলাকার জমিদারী ক্রয় করেন। এই জমিদারী এলাকা দেখভাল করার জন্য তিনি এখানে একটি থাকার বাড়ি নির্মাণ করেন। শয়রাম রায়ের পিতা মারা যাওয়ার পর তিনি বেগমপুরে চলে আসেন ও জমিদারী দেখাশোনা করার কাছে মনোনিবেশ করেন। তিনি জমিদার বাড়ির পাশেই কয়েক বছর পর জমির খাজনা আদায়ের জন্য একটি কাচারী ঘর বেগমপুর বাওরের পাশে একটি হাওয়া ভবন নির্মাণ করেন। শয়েরাম রায় নাটোরের রাজার অধীনস্থ ও নাটোরের রাজা আবার নবাব আলীবর্দির অধীনস্থ ছিলেন। নবাব আলী বর্দি খাঁর মেয়ে ইতিহাসের আলোচিত ও সমালোচিত নারী ঘষেটি বেগম পুরাতন চিত্রা নদী পথে কালীগঞ্জ হয়ে ঢাকায় আসা যাওয়া করতেন। বর্তমান বেগমপুর বাওড়টি চিত্রা নদীর মূল অংশ ছিল। এই নদীপথ দিয়ে ঘষেটি বেগম ঢাকায় যাওয়ার সময় জমিদার শয়েরাম রায়ের অনুরোধে আতিথেয়তা গ্রহণ করেনন। ঘসেটি বেগম যে ঘরে ছিলেন পরবর্তীতে সেই ঘরের নাম হয় বেগম হল। এই বেগম হল থেকেই পরবর্তীতে বেগমপুর নামকরণ হয়।
সরেজমিনে ঘুরে দেখা গেছে, কাচারীঘরের একটি কাঠের দরজায় লেখা আছে, অক্ষয় মিস্ত্রি। ধারণা করা হয়, তিনি ছিলেন বাড়ির নির্মাণশিল্পী। বর্তমানে কাচারী ঘরের মূল যে অংশটুকু বেহাল অবস্থায় টিকে আছে, ঘরের প্লাস্টার খসে পড়েছে, জানালা-দরজা ভেঙে গেছে, কিছু জায়গায় ছাদ ধসে পড়েছে। এই কাচারীঘরের ভেতরে অনিন্দ্যসুন্দর কারুকাজ লক্ষনীয়। কাচারীঘরে এখন চারটি রুম আছে। দুটি বেড রুম, একটি গেস্ট রুম ও আরেকটি বৈঠকখানা আছে। ঘরের ভেতর দেওয়ালে প্রদীপ জ্বালানোর জন্য খোপ বা কুঠোর রয়েছে। জানালা-দরজা কাঠ ও লোহা দিয়ে তৈরি। প্রতিটি কক্ষে দুটি দরজা আছে। দিনের বেলা পর্যাপ্ত আলো-বাতাসের জন্য প্রতি ঘরে ৩-৪টি ঘরে জানালা আছে। দেওয়ালগুলো ইট দিয়ে নির্মিত। ভবনের ছাদ লোহার পাটাতনের ওপর ঢালাই দেওয়া। তবে বেগম হলে যেখানে ঘষেটি বেগম ছিলেন, সে নতুন ভবন নির্মাণ করা হয়েছে। যা ইউনিয়ন ভূমি অফিসারের কার্যালয় হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। এই কাচারী ঘর থেকে দুই মিনিট উত্তর দিকে হাটলে জমিদার শহরাম রায়ের আরেকটি স্থাপত্য নিদর্শন দেখতে পাওয়া যায়। যেটাকে নদীপাড়ের বাড়ি বা হওয়া ভবন বলে। সেই ভনেন দীর্ঘদিন বেগমপুর ইউনিয়ন স্বাস্থ্যকেন্দ্র হিসেবে ব্যবহার হয়েছে। মুল ভবনটি ভেঙে পড়ার পর পাশেই নতুন করে পাকা স্থাপনা নির্মান করে কমিউনিটি ক্লিনিক করা হয়েছে। তবে পুরাতন ঐতিহ্যবাহী ভবনটি সংরক্ষন করা হয়নি। এখানেও চারটি ঘর রয়েছে, যা ভেঙ্গে নষ্ট হয়ে গেছে। এখানে একটি গভীর কূপ বা ইন্দারা ও বাড়ির পেছনের দুই কক্ষে যেতে একটি গেট রয়েছে। গেটটি বর্তমানে বন্ধ। এই ভবনের পেছনের দিকে নদীতে অতীতে আসা যাওয়া ও স্নান ঘাট থাকার অস্তিত দেখতে পাওয়া যায়।
বেগমপুর,তিতুদহ ইউনিয়নের ইতিহাস ঐতিহ্য সংরক্ষণ কমিটি শেকড় এর সভাপতি শামীম হোসেন মিজি বলেন, ১৮৮০ সাল থেকে ১৯৪০ সালের সিএস (ঈঝ) জরিপে শহরাম রায়ের নাম উল্লেখ পাওয়া যায়। শহরাম রায়ের পিতা কালীচরণ রায় কলকাতার বাসিন্দা ছিলেন। বেগমপুরের বাওড় (সেই সময়ের চিত্রা নদী) দিয়ে নবাব আলীবর্দির কন্যা ঘষেটি বেগম কালিগঞ্জ হয়ে ঢাকা যাচ্ছিলেন। তখন ঘষেটি বেগম জমিদার শহরাম রায়ের অনুরোধে জমিদার বাড়িতে বিশ্রাম গ্রহণ করেন। ঘষেটি বেগম যে ঘরে বিশ্রাম গ্রহণ করেছিলেন, পরবর্তীতে সেই ঘরের নাম হয় বেগম হল। সেই বেগম হল থেকেই গ্রামের নামকরণ হয়ে যায় বেগমপুর। পরবর্তীতে ইউনিয়নেরও নামকরণ হয় বেগমপুর। তিনি আরো বলেন, এখন যেখানে বেগমপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় রয়েছে। সেখানে জমিদার শহরাম রায়ের তৈরী একটি ভবনকে ছিলো। সেটিও পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে গেছে।
এই বিষয়ে বেগমপুর ইউনিয়ন পরিষদের সচিব ফয়জুর রহমান বলেন, বেগমপুর ইউনিয়নের সকল ইতিহাস ঐহিত্য সংরক্ষণ করার জন্য ইতিমধ্যে চেয়ারম্যানের সাথে প্রাথমিকভাবে আলোচনা করা হয়েছে। বেগমপুর ইউনিয়নের ইতিহাস ঐতিহ্যগুলো সঠিকভাবে সংরক্ষণ করে তা আগামী প্রজম্মের মাঝে তুলে ধরার জন্য প্রয়োজণীয় ব্যবস্থা গ্রহন করা হবে। সে কারনে ইতিমধ্যেই কাজ শুরু করেছি।
বেগমপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আলী হোসেন জোয়ার্দ্দার বলেন, বেগমপুর কেন্দ্রীক ইতিহাস ঐতিহ্য সংরক্ষণ করে তা আগামী প্রজম্মের মাঝে তুলে ধরা আমাদের দায়িত্ব। দেরীতে হলেও আমরা উদ্যোগ নিচ্ছি। বেগমপুর ইউনিয়নের ইতিহাস ও ঐহিত্যবাহী স্মৃতিগুলো সংরক্ষনে সকলের সহযোগিতা কামনা করছি। হঠাৎ করে জমিদার শহরাম রায়ের কাচারী ঘর দখলমুক্ত ও পরিস্কার পরিছন্ন রার উদ্যোগ নেওয়া প্রসঙ্গে চুয়াডাঙ্গা সদর উপজেলা নির্বাহী অফিসার শামীম ভুইয়া বলেন, সঠিক ইতিহাস সংরক্ষণ করে তা আগামী প্রজম্মের মাঝে তুলে ধরা আমাদের সকলের দায়িত্ব। বেগমপুরের এই কাচারী ঘর নিয়ে যে কথিত ইতিহাস রয়ে,েছ তা যাচাই বাচাই করে সংরক্ষন করার ইচ্ছা আছে। আপাতত কাচারীঘরটি দখল মুক্ত ও ঝোপ জঙ্গল পরিস্কার করা হয়েছে।
কমেন্ট বক্স