বিলের জলে ভেসে গেল ঘরামী পিতার স্বপ্ন!
- আপলোড তারিখঃ
২৩-০৭-২০২০
ইং
কার্পাসডাঙ্গায় বজ্রপাতে মেধাবী শিক্ষার্থী জাসিদুলের মৃত্যু
এম এ মামুন:
চুয়াডাঙ্গা শহর থেকে ২২ কিলোমিটার পশ্চিমে দামুড়হুদা উপজেলার আরামডাঙ্গা গ্রাম। এই গ্রামের পশ্চিমপাড়ায় ষাটোর্ধ্ব ঘরামী দিনমজুর আব্দুল ওহাবের বসবাস। বাঁশের বেড়া টিনের ছাউনি দিয়ে তৈরী দুই কামরার ছোট্ট ঘরে তিন পুত্র সন্তানকে ঘিরে স্বপ্নের জাল বুনছিল আব্দুল ওহাব। দিন আনা দিন খাওয়া। এক বেলা খাওয়া হলে আরেক বেলা উপোস থাকতে হয়। অভাবই যেন তাদের নিত্যদিনের সঙ্গী। রোগে জরাজীর্ণ ও বয়সের ভারে নুয়ে পড়া শরীর নিয়েই আব্দুল ওহাবকে দিনরাত পরিশ্রম করতে হয়। সেই সংসারে যখন মৃত্যুর বাজ পড়ে, তখন কষ্টের সংসারে, কষ্ট আরও বেড়ে যায়। আব্দুল ওহাবের তিন ছেলের মধ্যে বড় ছেলে জাহিদুল গত ৬ মাস আগে আলসার রোগে চিকিৎসার অভাবে মারা যায়। বেঁচে ছিল দুই ছেলে জাসিদুল ও রাশিদুল। জাসিদুল দামুড়হুদা আব্দুল ওদুদ শাহ ডিগ্রি কলেজে হিসাব বিজ্ঞান নিয়ে অনার্সের শেষ বর্ষের মেধাবী ছাত্র ছিল। আর সবার ছোট রাশিদুল কার্পাসডাঙ্গা মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের নবম শ্রেণির ছাত্র। পরের জমিতে কামলা দিয়ে কষ্টের টাকায় অনার্স ফাইনাল বর্ষের পরীক্ষার প্রস্তুতিও নিচ্ছিল জাসিদুল। স্বপ্ন ছিল, পরীক্ষা শেষ হলেই ভালো চাকরি নিয়ে বাবা-মার কষ্ট ঘোচাবে। গ্রামের আর পাঁচটা ছেলেদের থেকে জাসিদুল ছিল সবার চোখে অমায়িক এক যুবক। পাড়া প্রতিবেশীদের কাছেও ছিল আদর-স্নেহের পাত্র। বুকের মধ্যে লালিত স্বপ্ন নিয়ে জাসিদুলও যেমন দিন গুনছিল তেমনি তার ঘরামী পিতা আব্দুল ওহাবও অন্যের ঘরের ছাউনি ঠিক করতো আর স্বপ্ন দেখতো, তাঁর জাসিদুল আর কটা ক্লাস পাস করলেই পাবে বড় একটা চাকরি। ঘুচবে তাদের সব অভাব। কিন্তু নিয়তির কী নির্মম পরিহাস! গত ২১ জুলাই বজ্রপাতে জাসিদুলের মৃত্যু হলে আরামডাঙ্গার সিতলার চর বিলে ভেসে গেল দিনমজুর আব্দুল ওহাব ও স্বপ্নবাজ জাসিদুলের সব স্বপ্ন।
দিনমজুর আব্দুল ওহাব বলেন, ‘আমার স্বপ্ন ভেসে গেল। আমি জীবনভর কষ্টের আগুনে পুড়ছি। আল্লাহর বিচারে যা হচ্ছে তাই তিনি করছেন। এখন শেষ ভরসা আমার ছোট ছেলে রাশিদুল। জাসিদুলকে আল্লাহ তুলে নিলেন। এখন রাশিদুলকে মানুষের মতো মানুষ করতে পারি, সেই প্রার্থনা আল্লাহর কাছে।’
জানা যায়, করোনা মহামারীতে বাবার কাজ নেই। তাই কমাস ধরে অনাহার-অর্ধাহারে কাটছে কাটছিল জাসিদুলদের দিন। ধার-দেনায় চুলা জ্বললেও তরকারীর অভাবে একমুঠো ভাত তৃপ্তি করে খাওয়ার সাধ্য ছিল না তাদের। বাবা-মার বয়স হয়েছে, ভাতের সঙ্গে একটু ভালো তরকারী হলে ভালো হয়। কদিন থেকে প্রবল বর্ষায় খাল-বিল থেকে অনেকে মাছ ধরে আনছে। স্বপ্নবাজ জাসিদুল বাবা-মার কথা ভেবে গত মঙ্গলবার বিকেলে নিজ গ্রাম আরামডাঙ্গার সিতলার চর বিলে মাছ ধরতে যায়। এসময় বৃষ্টি মাথায় বিলে জাল পাততে গেলে বজ্রপাতে জাসিদুল বিলের পানি-কাদার মধ্যে পুতে তার মর্মান্তিক মৃত্যু হয়। গতকাল বুধববার এক হৃদয়বিদারক পরিবেশে মেধাবী শিক্ষার্থী জাসিদুল দাফনকার্য সম্পন্ন হয়। জাসিদুল নামের এই মেধাবী শিক্ষার্থীর মৃত্যুতে এলাকার বাতাস এখনো ভারী হয়ে আছে।
উল্লেখ্য, জাসিদুল বিকেলের দিকে বৃষ্টির সময় তাদের বাড়ির কাছে শিতাল চারা মাঠের বিলে মাছ ধরতে যায়। এ সময় বজ্রপাতে ঘটনাস্থলেই তার মৃত্যু হয়। পরের দিন সকালে গ্রামের লোকজন বিলে মাছ ধরতে গিয়ে তার মরদেহ দেখতে পাই। বজ্রপাতে জাসিদুলের দেহের কিছু অংশ পুড়ে যায়। কার্পাসডাঙ্গা ফাঁড়ির এসআই মেজবাহুর রহমান জানান, পরিবারের লোকজন নিখোঁজের খবর দেওয়ার পর আমরা সারা রাত মাঠে খোঁজাখুজি করেছি, কিন্তু রাতে তাকে খুঁজে পাওয়া যায়নি। বুধবার সকাল বেলা সাড়ে ১১টার দিকে আরামডাঙ্গা কবরস্থানে জাসিদুলেরজানাজার নামাজ শেষে দাফনকার্য সম্পন্ন করা হয়। জাসিদুলের মৃত্যুতে এলাকায় শোকের ছায়া নেমে এসেছে।
কমেন্ট বক্স