উন্নয়ন ও অধিকার
- আপলোড তারিখঃ
২০-০৫-২০১৯
ইং
'-মহসিন আলী
সাধারণভাবে ‘উন্নয়ন’ বলতে যে কোনো বিষয় বা ক্ষেত্রের ইতিবাচক পরিবর্তনকে বোঝায়। আমাদের দেশে রাস্তা-ঘাট, ব্রিজ-কালভার্ট, হাসপাতাল, স্কুল, কলেজ, কল-কারখানা ইত্যাদির দৃশ্যমান অগ্রগতি এবং সাধারণ মানুষের জীবনমানের গুণগত ইতিবাচক পরিবর্তনকে উন্নয়নের বিষয় হিসেবে ধরা হয়। উন্নয়ন হলো পরিবর্তনের একটি প্রক্রিয়া, যা বস্তুগত ও মানসিক উভয় ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য। যে কোনো দেশের উন্নœয়ন বিশ্লেষণে অর্থনৈতিক, সামাজিক, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক দিকসমূহই প্রধানত আলোচনায় আসে। কারণ এ বিষয়গুলো বিশ্লেষণ করলে দেশের উন্নয়নের অবস্থান প্রাথমিকভাবে অনুমান করা যায়। তবে উন্নয়নের ক্ষেত্র আরও বড়। একটি দেশের মাথাপিছু আয়, জাতীয় আয়, সঞ্চয় এবং অন্যান্য অর্থনৈতিক সূচকের ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা কতটুকু হচ্ছে সেটাই হলো অর্থনৈতিক উন্নয়নের মাপকাঠি।
যেমন, ২০১৭-১৮ অর্থবছরে বাংলাদেশে মাথাপিছু আয়ের পরিমাণ আগের বছরের ১৬১০ ডলার থেকে বেড়ে ১৭৫১ ডলারে উন্নীত হয়েছিল, যাকে দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন হিসেবে অভিহিত করা যায়। অর্থনৈতিক উন্নয়নের পাশাপাশি একটি দেশের সামগ্রিক উন্নয়নে ‘সামাজিক উন্নয়ন’ গুরুত্বপূর্ণ। এর ব্যাপ্তিও অনেক বিস্তৃত। খাদ্য-বস্ত্র-বাসস্থানের নিশ্চয়তা, উন্নত শিক্ষা ও স্বাস্থ্য, শিশু ও যুব উন্নয়ন, নারীর ক্ষমতায়ন, ন্যায্য সমাজব্যবস্থা, দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন ও সচেতনতা বৃদ্ধি ইত্যাদি বিষয়সমূহ সামাজিক উন্নয়নকে নির্দেশ করে। অপরদিকে, অধিকার হলো কিছু স্বীকৃত বা বৈধ ক্ষমতা, যা মানুষ তার বিশেষ অবস্থানের কারণে ভোগ করে থাকে। আমরা জানি, অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান, চিকিৎসা ও শিক্ষা হচ্ছে মানুষের মৌলিক মানবাধিকার। মানবাধিকারের বৈশিষ্ট্য হলো এটি অবিভাজ্য, সর্বজনীন, অপ্রত্যাহারযোগ্য ও সহজাত। বিভিন্ন দেশে ‘উন্নয়ন এবং অধিকার’ এর পারস্পরিক সম্পর্ক নিয়ে বিতর্ক রয়েছে। কোনো কোনো দেশের মতো আমাদেরও অনেকে অধিকারের বিষয়কে গুরুত্ব না দিয়ে উন্নয়ন বলতে শুধুমাত্র দৃশ্যমান অর্থনৈতিক ও সামাজিক অগ্রগতির বিষয়সমূহকে তুলে ধরেন।
অপরদিকে উন্নয়নের ক্ষেত্রে অধিকারকে গুরুত্ব দিয়ে যারা কাজ করেন, তারা গণতন্ত্র, বৈষম্যহীনতা, চিন্তা, বিবেক ও বাক স্বাধীনতা ইত্যাদিকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব প্রদান করেন। প্রকৃতপক্ষে, উন্নয়ন ও অধিকার ওতোপ্রোতভাবে জড়িত। একদিকে, অর্থনৈতিক ও সামাজিক উন্নয়ন এবং অপরদিকে বাক স্বাধীনতা, গণতন্ত্র, ন্যায্যতা ইত্যাদি কোনো একটি অংশ বাদ দিয়ে অন্যটি প্রকৃত সাফল্য লাভ করতে পারে না। ইউরোপের উন্নত দেশসমূহ মানবাধিকারের ভিত্তিতে পরিচালিত হওয়ায় সে সকল দেশে উন্নয়ন ও অধিকারের বিষয়গুলো সমান্তরালভাবে বাস্তবায়িত হয় এবং তারা সর্বোচ্চ সাফল্য অর্জন করেছে। আমাদের দেশে এ বিষয়ক বিতর্কটি সমাধানের ক্ষেত্রে আমাদের সংবিধান ও জাতিসংঘের বিভিন্ন ঘোষণার দিকে মনোযোগ দেয়া যেতে পারে।
আমাদের সংবিধানের ১৫ অনুচ্ছেদে সুনির্দিষ্টভাবে বলা হয়েছে `(ক) অন্ন, বস্ত্র, আশ্রয়, শিক্ষা ও চিকিৎসাসহ জীবনধারণের মৌলিক উপকরণের ব্যবস্থা; (খ) কর্মের অধিকার এবং (ঘ) সামাজিক নিরাপত্তার অধিকার, অর্থাৎ বেকারত্ব, ব্যাধি বা পঙ্গুত্বজনিত কিংবা বৈধব্য, মাতা পিতৃহীনতা বা বার্ধক্যজনিত কিংবা অনুরূপ অন্যান্য পরিস্থিতিজনিত আয়ত্তাতীত কারণে অভাবগ্রস্ততার ক্ষেত্রে সরকারী সাহায্য লাভের অধিকার।` এবং ১১ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে `প্রজাতন্ত্র হইবে একটি গণতন্ত্র, যেখানে মৌলিক মানবাধিকার ও স্বাধীনতার নিশ্চয়তা থাকিবে, মানবসত্তার মর্যাদা ও মূল্যের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ নিশ্চিত হইবে এবং প্রশাসনের সকল পর্যায়ে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের মাধ্যমে জনগণের কার্যকর অংশগ্রহণ নিশ্চিত হইবে।` তৃতীয় ভাগ ‘মৌলিক অধিকার’ অংশে সমতা, বৈষম্যহীনতা, আইনের আশ্রয় লাভ, ব্যক্তি-চলাফেরা-সমাবেশ-সংগঠন-ধর্মীয় এবং চিন্তা, বিবেক ও বাক-স্বাধীনতার উল্লেখ রয়েছে। পাশাপাশি ১৯৪৮ সালে জাতিসংঘের সর্বজনীন মানবাধিকার ঘোষণার অনুচ্ছেদ ২৫(১) ধারা অনুযায়ী `প্রত্যেক ব্যক্তির নিজের এবং তার পরিবারের কল্যাণ ও সুস্বাস্থের জন্য খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান, চিকিৎসা ও প্রয়োজনীয় সেবাসহ জীবনযাত্রার পর্যাপ্ত মানের অধিকার` এবং ১৮ ও ১৯ অনুচ্ছেদে প্রত্যেক ব্যক্তির চিন্তা, বিবেক, ধর্ম প্রতিপালন এবং মত ও ভাব প্রকাশের স্বাধীনতার অধিকারের কথা উল্লেখ রয়েছে।
এ ধারাবাহিকতায় ১৯৬৬ সালে ‘অর্থনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অধিকার বিষয়ক আন্তর্জাতিক সনদের বিভিন্ন অনুচ্ছেদে এসব অধিকারের বিস্তারিত উল্লেখ করা হয়েছে। সর্বজনীন মানবাধিকার ঘোষণার বিবরণ অনুযায়ী উল্লিখিত সকল অধিকার বাস্তবায়নে প্রধান ভূমিকা হচ্ছে রাষ্ট্রের। বিভিন্ন আইন ও নীতির মাধ্যমে রাষ্ট্রকে এসব কার্যকর করতে হবে। পৃথিবীর সকল দেশের মতো আমাদের দেশেও সংশ্লিষ্ট অধিকারসমূহ প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে সরকারের পাশাপাশি নাগরিক সমাজের সংগঠন ও প্রতিষ্ঠানসমূহ (এনজিও) উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করে আসছে। তাই উন্নয়ন ও অধিকারকে পৃথকভাবে দেখার কোনো সুযোগ নেই। বিভিন্ন ক্ষেত্রে রাষ্ট্র যেসব সুযোগ-সুবিধা প্রদান করে থাকে তা নাগরিক হিসেবে মানুষের প্রাপ্য বা অধিকার এবং নাগরিকদের পক্ষ থেকে দায়িত্ব হিসেবে রাষ্ট্রের করণীয়। আমাদের দেশে চলমান উন্নয়নের পাশাপাশি ক্ষুধা, দারিদ্র্য, বৈষম্যসহ বহুমুখী সীমাবদ্ধতা যেখানে এখনও বিদ্যমান সেখানে অধিকারভিত্তিক দৃষ্টিভঙ্গির আলোকে উন্নয়নকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার কোনো বিকল্প নেই। এ দৃষ্টিভঙ্গি অনুযায়ী জনগণের অংশগ্রহণে উন্নয়ন পরিকল্পনা ও বাস্তবায়ন কার্যকর করা গেলে সে উন্নয়ন টেকসই হবে। যা আমাদের দেশকে উন্নয়নশীল ও মধ্য আয়ের দেশ হিসেবে প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখবে।
কমেন্ট বক্স