আইন অমান্য করে মেহেরপুরের লোকালয়ে অবৈধ ইটভাটা : নষ্ট হচ্ছে আবাদি ফসল
- আপলোড তারিখঃ
০৭-০২-২০১৮
ইং
৯৫টি ইটভাটার মধ্যে ৪৪টিতেই অবৈধ ড্রামচিমনি : একেকটি ইটভাটায় প্রতিদিন পোড়ানো হচ্ছে ৪শ’ মণ কাঠ
মাসুদ রানা: মেহেরপুরের মুজিবনগর উপজেলায় দারিয়াপুর ইউনিয়নের কাঠালপোতা মাঠ জুড়ে চোখে পড়ে দৃষ্টিনন্দন ফসলি জমি। ধান, সরিষা, লালশাকসহ বিভিন্ন ফসল। কৃষকরা একনিবিষ্টি মনে ক্ষেতে পরিচর্যায় ব্যস্ত। ব্যস্ততা রেখে ওই মাঠের ৫০ বছরের বৃদ্ধ মোকাম আলী নামের একজন কৃষক বলে ওঠলেন `বাবারে ওই ইটের ভাটার কারনে আবাদ নষ্ট হচ্ছে, কিছু একটা করেন`। তিনি বলেন, সারা জীবন চাষবাদ করে জীবন ধারণ করি। তবে কয়েকবছর ধরে মাঠে আবাদ ভালো হচ্ছে না। মাঠের ভিতরে স্টার ব্রিকস নামের একটি ইটের ভাটা দিনরাত কাঠপুড়িয়ে ইট তৈরি করে। ভাটার ধোয়া আর ছাই এসে ফসলি জমিতে পড়ে। ধানের পাতায় ছাই পড়ে গত বার ধান ভালো হয়নি। এবারো কি হবে জানি না।
খোজ নিয়ে জানা গেছে, আইন অমান্য করে প্রভাবশালীরা ভাটাগুলো তিন ফসলি জমিতে ও লোকালয়ের একেবারে কাছে স্থাপন করেছেন। ১০ বছর আগে অবৈধ ঘোষণা করা টিনের তৈরি ড্রাম চিমনি দিয়ে চলছে ইটভাটাগুলো। এসব ভাটার শ্রমিকেরা জানান, প্রতিদিন একেকটি ভাটায় ৪০০ মণ কাঠ পুড়ছে। তিন ইটভাটার কারণে মাঠের ফসল উৎপাদন হ্রাস পাওয়াসহ স্থানীয় বাসিন্দারা সমস্যায় পড়েছেন। সরেজমিনে দেখা গেছে, উপজেলার মোনাখালি ইউনিয়নের ভবানিপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের খেলার মাঠের একেবারে গা ঘেষে গড়ে ওঠেছে চপল ব্রিকস নামের একটি টিনের ড্রাম দিয়ে তৈরি ইটভাটা। খেলার মাঠে বিদ্যালয়টির শিক্ষার্থী ছাড়াও এলাকার ছেলেরা ফুটবল, ক্রিকেটসহ অনান্য খেলা করতো। তবে ইটের ভাটার ছাই এসে খেলার মাঠে পড়ে বিধায় তারা বেশ কিছুদিন খেলাধুলা থেকে বিরত রয়েছে।
ওই বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আমিনুল ইসলাম বলেন, ইটের ভাটার কারনে বিদ্যালয়ের চারিপাশে লাগানো আমের মুকুল ঝরে যায়। কয়েকবছর ধরে গাছগুলোতে আম ধরে না। এ ছাড়াতো খেলার মাঠটিও অব্যবহৃত হয়ে পড়ে রয়েছে। ভাটামালিকেরা এলাকার প্রভাবশালি বলে তিনি কিছু বলতেও পারেন না। দারিয়াপুর গ্রামের জাহাঙ্গীর ও মোনাখালি গ্রামের সোনা মিয়া যৌথ মালিকানায় স্টার ব্রিকস ও চপল ব্রিকসের স্বত্তাধিকারি মনিরুজ্জামান চপল ভাটা দুইটির মালিক। ইটভাটা করতে হলে জেলা প্রশাসনের লাইসেন্স ও পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র থাকা বাধ্যতামূলক হলেও ইটভাটা মালিকদের কোনটাই নেই। তারা প্রভাবশালীদের সহায়তায় সবকিছু ম্যানেজ করে বছরের পর ধরে ফসলি ও লোকালয়ের জমিতে ভাটাগুলোতে ইট পুড়িয়ে আসছেন। স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, দারিয়াপুর মাঠের কাঠলপোতা গ্রামের এ মাঠে সারা বছর ফসল উৎপাদন হয়। আমন ও বোরো মৌসুমে ধান রোপন করেন কৃষকরা। এছাড়া এ জমিতে সবজি ও রবি ফসলও ব্যাপক পরিমানে উৎপাদন হয়। তবে ভাটাগুলোর কারনে কৃষকদের চাষাবাদ ব্যহত হচ্ছে।
দুটি ভাটার একটিতে চারপাশ ঘিরে কৃষকরা ধান, সরিষাসহ অন্যান্য রবি ফসল বুনেছেন। তবে ইটভাটা মালিকরা প্রায় ১২ বিঘা তিন ফসলি জমি কৃষকদের কাছ থেকে ইজারা নিয়ে সেগুলো মাটি সমান করে বালু ফেলছে। বর্ধিত এ জমিতে ইট প্রস্তুত করছেন শ্রমিকরা। স্টার ইট ভাটার মালিক জাহাঙ্গীর কবীর বলেন, গত ৭ বছর ধরে তিন ফসলি জমিতে ভাটাটি চলছে গত বছরে তিনিসহ আরেকজন ভাটাটি লিজ নেন। ভাটা স্থাপনের জন্য জেলা প্রশাসন ও পরিবেশ অধিদপ্তর থেকে কোন অনুমতি নেননি তিনি।
ইটভাটা প্রস্তুত ও ভাটা স্থাপন (নিয়ন্ত্রন) আইন ২০১৩ তে বলা আছে, কোন ফসলি জমি, সমতল ভূমি, ৫০টি পরিবার বসবাস করে এমন এলাকা কোনভা্েবই ইটভাটা স্থাপন করা যাবে না। এছাড়া জ্বালানি হিসেবে কোনভাবেই কাঠ, বাঁশের মোথা পোড়ানো যাবে না। একই সাথে জেলা প্রশাসন ও পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র নেয়া বাধ্যতামূলক। এছাড়া একই আইনে একটি অনুসন্ধান কমিটি গঠনের কথাও বলা আছে। সেই কমিটিতে একজন অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক, সংশ্লিষ্ট উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা, উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ও কৃষি কর্মকর্তা ও বন অধিদপ্তরের কর্মকর্তা। তারা সরেজমিন পরিদর্শন করে একটি প্রতিবেদন জেলা প্রশাসকের কাছে প্রদান করবেন। জেলা প্রশাসক প্রতিবেদন মূল্যায়ন করে লাইসেন্স প্রদান করবেন। তবে মেহেরপুর জেলায় এ ধরনের কোন কমিটি নেই। কমিটির কোন মিটিং হয় না। উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মোফাক্ষারুল ইসলাম বলেন,‘ইটভাটা স্থাপন করতে হলে তাদেরও মতামতের প্রয়োজন আছে। তবে গত দুই বছর এ ধরনের কোন সভায় তিনি ডাক পাননি।’
কুষ্টিয়া পরিবেশ অধিদপ্তর সূত্র জানায়, মেহেরপুরে ফিক্রাট চিমনির ভাটা আছে ৪১টি ও ড্রামচিমনির ভাটা হচ্ছে ৪৪টি। ড্রাম চিমনির ভাটায় ইট পোড়ানো একবারে অবৈধ। ফিক্রাট চিমনির পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র নেই। উচ্চ আদালতে রিট আবেদন করে তারা চালায়।
ভাটামালিক মনিরুজ্জমান চপল বলেন, কোথায় ইটভাটা করবো। মাঠে করা যাবে না। লোকালয়ে করা যাবে না তবে কোথাই করতে হবে। এখানে ১০০ জন শ্রমিক কাজ করে। ভাটাটি বন্ধ হলে তারা কর্ম হারাবে। এতে কি কেউ লাভবান হবে। তবে তারা আগামী বছর থেকে ড্রাম চিমনি বদলে ফেলে জিকজাক পদ্ধতিতে ইটপ্রস্তুত করার চেষ্টা করবেন। ইটভাটার শ্রমিক কেরামত ও বকুল হোসেন জানান, ‘ড্রাম চিমনির একটি ভাটা প্রায় ৫ মাস চলে। প্রতিদিন ৪০০ মণ কাঠ লাগে একটি ভাটায়। সেই হিসেবে মাসে প্রায় ১২ হাজার মণ কাঠ প্রয়োজন হয়। নাম প্রকাশ না করার শর্তে দুজন ভাটা মালিক জানান,‘উপজেলা প্রশাসন ও পরিবেশ অধিদপ্তরের কর্মকর্তাদের সাথে তাদের নিয়মিত যোগযোগ আছে। অবৈধ ভাটার জন্য তাদের প্রতি মাসে টাকা খরচ করতে হয়। তারপরও অনেক সময় অভিযানে জরিমানা গুনতে হয়।
কুষ্টিয়া, মেহেরপুর ও চুয়াডাঙ্গা নিয়ে তিনজেলার জন্য কুষ্টিয়া পরিবেশ অধিদপ্তর কার্যালয়। এই কার্যালয়ে প্রায় ১০ বছর ধরে এ্কই কর্মকর্তা আছেন। তিন জেলার দায়িত্বে থাকা কুষ্টিয়া পরিবেশ অধিদপ্তরের জেষ্ঠ্য কেমিষ্ট মিজানুর রহমান বলেন, ‘ড্রাম চিমনির মালিকরা আদালতে একটি রিট করেছেন। সেই রিটের কপি খুলনায় পাঠিয়েছেন। রিটে কি আছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, পড়ে দেখেনি। রিটে কাঠ দিয়ে ইট পোড়ানো ও তিন ফসলি জমিতে ইটভাটা স্থাপনের বিষয়ে কোন নির্দেশনা আছে কি-না জাইনে চাইলে তিনি বলেন, এ ধরনের কোন পয়েন্ট নেই। মেহেরপুর জেলা প্রশাসক পরিমল সিংহ বলেন, অবৈধ ইটের ভাটাগুলিকে বিভিন্ন সময় জরিমানা করা হয়। ভ্রাম্যমাণ আদালত তাদের কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। অচিরেই সব রকম অবৈধ ইটের ভাটা বন্ধ হবে।
কমেন্ট বক্স