ঝিনাইদহের হরিণাকুণ্ডু উপজেলার প্রায় আড়াই লাখ মানুষের চিকিৎসার একমাত্র ভরসা ‘হরিণাকুণ্ডু উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স’। কিন্তু বর্তমানে এই হাসপাতালটি নানাবিধ সংকটে নিজেই রোগী হয়ে ধুঁকছে। চিকিৎসক ও জনবল সংকট, ওষুধের ঘাটতি আর দায়িত্বপ্রাপ্তদের অনুপস্থিতিতে এখানে আসা রোগীরা কাঙ্ক্ষিত সেবা পাওয়ার বদলে চরম ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন। সরকারি এই প্রতিষ্ঠানটি এখন সাধারণ মানুষের জন্য কেবলই এক দীর্ঘশ্বাসের জায়গায় পরিণত হয়েছে।
রোগীদের অভিযোগ, ২০০৫ সালে হাসপাতালটিকে ৫০ শয্যায় উন্নীত করা হলেও আধুনিক চিকিৎসার ন্যূনতম সুযোগ-সুবিধা এখানে মিলছে না। দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ রয়েছে হাসপাতালের অপারেশন থিয়েটার। ফলে জরুরি অস্ত্রোপচারের প্রয়োজন হলে রোগীদের ঝিনাইদহ সদর হাসপাতাল বা বেসরকারি ক্লিনিকে দৌড়াতে হচ্ছে। হাসপাতালের এক্স-রে মেশিনটি থাকলেও নানা অজুহাতে সেটি প্রায়ই বন্ধ রাখা হয়। প্যাথলজি পরীক্ষার অবস্থাও তথৈবচ। গরিব রোগীরা দূর-দূরান্ত থেকে এসেও শেষ পর্যন্ত বাধ্য হয়ে বাইরের বেসরকারি ডায়াগনস্টিক সেন্টার থেকে চড়া মূল্যে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করাতে বাধ্য হচ্ছেন।
গতকাল শনিবার সরেজমিনে দেখা যায়, হাসপাতালের বারান্দায় অসুস্থ শিশুদের নিয়ে মায়েদের দীর্ঘ অপেক্ষা। প্রত্যন্ত গ্রাম থেকে আসা সাধারণ মানুষ সকাল থেকে লাইনে দাঁড়িয়েও ডাক্তারের দেখা পাচ্ছেন না।
হরিণাকুণ্ডুর দুর্লভপুর গ্রাম থেকে আসা রহিম উদ্দিন আক্ষেপ করে বলেন, "সকাল থেকে বসে আছি, কিন্তু ডাক্তারের দেখা নেই। আমরা গরিব মানুষ, বারবার শহরে যাওয়ার সামর্থ্য আমাদের নেই। এখানে সেবা না পেলে আমরা কোথায় যাব?" একই অভিযোগ হরিশপুর গ্রামের সালমা খাতুনের; তিনি জানান, ডাক্তার না থাকায় বাধ্য হয়ে তাকে বাড়তি টাকা খরচ করে ক্লিনিকে যেতে হচ্ছে।
অভিযোগ রয়েছে, অনেক চিকিৎসকের পদায়ন এই হাসপাতালে থাকলেও তারা নিয়মিত কর্মস্থলে যান না। ১৬৭ জন অনুমোদিত জনবলের বিপরীতে কর্মরত আছেন মাত্র ৯৯ জন। জনবলের এই বিশাল ঘাটতি আর কর্মরতদের একাংশের ফাঁকিবাজির কারণে ব্যাহত হচ্ছে সাধারণ চিকিৎসা সেবা। প্রতি মাসে গড়ে প্রায় ১৩ হাজার মানুষ এখান থেকে সেবা নেওয়ার চেষ্টা করলেও অর্ধেকের বেশি মানুষ অসন্তুষ্ট হয়ে ফিরে যাচ্ছেন।
এ বিষয়ে ঝিনাইদহের সিভিল সার্জন ডা. মো. কামরুজ্জামান সোহেল বলেন, অন্তত তিনজন চিকিৎসক নিয়মিত হাসপাতালে উপস্থিত থাকেন না এবং তাদের বিরুদ্ধে ইতিমধেই প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। তিনি আশ্বস্ত করেছেন যে, জনবল সংকট কাটিয়ে হাসপাতালের সেবার মান বৃদ্ধির জন্য কাজ চলছে।
তবে সাধারণ মানুষের প্রশ্ন, আর কতকাল তারা আধুনিক চিকিৎসা সেবা থেকে বঞ্চিত থাকবেন? একটি জনবহুল উপজেলার স্বাস্থ্যসেবা কি এভাবেই বছরের পর বছর অবহেলা আর অনিয়মের চাদরে ঢাকা থাকবে? সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের দ্রুত হস্তক্ষেপই পারে হরিণাকুন্ডুর মানুষের এই দুর্ভোগ লাঘব করতে।
ঝিনাইদহ অফিস